অনেক সময় যাঁরা ইতিহাস নির্মাণ করেন তাঁরা ইতিহাসের অতল গহ্বরে হারিয়ে যান। উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল তেমন একটি চরিত্র। যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে অনেকে চেনেন বরিশালের যোগেন মণ্ডল হিসেবে। ২৯ জানুয়ারি ১৯০৪ সালে বরিশালের (তখন বাকেরগঞ্জ) এক অচ্ছুত বা নমঃশূদ্র, দলিত পরিবারে যোগেন মণ্ডলের জন্ম হয়েছিল। সে সময় নমঃশূদ্রদের হিন্দু ধর্মের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হতো না। এখনো ভারতের অনেক জায়গায় তাই। মহাত্মা গান্ধী তাঁদের নাম দিয়েছিলেন ‘হরিজন’ বা ভগবান হরির সন্তান হিসেবে। ব্রিটিশরা তাঁদের তালিকাভুক্ত করেছিল নিম্নবর্গের মানুষ হিসেবে। পেশায় তাঁরা ছিলেন কৃষক, নাপিত, মুচি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ডোম, মাছ বিক্রেতা। অনেক নৃতত্ত্ববিদের মতে, এই দলিতরাই ছিলেন আদি ভারতবাসী। আর্যরা ভারত আক্রমণের পর তাঁদের নিম্নবর্গের মানুষের তালিকাভুক্ত করে। প্রাচীনকাল থেকে এই দলিতরা সব সময় খুবই নিগৃহীত জনগোষ্ঠী। তাঁদের শিশুদের স্কুলে বা মন্দিরে যাওয়ার অধিকার ছিল না। এক কাপ চায়ের জন্য নিজেদের টিনের কাপ নিয়ে দোকানের সামনে বসে থাকতে হতো। সাধারণ মানুষের জন্য নির্মিত কুয়া থেকে জলপান তাঁদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। ভারতের অনেক স্থানে এই রকম অমানবিক প্রথা এখনো চালু আছে। বিচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশেও থাকতে পারে। ভারত ভাগ হওয়ার প্রাক্কালে পূর্ববঙ্গের দলিত সম্প্রদায় দ্বিধায় পড়ে তারা কি দেশত্যাগ করে হিন্দুপ্রধান ভারতে চলে যাবে, না পাকিস্তানে থেকে যাবে। পাকিস্তান একটি মুসলমান প্রধান দেশ হবে তা সত্য কিন্তু সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে আবার জাতিপ্রথা (Caste system)) নিয়ে তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। পূর্ববঙ্গের দলিতরা দেশত্যাগ না করাটা শ্রেয় মনে করেন। তাঁদের নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন যোগেন মণ্ডল, যিনি আজীবন দলিতদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে যোগেন মণ্ডল বঙ্গীয় আইন পরিষদে বাকেরগঞ্জ উত্তর-পূর্ব সাধারণ সংসদীয় এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করা হয় সর্বভারতীয় নিম্নবর্গ ফেডারেশনের (All India Scheduled Caste Federation) বাংলা শাখা। দলিতদের এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ড. বি আর আম্বেদকার, যিনি বাবাসাহেব আম্বেদকার হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি নিজেও একজন দলিত ছিলেন, তবে ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। অর্থনীতিতে তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস ও যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুটি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তথাপি তিনি নিজ দেশের উচ্চবর্ণের মানুষের কাছে ছিলেন একজন অচ্ছুত। সে সময় ড. আম্বেদকার ও যোগেন মণ্ডল ভারতের ছয় কোটি দলিত সম্প্রদায়ের ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। স্বাভাবিক কারণে দলিত সম্প্রদায় ও যোগেন মণ্ডল রাজনীতিতে মুসলিম লীগের সমর্থক হয়ে পড়েন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে যোগেন মণ্ডল যেসব এলাকায় দলিত সম্প্রদায়ের ভোটার বেশি ছিল সেই সব এলাকায় মুসলিম লীগ প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করেন এবং তাঁদের জিতিয়ে আনেন। যোগেন মণ্ডল সব সময় দলিত-মুসলিম লীগ একতার জন্য কাজ করেছেন। তিনি জিন্নাহ ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন। দেশভাগের প্রাক্কালে ১৯৪৭ সালে সিলেটে গণভোট হবে, তারা পাকিস্তানে যোগ দেবে নাকি ভারতের অংশ হবে এ দ্বিধায় ছিল। তখন সিলেট আসামের অংশ ছিল। আসাম ও সিলেট মিলে হিন্দু-মুসলমানের জনসংখ্যার অনুপাত ছিল অনেকটা সমান সমান। সিলেটের চা বাগানগুলোতে আবার একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার ছিল দলিত সম্প্রদায়ের। তারা যেদিকে সমর্থন দেবে পাল্লা সেদিকে ভারী হবে। জিন্নাহর অনুরোধে যোগেন মণ্ডল সিলেটে গিয়ে দলিত সম্প্রদায়ের মাঝে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য জোর প্রচারণা চালান এবং শেষ পর্যন্ত সিলেট পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। যোগেন মণ্ডলের রাজনৈতিক জীবনের একটি অসাধারণ কীর্তি ছিল ভারতের সংবিধানের স্থপতি বলে যাঁকে বলা হয় সেই বাবাসাহেব আম্বেদকারকে পূর্ব বাংলার যশোর ও খুলনা থেকে নির্বাচনে জিতিয়ে আনা। কংগ্রেস পণ করেছিল কোনো দলিতকে ভারতের ১৯৪৬ সালের গণপরিষদে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে ভারতের ছয় কোটি দলিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ছাড়া স্বাধীন ভারতের সংবিধান রচনার অর্থ ছিল ভারতের একটি জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশকে সাংবিধানিক অধিকারের বাইরে রাখা। এর ফলে ভারতে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। দলিতদের অবস্থা এতই শোচনীয় ছিল যে কংগ্রেস সর্দার বল্লবভাই প্যাটেল জনসম্মুখে বলেন, ‘ড. আম্বেদকারের জন্য সংসদের দরজাই শুধু বন্ধ করে দেওয়া হবে না এমনকি সব জানালাও বন্ধ করে দেওয়া হবে। দেখি আম্বেদকার কিভাবে গণপরিষদে প্রবেশ করেন (‘apart from the doors, even the windows of the Constituent Assembly are closed for Dr. Ambedkar. Let us see how he enters the Constituent Assembly’)ভারতের প্রতাপশালী রাজনীতিবিদ মওলানা আবুল কালাম আজাদ, যিনি এককালে কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ভারত স্বাধীন হলে নেহরু তাঁকে ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী নিয়োগ করেছিলেন। তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক অসাধারণ আত্মজীবনী ‘ইন্ডিয়া উইন্স ফ্রিডম’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন ভারত দ্বিখণ্ডিত হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল নেহরু আর প্যাটেলের, তারপর জিন্নাহর। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে আম্বেদকারকে তাঁর সংসদীয় এলাকা মহারাষ্ট্র থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এর আগে ১৯৩২ সালের ২১ মে আম্বেদকার অনেকটা হতাশ হয়ে এক বক্তৃতায় বলেন, ‘আমি হচ্ছি হিন্দু ভারতে সবচেয়ে অপছন্দের মানুষ। আমাকে একজন দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বলা হয় আমি নাকি দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু’। তাঁর প্রতি ভারতের রাজনীতিবিদদের এত ঘৃণার কারণ হচ্ছে তিনি ভারতের নিম্নবর্গের মানুষের প্রত্যাশা আর অধিকারের ব্যাপারে খুব সোচ্চার ছিলেন। যোগেন মণ্ডল তাঁর নেতা ড. আম্বেদকারকে যশোর-খুলনা নির্বাচনী এলাকা থেকে দাঁড় করিয়ে তাঁকে সেখান থেকে জিতিয়ে আনেন। ড. আম্বেদকারকে শুধু দলিত সম্প্রদায়ই সমর্থন করেনি, মুসলিম লীগও সমর্থন করেছিল। যে আম্বেদকারের প্রতি এত অবিচার করা হয়েছিল সেই একই ব্যক্তি ভারতের গণপরিষদের শুধু সদস্যই হননি তাঁকে ভারতের খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির আহ্বায়কও করা হয়। একজন যোগেন মণ্ডলের কারণে তা সম্ভব হয়েছিল। সাংবিধানিকভাবে দলিত সম্প্রদায়কে সমান অধিকার দিলেও বাস্তবে তাঁরা সব সময় তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। পরবর্তীকালে আম্বেদকার তাঁর তিন হাজার অনুসারী নিয়ে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নেন। অন্যদিকে যোগেন মণ্ডল ও তাঁর দলিত অনুসারীরা দেশ ত্যাগ না করে পূর্ব পাকিস্তানেই রয়ে যান। তিনি ৬৯ সদস্যবিশিষ্ট পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। জিন্নাহ যোগেন মণ্ডলকে পাকিস্তানের প্রথম আইন ও শ্রমমন্ত্রী নিয়োগ করেন। তার আগে তিনি বরিশালের যোগেন মণ্ডলকে পাকিস্তানের গণপরিষদের অস্থায়ী স্পিকার নিযুক্ত করেন এবং ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট জিন্নাহ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করে যোগেন মণ্ডলের কাছে গভর্নর জেনারেলের শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জিন্নাহর মৃত্যু হলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান পাকিস্তানকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ও ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করলে যোগেন মণ্ডল কিছুটা অসহায় বোধ করেন। এর পরপরই দিল্লি থেকে পাকিস্তানে চলে আসেন ষড়যন্ত্রে পটু ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের আমলা চৌধুরী মোহাম্মদ আলী (পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী)। তিনি ব্রিটিশদের একজন অত্যন্ত আস্থাভাজন আমলা ছিলেন। এসেই তিনি পাকিস্তানের মন্ত্রিপরিষদের সচিব হিসেবে নিযুক্তি লাভ করেন। তাঁর অভ্যাস ছিল সরকার বা মন্ত্রিপরিষদে যত অমুসলিম বা সংখ্যালঘু নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর সদস্য বা কর্মকর্তা ছিলেন তাঁদের দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ করা। যোগেন মণ্ডল একসময় লক্ষ করেন তাঁকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল না দেখিয়ে মন্ত্রিপরিষদের সচিব সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। এতে তাঁর মন ভেঙে যায়। ১৯৫০ সালের ৮ অক্টোবর তিনি প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের কাছে ইস্তফাপত্র দিয়ে দেশত্যাগ করে কলকাতায় চলে আসেন। কিন্তু তাঁর দুর্ভাগ্য কলকাতার মানুষও তাঁকে ভালোভাবে গ্রহণ করেননি। ১৯৬৮ সালের ৫ অক্টোবর বাংলাদেশে ভারত সীমান্তের বনগাঁ জেলায় এই মহান ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেন। দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে দলিত সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য তিনি এত ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাদের কজনই বা তাঁর কথা মনে রেখেছেন? আর ভারতে দলিতদের অবস্থা খুব বেশি উন্নত হয়েছে, তা কি বলা যাবে? বরিশালের যোগেন মণ্ডল হচ্ছেন ইতিহাসের একজন ক্ষণজন্মা রাজনীতিবিদ, যিনি নিজেই ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন কিন্তু ইতিহাস তাঁকে মনে রাখেনি। যোগেন মণ্ডল ও তাঁর অনুসারীদের ইতিহাসটা এখানেই শেষ হতে পারত, কিন্তু হয়নি। পঞ্চাশের দশকে পূর্ববঙ্গে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়। খাদ্য ঘাটতিকে কেন্দ্র করে খুলনা-যশোর অঞ্চলের মানুষের, বিশেষ করে দলিতদের অবস্থা করুণ হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে এই অঞ্চলে সীমিত আকারে সাম্প্রদায়িত দাঙ্গাও দেখা দেয়। ১৯৫২ সালে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে পাসপোর্ট ব্যবস্থা চালু হয়। এতে এই অঞ্চলের নিম্নবর্গের হিন্দুরা অনেকটা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং দলে দলে দেশ ত্যাগ শুরু করে। এই সর্বহারা উদ্বাস্তুদের জন্য মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা, মহারাষ্ট্র ও অন্ধ্র প্রদেশের একটি বিরাট এলাকাজুড়ে দণ্ডকারণ্য নামক স্থানে শরণার্থী শিবির খোলা হয়। দণ্ডকারণ্য ছিল অনেকটা পরিত্যক্ত এলাকা। কারণ এখানে নিয়মিত কোনো বৃষ্টিপাত হয় না, মাটি চাষবাসের অযোগ্য, পানীয়জলের তীব্র অভাব, কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। এই ছিন্নমূল মানুষের জীবনযাত্রা হয়ে পড়েছিল অসহনীয়। এই দুরবস্থার কারণে দণ্ডকারণ্যে কয়েক হাজার নিরীহ মানুষ না খেয়ে, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করে। ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার দণ্ডকারণ্যের অনেক উদ্বাস্তুকে সুন্দরবনে স্থাপিত নতুন শরণার্থী শিবির মরিচঝাঁপিতে বসতি স্থাপনের জন্য উৎসাহিত করে। অনেক ঐতিহাসিক ও সমাজ পর্যবেক্ষকের (অমিতাভ ঘোষ) মতে, এটি ছিল তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের ভোটব্যাংক বৃদ্ধি করার একটি চাতুর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। দণ্ডকারণ্য থেকে অনেকেই তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কথার ওপর আস্থা রেখে সুন্দরবনের মরিচঝাঁপিতে নতুন করে সংসার পেতেছিলেন। কিন্তু তাঁদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। জীবন-জীবিকার কারণে শরণার্থীরা সুন্দরবন অঞ্চলের জঙ্গল কাটা শুরু করে, যেমন—বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলে মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গারা করেছে। বাম সরকার এই উদ্বাস্তুদের নির্বাচনের সময় ব্যবহার করেছে ঠিক; কিন্তু তার পরপরই মরিচঝাঁপি এলাকাকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করে এবং উদ্বাস্তুদের জঙ্গল কাটা বন্ধ করতে বলে। এতে তারা সায় না দিলে ১৯৭৯ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে সরকারের নির্দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মরিচঝাঁপিতে খাদ্যাভাব, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হামলায় কত নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বলা মুশকিল, তবে অনেকের ধারণা মতে তা কয়েক হাজার হবে। শক্তিপদ রাজগুরুর উপন্যাস ‘দণ্ডক থেকে মরিচঝাঁপি’ (১৯৮০-৮১) বঙ্গের (পূর্ববঙ্গসহ) নিম্নবর্গের বা সংখ্যালঘুদের প্রতি অবিচার ও রাজনীতির গুঁটি হিসেবে ব্যবহার হওয়ার করুণ কাহিনি নিয়ে একমাত্র উপন্যাস। সংখ্যালঘু সম্প্রাদয় সব দেশেই সব সময় নিগৃহীত, গোষ্ঠী স্বার্থে ব্যবহৃত এবং প্রয়োজন শেষ হলে উচ্ছিষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, পাকিস্তান তার ব্যতিক্রম নয়। বর্তমানে ভারতে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) ও সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) নিয়ে তুলকালাম চলছে। কারণ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মনে সন্দেহ ঢুকেছে, এতে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ আগের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। একটি দেশ কাকে নাগরিকত্ব দেবে তা তাদের নিজস্ব ব্যাপার কিন্তু আইন করে বা ঘোষণা দিয়ে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে আলাদা করার কারণেই এই তুলকালাম বলে অনেকে মনে করছেন। একটি গণতান্ত্রিক দেশে কোনো একটি সম্প্রদায়ের জন্য ডিটেনশন ক্যাম্প বানানো নিশ্চয় ভালো কাজ নয়। ১১ লাখ মিয়ানমারের বাসিন্দা অবৈধভাবে বর্তমানে বাংলাদেশে বসবাস করে। কোথাও ডিটেনশন ক্যাম্প নেই। বাংলাদেশ এটি ছোট দেশ। বড় দেশগুলোর অনেক কিছুই শেখার আছে এই ছোট দেশ থেকে। উপমহাদেশে শান্তি বিরাজ করলে বিশ্বেও এক-পংঞ্চমাংশ মানুষ শান্তিতে থাকবে। কারণ এই উপমহাদেশে এই বিরাটসংখ্যক মানুষ বাস করে। লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক