kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মনের কোণে হীরে-মুক্তো

অন্তর্ভেদক প্রকল্প, অংশীজন ও বিশেষ ব্যবস্থাপনা কৌশল

ড. সা’দত হুসাইন

১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



অন্তর্ভেদক প্রকল্প, অংশীজন ও বিশেষ ব্যবস্থাপনা কৌশল

বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্যভেদে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে মোটাদাগে দুই ভাগে চিহ্নিত করা যায়। প্রথম ধরনের প্রকল্প নিতান্তই নিরুপদ্রবী। কোনো প্রকার শোরগোল, হৈচৈ, ভাঙচুরের শব্দ, যন্ত্রপাতির ব্যবহার, কাটাছেঁড়া এবং দৃশ্যমান কর্মযজ্ঞ ছাড়া প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলে। একসময় অনেকটা নীরবে সমাপ্ত হয় প্রকল্প। দ্বিতীয় ধরনের প্রকল্প এগিয়ে চলে সশব্দে, রাস্তাঘাট, স্থাপনা ভেঙেচুরে, গাছপালা বনবাদাড় উজাড় করে, জনপদ-ভূ-প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটিয়ে, এমনকি প্রকল্প এলাকার জনগণের জীবনধারা বদলে দিয়ে। প্রকল্পের কর্মযজ্ঞ দৃশ্যমান। কর্মকাণ্ডের নির্বাহী, তত্ত্বাবধায়ক, ঠিকাদার, শ্রমিক সর্দার, তাঁদের দলবল যন্ত্রপাতি নিয়ে এলাকার নিয়ন্ত্রণ দখল করে নেন। তাঁদের ইচ্ছামতো জনপদের অংশীজনের (Stakeholder) সুখ-সুবিধার ওপর স্টিমরোলার ভ্যাবু মেশিন, রেডিমিক্সের গাড়ি চালিয়ে দেন। এ ধরনের প্রকল্পকে বলা যায় অন্তর্ভেদক বা Invasive প্রকল্প। পক্ষান্তরে ছাত্রবৃত্তি প্রকল্প, গবেষণা প্রকল্প, প্রশিক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নকালে জনগণ বা অংশীজন অসুবিধার সম্মুখীন হয় না, অনেক সময় তারা বুঝতে পারে না যে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে। এ শ্রেণির প্রকল্পকে বলা যেতে পারে নিরুপদ্রবী, নির্ঝঞ্ঝাট বা Non-invasive প্রকল্প। এ আলোচনার মূল উপজীব্য হচ্ছে Invasive বা অন্তর্ভেদক প্রকল্পের সন্তোষজনক বাস্তবায়ন কৌশল।

একসময় ছিল যখন ভৌত অবকাঠামো নির্মাণভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ কিংবা বাস্তবায়নকালে কারো সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা হতো না। এই মানসিকতার রেশ এখনো কিছু ক্ষেত্রে রয়ে গেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকালে গ্রামগঞ্জ, জনপদ উজাড় হয়েছে, গাছপালা-বনাঞ্চল সাবাড় হয়েছে, নদীর স্রোত বাধাগ্রস্ত হয়েছে, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি বিলীন হয়েছে। তবু প্রকল্পের লোকজন কোনো দিকে দৃষ্টিপাত করেনি, কারো কথায় কর্ণপাত করেনি। তারা ধনবল, জনবল এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্তি বলে বলীয়ান হয়ে একতরফাভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। গরিব জনগোষ্ঠী, আদিবাসীরা এর ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অরুন্ধতী রায়সহ অনেক বিখ্যাত লেখকের বর্ণনায় বিধ্বস্ত জনপদের অসহায় হতভাগ্য জনগোষ্ঠীর করুণ বিপর্যয় মর্মস্পর্শীরূপে ফুটে উঠেছে। আজও কোনো প্রকল্প শুরু হওয়ার কথা শুনলে তারা আঁতকে ওঠে। তাদের বুক থরথর করে কাঁপতে থাকে। এই বুঝি সরকারের লোক দলেবলে আসবে, তাদের ভিটেমাটি দখল করে নেওয়ার পাঁয়তারা করবে। একদিন হয়তো সত্যি সত্যি বাড়িঘর থেকে তাদের উচ্ছেদ করবে। বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে তারা অন্য কোনো অঞ্চলে ছিটকে পড়বে। আত্মীয়-স্বজন, পাড়ার মানুষ কে কোথায় হারিয়ে যাবে ঠিকঠিকানা নেই। জীবনের এই করুণ পরিণতি তারা একাধিকবার দেখেছে। এর পুনরাবৃত্তি তারা দেখতে চায় না। তারা প্রতিবাদ করেছে। প্রায়ই তাদের প্রতিবাদ কাজে আসেনি। তবে প্রতিবাদ যখন আন্দোলনে রূপ পেয়েছে, সরকার তখন পিছু হটেছে, নমনীয় হয়েছে। নর্মদা প্রকল্প, সিঙ্গুর প্রকল্প এর বড় উদাহরণ। জনগণের প্রতিরোধের মুখে সরকার প্রকল্প পরিত্যাগ অথবা সংশোধন করতে বাধ্য হয়েছে।

বাংলাদেশে কয়েকটি প্রস্তাবিত প্রকল্প গণপ্রতিরোধের মুখে কর্তৃপক্ষ গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। ওসমানী উদ্যানে ন্যাম কনভেনশন সেন্টার স্থাপন প্রকল্প, মুন্সীগঞ্জে প্রস্তাবিত বিমানবন্দর প্রকল্প, ঢাকার আশপাশে বিশাল আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করার প্রস্তাব এবং ফুলবাড়িয়ায় উন্মুক্ত কয়লাখনির প্রকল্প থেকে গণপ্রতিরোধের মুখে কর্তৃপক্ষ সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। গ্রামের লোকজন প্রাণ দিয়ে হলেও তাদের বাপ-দাদার ভিটেমাটি রক্ষার জন্য সফল আন্দোলন করেছে। প্রথম দিকে কর্তৃপক্ষ স্থানীয় লোকজনের দাবি অগ্রাহ্য করেছে। কিন্তু প্রতিবাদী আন্দোলন যখন তীব্র হয়েছে তখন তারা বুঝতে পেরেছে এলাকার মানুষ যখন জীবন বাজি রেখে আন্দোলন করছে, তখন সে এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে তারা পরিকল্পনা গুটিয়ে সদর দপ্তরে চলে এসেছে। প্রকল্প হয় পরিত্যক্ত হয়েছে, অথবা অনত্র স্থানান্তরিত হয়েছে। ধূমায়িত প্রতিবাদ বিস্ফোরিত হওয়ার আগে জনস্বার্থের বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণ করার প্রক্রিয়া থেকে সরে এলে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো যেত।

আমরা এখন অন্তর্ভেদক প্রকল্পের বাস্তবায়ন কৌশলের প্রতি দৃষ্টিপাত করছি। ঢাকা শহর ও এর আশপাশের এলাকায় বেশ কয়েকটি বড় ভৌত অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। আবার কয়েকটি প্রকল্প সম্প্রতি সম্পন্ন হয়েছে। দৃশ্যমান কয়েকটি প্রকল্প যেমন—মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে, হ্রদ খনন ও সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্প, ওয়াসার নিষ্কাশন প্রকল্প, বাস র‌্যাপিড প্রকল্প। সমাপ্ত হওয়া প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ফ্লাইওভার প্রকল্প। এ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, ভোগান্তি-যন্ত্রণা সরাসরি সহ্য করছি। বাস্তবায়নকালে অংশীজনের যে অসুবিধা এবং কষ্ট হয় তার শতভাগ উপলব্ধি আমাদের হয়েছে। এ যন্ত্রণার মর্মস্পর্শী বর্ণনা দিতে আমাদের কবি-সাহিত্যিক হতে হবে না। সহজ-সরল ভাষায় বাস্তব অবস্থার বর্ণনা এর জন্য যথেষ্ট হবে।

আমি নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকায় থাকি। নিকুঞ্জ লেকটি পুনঃখনন করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে এর সৌন্দর্য বর্ধন করা হবে। দুই-তিন বছর ধরে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। দেশ-বিদেশের বৃহদাকৃতির নানা রকম যন্ত্রপাতি, ততোধিক বৃহদাকার যন্ত্রযান প্রকল্প এলাকায় কাজ করছে। একবার মাটি ফেলে লেকটি ভরাট করা হচ্ছে, আবার সেই মাটি সরিয়ে লেক তৈরি করা হচ্ছে। নিকুঞ্জবাসী এখনো জানে না শেষ পর্যন্ত কী হবে। ট্রাকে ট্রাকে মাটি আসছে, আবার ট্রাকে ট্রাকে মাটি অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রাস্তাঘাট ভেঙে ফেলা হচ্ছে, মাটি ফেলে, বড় বড় যন্ত্রপাতি রেখে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। বহু বছরের বড় বড় গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। এখন এলাকায় গাড়ি নিয়ে তো বটেই, হেঁটে চলাও দুষ্কর। সবচেয়ে বড় কথা, কী কাজ হচ্ছে, কী কাজ হবে, শেষ পর্যন্ত ফলাফল কী দাঁড়াবে অংশীজনদের সে সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। কেউ তাঁদের সে ধারণা দেওয়ার প্রচেষ্টা চালায়নি। শুধু কয়েকটি সাইনবোর্ড রাখা আছে, যেখানে বলা হয়েছে উন্নয়নকাজ চলছে। সাধারণভাবে লোকে জানে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এ কাজ চলছে। এ ব্যাপারে দু-একটি বড় সাইনবোর্ডে প্রকল্প সম্পর্কে বোধগম্য বর্ণনা দেওয়া হয়নি। কোনো লিফলেট, প্যাম্পলেট প্রকাশ করা হয়নি। প্রকল্পের ঠিকাদার কে তা সাধারণ মানুষ জানে না। তারা শুধু জানে, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের কারণে দৈনন্দিন জীবনে এলাকার বাসিন্দাদের যে অসুবিধা হচ্ছে তা নিরসনের জন্য কার কাছে যেতে হবে সে সম্পর্কে এলাকার সম্মানিত বাসিন্দাদের কোনো ধারণা নেই। প্রকল্পটি কী উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে প্রথম দিকে তা-ও তাঁরা ভালোভাবে জানতেন না। এখন এটুকু জানেন লেক পুনঃখনন করে এর সৌন্দর্য বর্ধন করা হবে। ওই পর্যন্তই।

এ পর্যায়ে ভৌত অবকাঠামোভিত্তিক অন্তর্ভেদক প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আলোচনা প্রাসঙ্গিক হবে। এ ধরনের প্রকল্প শুরু করার প্রাক্কালে অংশীজনদের (Stakeholder) প্রকল্প সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা প্রয়োজন। প্রকল্পের সুফল ব্যাখ্যা করে তাঁরা যে প্রকল্পের উপকারভোগী হবেন, এটি তাঁদের বুঝিয়ে বলতে হবে। সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণ (Social Mobilization) কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁদের আস্থা অর্জন করতে হবে। তাঁদের সমর্থন আদায় করতে হবে। তাঁদের যৌক্তিক বক্তব্য গুরুত্বসহকারে শুনতে হবে, ভালো উপদেশ থাকলে তা গ্রহণ করে সে মতে কার্য সম্পাদন করতে হবে। এককথায় প্রকল্প ব্যবস্থাপনা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive)। অংশীজনরা যাতে প্রকল্পের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করেন সে জন্য তাঁদের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ রক্ষা করতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী লাভের জন্য তাঁরা যেন সাময়িক অসুবিধা ও কষ্ট সহ্য করতে রাজি থাকেন সে ব্যাপারে তাঁদের সম্মতি সংগ্রহ করতে হবে। প্রকল্প সমাপ্ত হওয়ার পর প্রকল্পজাত সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে তাঁরা কিভাবে উপকৃত হবেন প্রকল্পের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা সহজবোধ্য করে এলাকার বাসিন্দা, বিশেষ করে অংশীজনদের সামনে তা উপস্থাপন করবেন। তাহলে প্রকল্পের অনুকূলে সামাজিক শক্তি সৃষ্টি হবে, যা প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে মসৃণ ও নির্বিঘ্ন করবে।

ঢাকা শহরের যে ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের কর্মকাণ্ড প্রায় সবার চোখে পড়ছে, তা হলো মেট্রো রেল প্রকল্প। এই কর্মকাণ্ড এত বেশি দৃশ্যমান এবং নাগরিকদের চলাফেরা এত বেশি কষ্টদায়ক করেছে যে রাস্তা কেটে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে এমন যেকোনো প্রকল্পকে মানুষ মেট্রো রেল প্রকল্প মনে করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর ফিটফাট যেকোনো সেনা সদস্যকে গ্রামের লোক ‘মেজর’ মনে করত, সেভাবেই আখ্যায়িত করত, হোক না সে একজন নায়েব সুবাদার, লেফটেল্যান্ট, ক্যাপ্টেন কিংবা কর্নেল। আমাদের এলাকার লেক খনন প্রকল্পে রাস্তাঘাট দৃষ্টিকটুভাবে কাটাকাটি করা হচ্ছে। তাই প্রথম দিকে এলাকার অনেক শিক্ষিত লোকও বলতেন এখান দিয়ে মেট্রো রেল যাবে। তাই এত মাটি কাটা হচ্ছে। আসলে মেট্রো রেল একটি বিশাল ভৌত অবকাঠমো প্রকল্প। উত্তরার এক মাথা থেকে শুরু করে গুলিস্তান-মতিঝিল পর্যন্ত এর কর্মকাণ্ড বিস্তৃত। পুরো পথ কেটেকুটে, টিন দিয়ে ঘেরাও করে সংকুচিত করা হয়েছে। আগে চার লাইনে গাড়ি গেলেও এখন সেখানে দুই লাইনের বেশি গাড়ি যায় না। সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। যে দুই লাইন দিয়ে গাড়ি চলে প্রকল্পের অজুহাতে সেখানে দীর্ঘদিন নিয়মিত মেরামত হয় না। রাস্তা ভেঙে ছারখার। কবে মেরামত হবে তা কেউ বলতে পারে না। বাংলামোটর-রাজারবাগ ফ্লাইওভারের সময়ও আমরা তেমনটি দেখেছি। ওপরে ফ্লাইওভারের মূল কাঠামো তৈরির কাজ শেষ হলেও নিচের রাস্তায় মেরামতের কোনো কাজ করা হয়নি। ফলে বছরের পর বছর নিচের ভাঙা রাস্তা দিয়ে চলতে গিয়ে যাত্রীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে গিয়েছিল। মালিবাগের অংশে তো গর্ত-কাদায় মিলে এমন অবস্থা হয়েছিল যে রসিকজন রাস্তায় ধানের চারা এবং মাছ চাষ করার প্রয়াশ পেয়েছিল। টেলিফোন কম্পানির লোক বলেন, মেট্রো রেলের লোকেরা রাস্তা কাটতে গিয়ে তাঁদের ‘আন্ডার গ্রাউন্ড কেবল’ কেটে ফেলেছে, ফলে শিগগিরই টেলিফোন ঠিক হবে না। বিদ্যুতের লোক বলেন, মেট্রো রেলের লোকেরা বড় বড় গাছ কাটতে গিয়ে বিদ্যুতের যন্ত্রপাতিও নষ্ট করে ফেলেছে, অতএব বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে; এ সমস্যা আরো কিছুদিন থাকবে।    

অসুবিধা হচ্ছে যে ছোটখাটো মেরামতের জন্য বা রাস্তাঘাট, গাছপালা একটু দেখেশুনে কাটার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কাকে বলতে হবে তা জানা যায় না। ঠিকাদারের লোকেরা ঠিকাদারের নাম-ঠিকানা বা ফোন নম্বর দিতে চায় না। তাদের সর্দার কে তা-ও বলে না। তারা নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ করে, বড় বড় যন্ত্রপাতি এবং লোকবল নিয়ে দোর্দণ্ড প্রতাপে কাটাছেঁড়া, ভাঙচুর করে যায়। কারো অনুরোধ তারা শোনে না। ভারতের মুম্বাইয়ে মেট্রো রেলের জন্য ২১ হাজার গাছ কেটে ফেলার পরিকল্পনা করেন মেট্রো রেলের ঠিকাদার এবং নির্বাহীরা। নানা আবেদন-অনুরোধ করেও তাঁদের ঠেকানো যাচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে এর প্রতিবাদে স্থানীয়রা (অ্যারে কলোনির লোকজন) রাস্তায় নামে। কিন্তু ঠিকাদারের লোকজন গাছ কাটতে থাকে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ ঠিকাদারের পক্ষ নিয়ে প্রায় দেড় ডজন কর্মীকে আটক করে। তখন এক সমাজকর্মী গাছ কাটা বন্ধ করার জন্য মুম্বাই হাইকোর্ট আবেদন করেন। সে আবেদন হাইকোর্ট খারিজ করে দেন। তারপর আন্দোলনকারীরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। সুপ্রিম কোর্ট গাছ কাটা বন্ধ করার সাময়িক (Provisional) নির্দেশ দেন। সুপ্রিম কোর্ট শুনানির তারিখ নির্ধারণ করে ওই দিন পর্যন্ত গাছ কাটা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এবং ঠিকাদার নানারূপে অত্যাচার-অনাচার এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ভাঙচুর করলেও আমাদের অংশীজনরা এখনো হাইকোর্টে মামলা করার মতো শক্তি সঞ্চয় করতে পারেননি। ফলে তাঁদের যন্ত্রণা সহ্য করতে হচ্ছে। এ যন্ত্রণার কবে অবসান হবে তা নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারেন না।

প্রায় সব ভৌত কাঠামোভিত্তিক প্রকল্পে একতরফাভাবে ভাঙচুর, জোরজুুলুম চলছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এখনো পর্যন্ত ব্যাপারটি যথা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন বলে মনে হয় না। সময় এসেছে যখন পুরো ব্যাপারটি নিয়ে আমাদের নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে হবে। আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু করার জন্য নিম্নোক্ত পরামর্শগুলো উপস্থাপন করছি।

►  প্রকল্প দলিলে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে যে এটি সম্পূর্ণরূপে অথবা আংশিকভাবে ভৌত অবকাঠামোভিত্তিক প্রকল্প কি না। উত্তর হ্যাঁ হলে অতি সংক্ষেপে নির্মিতব্য ভৌত অবকাঠামোর বোধগম্য বর্ণনা দিতে হবে।

►  প্রকল্পে বর্ণিত ভৌত অবকাঠামো নির্মাণকালে রাস্তাঘাট, ভবন, স্থাপনা কাটাকাটি, ভাঙচুর কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না। হলে তার বর্ণনা দিতে হবে, যাতে এলাকার সাধারণ অংশীজনের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট ও বোধগম্য হয়।

►  এলাকাবাসীকে কত মাস বা বছর নির্মাণজনিত অসুবিধা ভোগ করতে হবে, কোনো স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা, যেমন—গাছ কাটা, স্থাপনা ভেঙে ফেলা ইত্যাদির অশঙ্কা থাকলে তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করতে হবে। আর্থিক এবং সামাজিক ক্ষতির (Social cost) প্রাক্কলিত মূল্য নির্ধারণ করে তা প্রকল্প ব্যয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

►  এলাকাবাসী অংশীজনকে অবহিতকরণ, তাঁদের সঙ্গে কার্যকর যোগযোগ স্থাপন, তাঁদের সম্মতি গ্রহণ এবং সর্বোপরি সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণ (Social Mobilization) প্রক্রিয়া সুবোধ্যভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে।

►  প্রকল্প বাস্তবায়নকালে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এবং ঠিকাদার বা তাঁর প্রতিষ্ঠানের উচ্চতর নির্বাহীদের সঙ্গে অংশীজন সহজেই কিভাবে যোগাযোগ করতে পারবেন, তাঁর পদ্ধতি-প্রক্রিয়া সবিস্তারে ব্যাখ্যা করতে হবে।

ঠিকাদারের সার্বিক দায়দায়িত্ব সংক্ষেপে হলেও অংশীজনকে জানানো আবশ্যক।

►  নির্মাণজনিত কারণে রাস্তাঘাটে ভাঙচুর-গর্ত বা এবড়োথেবড়ো অংশের সৃষ্টি হলে তা দ্রুততম সময়ে মেরামত নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে ঠিকাদারের তাত্ক্ষণিক করণীয় কাজগুলো সহজ ভাষায় লিপিবদ্ধ করে সবাইকে অবহিত করতে হবে। কার্যকর মনিটরিং ও তদারকির মাধ্যমে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারের দায়িত্ব পালন সুনিশ্চিত করবেন। রাস্তা, ফ্লাইওভার, পয়োনিষ্কাশন প্রকল্প বাস্তবায়নকালে জনসাধারণের চলাচল ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সুবিধা যাতে যথাসম্ভব অব্যাহত থাকে, সেদিকে প্রকল্পের নির্বাহীদের সর্বোচ্চ সতকর্তা পালন করতে হবে।

►  প্রকল্প শেষে এলাকাবাসী অংশীজনকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ জানাতে হবে। তাঁদের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে।

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব

ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা