তাদের ডাকনামের মধ্যে একটি ডাকাবুকো ব্যাপার আছে। ‘ব্লু সামুরাই’ বা ‘নীল তলোয়ার’ নাম শুনলেই প্রতিপক্ষকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতে জানা এক দলের ছবিই আঁকতে চাইবেন সবাই। তবে নামে বিধ্বংসী শোনালেও জাপান সে রকম নয়। বরং শক্তি আর কৌশলের সঙ্গে শৃঙ্খলার মিশেলে ফুটবল মাঠে সৃষ্টিশীলতার গল্পই লিখতে জানে তারা। হ্যাঁ, তাদের ফুটবল খেলার ধরন ব্রাজিলের মতো ছন্দোময় নয়। আবেগময় নয় আর্জেন্টিনার মতো। কিংবা ফ্রান্সের মতো নয় তারকাখচিতও। কিন্তু ৯০ মিনিট শেষে স্কোরলাইন যখন দেখায় যে কোনো ফুটবল পরাশক্তি মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়ছে, তখন বোঝা যায় এই তলোয়ার কখনো শব্দ করে না, শুধু নিঃশব্দে ইতিহাস লিখে যায়। যেমনটি লিখেছিল কাতার বিশ্বকাপেও। শুরুতে পিছিয়ে পড়েও সাবেক দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি ও স্পেনকে হারিয়ে নীরবে শাণ দেওয়া সেই তলোয়ারের ধারও জানান দিয়েছিল জাপান।
চলতি বিশ্বকাপেও দুর্দান্ত শুরু করেছে জাপান। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে তিনবারের রানার্স আপ নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে তারা সতর্কবার্তা দিয়েছে যে এবারের জাপানকেও ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তিউনিশিয়ার বিপক্ষে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে ৪-০ গোলের জয়ে আছে তাদের দারুণ ছন্দে থাকার ঘোষণাও। স্বপ্ন আর বাস্তবতা যদি এক সুতায় গাঁথা হয়, তাহলে ‘ব্লু সামুরাই’দের উত্থান স্বপ্নভঙ্গের কারণ হতে পারে বড় কোনো দলেরও।
জাপানের ফুটবলে কোনো সুপারস্টার নেই। শৃঙ্খলাই তাদের শক্তি। ছোটবেলা থেকেই খেলোয়াড়দের শেখানো হয়, ‘দল আগে, আমি পরে’। জাপান ফুটবলের সংস্কৃতিটাই এমন যেন রক্ষণে সবাই প্রহরী, আক্রমণে সবাই সৈনিক। যে ফুটবলে অহংকারের জায়গা কম, আছে শুধুই দায়িত্ববোধ। মাঠে তারা যতটা সংগঠিত, মাঠের বাইরেও ঠিক ততটাই। কাতার বিশ্বকাপে ম্যাচ শেষে নিজেদের ড্রেসিংরুম পরিষ্কার করা কিংবা গ্যালারি পরিষ্কার করা জাপানি সমর্থকদের পৃথিবী মনে রাখবে অনেক দিন। বর্তমানে জাপানের জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বড় অংশই ইউরোপের শীর্ষ লিগে খেলেন। ফলে বিশ্বকাপে তাঁরা আর বড় দলের নাম দেখে ভয়ও পান না। কারণ নিয়মিত বড় দলের তারকাদের পক্ষে-বিপক্ষেই মাঠে নেমে থাকেন তাঁরা। এই অভিজ্ঞতাই জাপানকে চলতি আসরে এনে দিতে পারে বড় সাফল্য। শেষ চার বিশ্বকাপের তিনটিতেই শেষ ষোলোতে থামতে হয়েছে জাপানকে। তবে চলতি বিশ্বকাপে দারুণ শুরু করা হাজিমে মোরিয়াসুর দল এবার শেষ ষোলো পেরিয়ে যেতে চায় শেষ আট বা শেষ চারে। আসরের প্রথম দুই ম্যাচে জাপান কম ভুল করে পরিস্থিতি বুঝে খেলার চেষ্টা করেছে। দেখে মনে হয়েছে, ফুটবল যেন দাবার বোর্ডের এক নিখুঁত চাল। কখন প্রেস করবে, কখন ধীরে খেলবে, কখন কাউন্টার করবে—সবকিছুই পরিকল্পিত। প্রতিপক্ষের ভুলের সুযোগ নিতে তারা যেন দক্ষ শিকারি। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে টিভি পর্দায় দেখতে পাওয়া হোয়াইট বোর্ডে জাপান ম্যানেজারের সেই আঁকিবুঁকি আর ম্যাচের ফল তাদের নিঁখুত পরিকল্পনাই তুলে ধরে। একই ধারাবাহিকতায় তিউনিশিয়ার বিপক্ষেও এসেছে বড় জয়, যা শুধু জয় নয়, যেন শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা ও ধৈর্যেরও জয়। কে বলতে পারে, এই তিনে মিলে এবার নিঃশব্দে নতুন কোনো ইতিহাস লিখবে না নীল তলোয়ার?




