kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ছুতা সাজিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা আর কত?

আজাদুর রহমান চন্দন   

২৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ছুতা সাজিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা আর কত?

কক্সবাজারের রামুতে শুরু, এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, রংপুরের গঙ্গাচড়া, সিলেটের ওসমানীনগর আর সর্বশেষ ভোলার বোরহানউদ্দিন—সবখানে একই রকম কৌশল, একই রকম ছক। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী কারো ফেসবুক আইডি হ্যাক করে উসকানিমূলক ছবি বা লেখা পোস্ট করে ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক হামলা। আগের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে অপশক্তির ষড়যন্ত্র প্রকাশ পেতে সময় লাগলেও এবার ভোলায় তা ধরা পড়ে তাৎক্ষণিকভাবে। তবু থেমে থাকেনি উন্মাদনা।

ভোলার পুলিশ শুরুতেই জানিয়েছে, তারা এটি উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে যে বোরহানউদ্দিনে বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামের এক হিন্দু তরুণের বিরুদ্ধে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার অভিযোগ তোলা হলেও প্রকৃতপক্ষে সেটি করে দুজন মুসলিম। ওই হিন্দু তরুণ আগেই তাঁর আইডি হ্যাকড হওয়ার কথা পুলিশকে জানিয়ে জিডি করেছিলেন থানায়। পুলিশ তদন্ত করে এর সত্যতা পেয়ে ওই অপকর্মে জড়িত দুই মুসলিম ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারও করে। স্থানীয় আলেম-উলামা ও গণমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আলোচনায় বিষয়টি একরকম মিটেও গিয়েছিল। ‘ধর্ম অবমাননার প্রতিবাদে’ সাধারণ মুসল্লিদের ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি বন্ধও ঘোষণা করা হয়েছিল। এর পরও ৩০ থেকে ৪০ জন ‘অচেনা ব্যক্তি’ গিয়ে হঠাৎ পুলিশের ওপর চড়াও হয়। তারা এই বলে গুজব ছড়িয়ে দেয় যে কর্মসূচির নেতৃত্ব দেওয়া আলেমদের পুলিশ আটক করেছে। স্থানীয় সংবাদকর্মীদের ধারণ করা একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, হঠাৎ এক দল যুবক পুলিশের ওপর আক্রমণ করে। পুলিশ কর্মকর্তারা তখন বোরহানউদ্দিনের ঈদগাহ মসজিদের দোতলায় আশ্রয় নিলে সেখানে দরজা-জানালা ভেঙে তাঁদের পেটানো হয়। পুলিশ গুলি ছোড়ার আগেই বাইরে থেকে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ওই গুলিতেই এক পুলিশ সদস্য আহতও হন। হামলাকারীরা পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল যে ভোলার পুলিশ সুপার ঢাকায় অবস্থানরত স্থানীয় সংসদ সদস্যকে ফোন করে তাঁর সাহায্য কামনা করেছিলেন।

স্থানীয় সংসদ সদস্য আলী আজম মুকুল বিবিসি বাংলাকে বলেন, কয়েক দিন আগে থেকে তিনি ঢাকায় থাকলেও ওই ফেসবুক পোস্ট নিয়ে বোরহানউদ্দিনে পরিস্থিতি যে উত্তপ্ত হচ্ছিল, তার সব খবরই ফোনে পাচ্ছিলেন এবং প্রশাসনকে আলেম-উলামাদের সঙ্গে বৈঠক করারও নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এর পরদিন (রবিবার) ঈদগাহে কথিত ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে কয়েক হাজার মানুষ সমাবেশ করে এবং এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। সংসদ সদস্য বলেন, “জেলার পুলিশ সুপার—উনি ফোন রেখে দেবার আগে আমাকে শেষ কথাটা বলেন, ‘স্যার আমাদেরকে বাঁচান। আমরা মসজিদের দোতলায় ইমামের রুমে অবরুদ্ধ আছি, আমাদেরকে বাঁচান’, তাঁর উক্তি ছিল এটাই।”

এতকিছুর পরও দমে যায়নি চক্রান্তকারীরা। এবার সম্ভবত ধর্মীয় উন্মাদনা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার ছক ছিল তাদের। কিন্তু তাদের কৌশল শুরুতেই ধরা পড়ে যাওয়ার পর নতুন ছক কষে তারা। পুলিশের ওপর হামলা, গুলি কিংবা পাল্টা গুলিতে চারজনের প্রাণহানির ঘটনাকে পুঁজি করে নতুনভাবে স্থানীয় জনতাকে মাঠে নামানো হয়। শুধু তা-ই নয়, পুলিশকে তারা বাধ্য করে প্রকৃত ধর্ম অবমাননাকারী মুসলমানদের সঙ্গে যাঁর ফেসবুক আইডি হ্যাক করে তারা অপকর্মটি করেছিল, সেই বিপ্লব চন্দ্র শুভকেও একই মামলার আসামি করতে। কোনো অপরাধ না করেও (পুলিশের ভাষ্য মতেই) বেচারা বিপ্লব এখন অপরাধীদের সঙ্গে জেলহাজতে। আর যে চারজনের প্রাণহানি ঘটেছে তাদের পোস্টমর্টেমও করতে দেয়নি তথাকথিত তৌহিদী জনতা। তাহলে কি সন্দেহ থেকে যায় না, ওই চারজন আসলে কাদের গুলিতে মারা গেল?

এদিকে ধর্ম অবমাননার অজুহাতটি যে সাজানো নাটক, তা স্পষ্ট হওয়ার পরও দেশের এক শ্রেণির রাজনীতিক, এমনকি তথাকথিত কিছু সুধীজন সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়ে উল্টো পুলিশ ও সরকারের দিকে আঙুল তুলছেন।

ফেসবুক ব্যবহার করে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একই কৌশলে হিন্দু বা বৌদ্ধদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটেছে আগেও। ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধদের বাড়িঘর ও বৌদ্ধ বিহারে হামলার ঘটনা পুরো দেশকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছিল। তখনও ফেসবুকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একজনের নাম যুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। উত্তম বড়ুয়া নামে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এক যুবকের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কোরআন অবমাননার ছবি কেউ ট্যাগ করে দিয়েছিল। এর জের ধরে রামুতে ১০টিরও বেশি বৌদ্ধ বিহার এবং প্রায় ২৫টি বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছিল। কিন্তু উত্তম বড়ুয়া নামের ওই তরুণের আর খোঁজ মেলেনি এবং হামলার ঘটনায় কারো কোনো শাস্তি হওয়ারও খবর পাওয়া যায়নি।

রামুর কায়দায়ই হামলা চালানো হয়েছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর। তবে সেখানে আক্রান্ত হয়েছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। অভিযোগও সেই পুরনো—ফেসবুকে ইসলামবিদ্বেষী ছবি। এ জন্য প্রচার করা হয়েছিল রসরাজ নামে এক হিন্দু ব্যক্তির নাম। তাঁকে পিটিয়ে পুলিশেও দেয় স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে ঘটনা তাতে থেমে যায়নি। পরে ধর্মভিত্তিক কয়েকটি সংগঠন বিক্ষোভ সমাবেশ ডাকে এবং সেখান থেকেই হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা করা হয়। ভাঙচুর করা হয় প্রায় ৩০০ বাড়ি। অথচ আড়াই মাস পর জেল থেকে বেরিয়ে রসরাজ জানান, তিনি ফেসবুক চালাতে পারেন না। এমনকি এর যে পাসওয়ার্ড বলে একটি বিষয় আছে, সে বিষয়েও তাঁর কোনো ধারণাই নেই। নাসিরনগরের ঘটনায়ও আসল রহস্য আর সামনে আসেনি। এলে হয়তো পরের অঘটন ঘটানো কঠিন হতো।

নাসিরনগরে হামলার এক বছর পর রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ফেসবুক থেকে ছড়ানো গুজবের জের ধরে একজনের মৃত্যু হয়েছিল। গঙ্গাচড়ায় কয়েক দিন মাইকিং করে হামলা চালানো হয়েছিল হিন্দুদের বাড়িঘরে।

গত জুন মাসে ঈদের নামাজের পর হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা হয়েছিল সিলেটের ওসমানীনগরে। সনাতন ধর্মের এক নারীর মৃত্যুর পর সৎকার নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির নামে ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খুলে এমন কিছু পোস্ট দেওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে মুসলমানদের একাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করে। কয়েকটি বাড়িতে হামলা চালানো হয়।

আগের প্রতিটি ঘটনায়ই কুশীলবরা থেকে গেছে আড়ালে। পরিস্থিতি শান্ত করেই যেন হাঁপ ছেড়েছে পুলিশ, প্রশাসন ও সরকার। এবারও কি তারই পুনরাবৃত্তি ঘটবে!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা