প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাধারণ মানুষগুলো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নেমেছিলেন, নির্যাতন-নিপীড়ন সয়েছেন। এখন চরম দারিদ্র্যে জীবন যাপন করলেও তাঁদের খোঁজ কেউ নেয় না। মেলেনি কোনো স্বীকৃতিও বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসার টানে যাঁরা স্ত্রী-সন্তান, পরিবার-পরিজন ফেলে সাহস করে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন, সঞ্জিত পাল (৬৩) তাঁদেরই একজন। শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌর শহরে বসবাসকারী এই প্রতিরোধ যোদ্ধাকে দুই দফায় ১৮ মাস কারাগারে কাটাতে হয়েছে। সামরিক সরকারের রোষানলে পড়ে নানাভাবে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তাঁর মতো নালিতাবাড়ী উপজেলায় আছেন আরো ৩৭৬ জন যুবক, যাঁরা বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নিতে জাতীয় মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। শেরপুর সদর, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নকলা উপজেলা মিলে এ সংখ্যাটা দাঁড়াবে পাঁচ শতাধিক। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর আহ্বানে অস্ত্র হাতে তুলে নেন তাঁরা। অপারেশনে গিয়ে হতাহত হন। যোগানিয়া ইউনিয়নের তালুকপাড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন। তিন ভাই মিলে সংসারে কৃষিকাজ করে ভালোই চলছিলেন। পঁচাত্তরে পরিবারের লোকজন নাকশী গ্রামের রশীদা বেগমের সঙ্গে বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে। সেদিন ছিল তাঁর বাসর রাত। হঠাৎ করে জানতে পারেন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার খবর। বাসর ঘরেই বউকে ফেলে বেরিয়ে পড়েন প্রতিশোধ নিতে। অন্যান্য প্রতিরোধ যোদ্ধার মতোই নানা নির্যাতন ভোগ করে ফিরে আসেন বাড়িতে। চকপাড়া খড়খড়িয়াকান্দা গ্রামের মো. ওয়াজেদ আলী। তখন তিনি তারাগঞ্জ পাইলট হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনাটি তাঁকে ব্যাপকভাবে নাড়া দেয়। তিনি বলেন, ‘এত বড় একটা মহান নেতা, দেশ স্বাধীন করল যে তারে মাইরা হালাইল। এইডা মাইন্না নিবার পাইন্নাই। তহন ১৯৭৫ সালের অক্টোবর মাসের শেষ দিকে, সেদিন শুক্রবার ছিল। কাদের সিদ্দিকী ইশারা দিছে, ডাক দিছে, তাই চইল্লা যাই। নকলার পাঠাকাটা এলাকায় রব্বানী (মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার গোলাম রব্বানী)-জিন্নাহর (মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম জিন্নাহ) সঙ্গে আমরা ৮২ জন যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলাম।’ ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘আমি প্রতিরোধ যুদ্ধে যোগ দেওয়ার কারণে বড় ভাই অতশ সরকারকে ধরে ঢাকায় জেআইসিতে নিয়ে ২৯ দিন আটকে রাখে নির্যাতন করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। জমি বিক্রি করে বড় ভাইকে তখন পরিবারের লোকজন ছাড়িয়ে এনেছিল। এর পরও পরিবারকে নানা রকম নির্যাতন সইতে হয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন মাস বন্দিশিবিরে ছিলাম। আমাকে ছাড়িয়ে আনার জন্যও অনেক সহায়-সম্পদ ও জায়গা বিক্রি করতে হয়েছে। এতে আমার পুরো পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ নালিতাবাড়ী শহরের আড়াইআনি বাজারের ফজলুল হক, আব্দুল হাই, কাউলারা গ্রামের আজিজুল হক, তালুকপাড়া গ্রামের শামছুদ্দিনসহ বর্তমানে বেঁচে থাকা দুই শতাধিক প্রতিরোধ যোদ্ধার জীবনকাহিনিই এক ও অভিন্ন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই সাধারণ মানুষগুলো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নেমেছিলেন, নির্যাতন-নিপীড়ন সয়েছেন। আর এখন চরম দারিদ্র্যে জীবন যাপন করলেও তাঁদের খোঁজ কেউ নেয় না। মেলেনি কোনো স্বীকৃতিও।