তৈরি পোশাক শিল্পের নন-ট্র্যাডিশনাল বা অপ্রচলিত বাজারটি দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। অপ্রচলিত বাজারে পণ্য রপ্তানিতে ৪ শতাংশ নগদ প্রণোদনা ঘোষণার পর থেকে এসব বাজারে মনোযোগী হয়েছেন উদ্যোক্তারা। অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি হয়েছে ৩৯৬ কোটি ২১ লাখ ডলারের পোশাক। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৩৪ হাজার ৭৪ কোটি টাকার মতো, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৬ শতাংশ বেশি। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে জিএসপিসহ নানা সুবিধা যখন হাতছাড়া হবে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে, এই অপ্রচলিত বাজারগুলোই ভরসা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। নতুন বাজারে পণ্য রপ্তানি বাড়াতে বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোর বিজনেস উইংগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বিজিএমইএ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে বাংলাদেশ থেকে মোট দুই হাজার ৩৯৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি হয়েছে ৩৯৬ কোটি ২১ লাখ ডলার, যা মোট পোশাক রপ্তানির ১৬.৫১ শতাংশ। অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি হওয়া পোশাকের বড় চালান গেছে মূলত জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও রাশিয়ার বাজারে। গত সাত মাসে মোট ১৯৪ কোটি ৬৪ লাখ ডলার মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে জাপানে রপ্তানি হয়েছে ৬৩ কোটি ডলার। আগামী ছয় মাস রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে জাপান আবারও বিলিয়ন ডলার রপ্তানির এলিট ক্লাবে উন্নীত হবে। মূল ক্রেতা জাপানের সবচেয়ে বড় রিটেইল শপ ‘ইউনিকলো’। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই চেইন গ্রুপটি বাংলাদেশের ২৩টির বেশি কারখানার সঙ্গে কাজ করছে। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় ৪৮ কোটি ২১ লাখ ডলার, ভারতে ৪১ কোটি ৮১ লাখ ডলার এবং রাশিয়ায় ৪১ কোটি ৫৪ লাখ ডলার মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে ভারতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৯ শতাংশের বেশি। বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ নাছির বলেন, ‘মার্কেট ও পণ্য বৈচিত্র্য বাড়াতে বিজিএমইএ অনেক কাজ করছে। এটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। মধ্যম আয়ের হতে গেলে জিএসপি সুবিধাসহ অনেক কিছু থাকবে না। তখন রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে রেগুলার মার্কেটগুলোর পাশাপাশি অপ্রচলিত বাজারগুলোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ভালো হলেও প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতে আরো বেশি রপ্তানি আশা করেছিলাম। রাশিয়ায় একসময় সরাসরি রপ্তানির সুযোগ ছিল না। এখন ঋণপত্র (এসসি) খুলে সরাসরি পণ্য রপ্তানি করতে পারছেন ব্যবসায়ীরা।’ নতুন বাজার ধরতে হলে সেসব দেশে বেশি বেশি মেলার আয়োজন করে বাংলাদেশি পণ্য সম্পর্কে জানান দিতে হবে বলে তিনি মনে করেন। ফ্যাশানেটিং ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনে সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ওয়াই-কনসালটিং অ্যানালিস্ট’ নামের প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, চলতি বছরে রাশিয়ার ফ্যাশন মার্কেট (পোশাক ও জুতা) ৬০.৯৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। এই বিশাল মার্কেটে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ মাত্র ৫৯৩ মিলিয়ন ডলার! সম্ভাবনাময় এই বিশাল বাজারটি এখনো বাংলাদেশের অধরাই রয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাশিয়ায় পাঁচ বছর ব্যবসা করার অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এস এম নূরুল হক বলেন, ‘রাশিয়ার তৈরি পোশাকের বাজার অনেক বড়। সেখানকার মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বেশি। বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় হলেও রাশিয়ার ৬০ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাকের ১ শতাংশের দখলও আমরা নিতে পারিনি। এ জন্য সরকারকেও উদ্যোগী হতে হবে। রাশিয়ানরা ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে অনেক সুবিধা নিচ্ছে। সেখানে আমরাও রাশিয়ায় তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দাবি করতে পারি।’ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে বাণিজ্যে প্রশিক্ষিত কমার্শিয়াল কাউন্সিলর নিয়োগ দিয়ে বাংলাদেশি দূতাবাসকে ব্যবসা প্রসারের উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি। তবে পোশাক খাতের চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধিকে স্বাভাবিক মনে করেন না ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি আবু তৈয়ব। তিনি বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির কারণে গত দুই বছরে বিশ্ববাজারে অন্য সব কিছুর মতো পোশাকের যে ঘাটতি ছিল মূলত এখন সেটাই পূরণ করা হচ্ছে।’