kalerkantho

পাকিস্তান আন্দোলন, দাঙ্গা ও শেখ মুজিব

এ কে এম শাহনাওয়াজ

২৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



পাকিস্তান আন্দোলন, দাঙ্গা ও শেখ মুজিব

১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের পর পাকিস্তান প্রস্তাব নিয়ে মাঠে নেমেছিল মুসলিম লীগ। কিন্তু কংগ্রেসসহ হিন্দু রাজনীতিকদের বিরোধিতায় শাসক ইংরেজদের চেষ্টা সত্ত্বেও তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, পাকিস্তান অর্জনের জন্য আন্দোলনের পথেই মাঠে নামতে হবে। তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিব এ সময় পাকিস্তান আন্দোলনে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন।

পাকিস্তান দাবি নিয়ে একটি নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। সরকারি সিদ্ধান্ত ছিল, ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে নির্বাচন করে ঠিক করা হবে পাকিস্তান হবে নাকি হবে না। অর্থাৎ ভারতবর্ষের মুসলমানরা ঠিক করবে তারা পাকিস্তান চায় কি না। কংগ্রেস পাকিস্তান দাবিকে সমর্থন করেনি। তারা ধর্ম দিয়ে দেশ ভাগ করতে চায়নি। শেষ পর্যন্ত বাঙালি মুসলমানকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে নামতে হয়।

পাকিস্তান আন্দোলন যখন তুঙ্গে, সেই সময়ের একটি প্রসঙ্গ এখানে উল্লেখ করা যায়। ব্রিটিশ ভারতে শেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৪৬ সালে। এই নির্বাচনে বাংলায় আর ভারতে যেখানে মুসলমানরা সংখ্যায় বেশি, সেসব প্রদেশে মুসলিম লীগ ভালো ফলাফল করে। তবে পাঞ্জাব, সিন্ধু ও সীমান্ত প্রদেশে মুসলিম লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তাই সেসব অঞ্চলে তারা সরকার গঠন করতে পারেনি। একমাত্র বাংলায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ সরকার গঠিত হয়েছিল। নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করার জন্য মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দিল্লিতে মুসলিম লীগের সভা ডাকলেন। দিল্লি যাওয়ার জন্য সোহরাওয়ার্দী একটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেন। এটি কলকাতার হাওড়া স্টেশন থেকে ছাড়বে। বাংলা ও আসামের নির্বাচিত মুসলিম লীগ সদস্য এবং কর্মীরা যাবেন এই ট্রেনে। এই বিশেষ ট্রেনের নামকরণ করা হলো ‘পূর্ব পাকিস্তান স্পেশাল’। শেখ মুজিবসহ ১০-১৫ জন ছাত্রলীগকর্মী এই সভায় যোগ দেওয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন। শেখ মুজিব ও তাঁর সংগঠনের ছেলেদের জন্য দুটি বগি ঠিক করা হলো। ছাত্রদের মধ্যে শেখ মুজিব ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন। ট্রেন যাত্রার সময় এর একটি প্রকাশ দেখা গেল। ছাত্ররা এই দুই বগির সামনে লিখে রেখেছিল, ‘শেখ মুজিব ও পার্টির জন্য রিজার্ভড’।

এই পর্যায়ে তরুণ শেখ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলনে নিজেকে পুরোপুরি জড়িয়ে ফেলেছিলেন। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট জিন্নাহ ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস নামে একটি কর্মসূচি ঘোষণা করলেন। শান্তিপূর্ণভাবে এই দিবস পালনের কথা বলা হয়েছিল। এই সময় হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হচ্ছিল। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার নেতারা মনে করলেন, এই দিবসটি তাঁদের বিরুদ্ধে ঘোষণা করা হয়েছে।

এই দিবস পালনের জন্য শেখ মুজিব তাঁর অনুসারীদের নিয়ে মাঠে নামলেন। হিন্দুদের মধ্যে যাতে ভুল-বোঝাবুঝি না হয়, তাই মুসলিম লীগ নেতা আবুল হাশিম শেখ মুজিবসহ তরুণদের ডেকে বললেন, ‘তোমাদের মহল্লায় মহল্লায় যেতে হবে। হিন্দু মহল্লায়ও তোমরা যাবে। তোমরা বলবে, আমাদের এই সংগ্রাম হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়, ব্রিটিশের বিরুদ্ধে, আসুন আমরা জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে এই দিনটি পালন করি।’ শেখ মুজিব তাঁর বন্ধুদের নিয়ে এই নির্দেশনামতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সাধারণ হিন্দুরা ঐক্যবদ্ধভাবে এই দিবস পালনে প্রস্তুত হয়েছিল। কিন্তু কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার নেতারা তাঁদের বিরোধিতা চালিয়ে যান। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীও শান্তিপূর্ণভাবে এই দিবস পালনের আহ্বান জানান। তিনি ১৬ আগস্ট সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা এর সমালোচনা করল।

১৫ আগস্ট ঠিক করা হলো, কে কোথায় অবস্থান নেবেন। ১৬ আগস্ট কলকাতার গড়ের মাঠে জনসভা ডাকা হয়েছিল। ঠিক হয়, সব এলাকা থেকে শোভাযাত্রা এসে গড়ের মাঠে মিলিত হবে। ইসলামিয়া কলেজে উপস্থিত থাকার নির্দেশ আছে শেখ মুজিবের ওপর। সকাল ১০টায় সেখানে ছাত্র জমায়েত হবে। এরপর তাঁরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন মুসলিম লীগের পতাকা উত্তোলন করতে। যথাসময়ে পতাকা উত্তোলন করা হলো। তখন কেউ বাধা দেয়নি। সবাই চলে আসার পর একদল ছাত্র পতাকা নামিয়ে ছিঁড়ে ফেলে। বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, আরো আধঘণ্টা পরে তাঁরা যদি বউবাজার হয়ে ইসলামিয়া কলেজে আসতেন তবে তাঁকে মেরে ফেলা হতো।

এই দিনই প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের সূত্র ধরে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। প্রথম দিনের অভিজ্ঞতাটি বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী থেকেই উল্লেখ করা যায়। তিনি লিখেছেন, “বেকার হোস্টেল থেকে মাত্র কয়েকজন কর্মী এসে পৌঁছেছে। আমি ওদের সভাকক্ষ খুলে টেবিল-চেয়ার ঠিক করতে বললাম। কয়েকজন মুসলিম ছাত্রী মন্নুজান হোস্টেল থেকে ইসলামিয়া কলেজে এসে পৌঁছেছে। এরা সবাই মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মী ছিল। এর মধ্যে হাজেরা বেগম, হালিমা খাতুন, জয়নাব বেগম, সাদেকা বেগম তাদের নাম আমার মনে আছে। এরা ইসলামিয়া কলেজে পৌঁছার কয়েক মিনিটের মধ্যে দেখা গেল কয়েকজন ছাত্র রক্তাক্ত দেহে কোনোমতে ছুটে এসে ইসলামিয়া কলেজে পৌঁছেছে। কারও পিঠে ছোরার আঘাত, কারও মাথা ফেটে গেছে। কি যে করব কিছুই বুঝতে পারছি না। কারণ, এ জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। মেয়েরা এগিয়ে এসে বলল, ‘যারা যখম হয়েছে, তাদের আমাদের কাছে পাঠিয়ে দেন। পানির বন্দোবস্ত করেন।’ কোথায় এরা কাপড় পাবে ব্যান্ডেজ করতে? যার যার ওড়না ছিঁড়ে, শাড়ি কেটে ব্যান্ডেজ করতে শুরু করল। কাছেই হোস্টেল, তাড়াতাড়ি খবর দিলাম। এদের ব্যান্ডেজ করেই একজন পরিচিত ডাক্তার ছিলেন তাঁর বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে শুরু করলাম। ...আমাদের কাছে খবর এলো, ওয়েলিংটন স্কোয়ারের মসজিদে আক্রমণ হয়েছে। ইসলামিয়া কলেজের দিকে হিন্দুরা এগিয়ে আসছে। কয়েকজন ছাত্রকে ছাত্রীদের কাছে রেখে আমরা চল্লিশ-পঞ্চাশজন ছাত্র প্রায় খালি হাতেই ধর্মতলার মোড় পর্যন্ত গেলাম। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা কাকে বলে এ ধারণাও আমার ভাল ছিল না। দেখি শত শত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক মসজিদ আক্রমণ করছে। মৌলভী সাহেব পালিয়ে আসছেন আমাদের দিকে। তাঁর পিছে ছুটে আসছে একদল লোক লাঠি ও তলোয়ার হাতে। পাশেই মুসলমানদের কয়েকটা দোকান ছিল। কয়েকজন লোক কিছু লাঠি নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়ালো। আমাদের মধ্য থেকে কয়েকজন ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ দিতে শুরু করলো। দেখতে দেখতে অনেক লোক জমা হয়ে গেল। হিন্দুরা আমাদের সামনাসামনি এসে পড়েছে। বাধা দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। ইট-পাটকেল যে যা পেল তাই নিয়ে আক্রমণ মোকাবেলা করে গেল। আমরা সব মিলিয়ে দেড় শত লোকের বেশি হব না। কে যেন পিছন থেকে এসে আত্মরক্ষার জন্য আমাদের কয়েকখানা লাঠি দিল। এর পূর্বে শুধু ইট দিয়ে মারামারি চলছিল। এর মধ্যে একটা বিরাট শোভাযাত্রা এসে পৌঁছাল। এদের কয়েক জায়গায় বাধা দিয়েছে, রুখতে পারে নাই। তাদের সকলের হাতেই লাঠি। এরা এসে আমাদের সঙ্গে যোগদান করলো। কয়েক মিনিটের জন্য হিন্দুরা ফিরে গেল, আমরাও ফিরে এলাম। পুলিশ কয়েকবার এসে এর মধ্যে কাঁদানে গ্যাস ছেড়ে চলে গেছে। পুলিশ টহল দিচ্ছে। এখন সমস্ত কলকাতায় হাতাহাতি, মারামারি চলছে। মুসলমানরা মোটেই দাঙ্গার জন্য প্রস্তুত ছিল না, এ কথা আমি বলতে পারি।”

কলকাতা শহর তখন লাশের শহরে পরিণত হয়েছে। অনেক বাড়িঘর, দোকানপাট পুড়ছিল। শেখ মুজিব বিভিন্ন আশ্রয় ক্যাম্পের তদারকি করতে থাকেন। রাতে কারফিউ চলে। দেখামাত্র গুলির নির্দেশ আছে। এই অবস্থায় শেখ মুজিব ও সিলেটের মোয়াজ্জেম চৌধুরীর ওপর দায়িত্ব পড়েছে পার্ক সার্কাস ও বালিগঞ্জ এলাকায় মুসলমান বস্তি পাহারা দেওয়ার। হিন্দুরা প্রায় রাতেই এখানে আক্রমণ করে। তাঁরা দুজন বন্দুক চালাতে পারেন বলে তাঁদের ওপরই দেওয়া হয় এই দায়িত্ব। এভাবে শেখ মুজিব এই সংকটের সময় স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

দাঙ্গা শুধু কলকাতাতেই থেমে থাকেনি। শোনা গেল ঢাকাতেও দাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে। এরপর দাঙ্গা ছড়িয়ে যায় নোয়াখালীতে। হিন্দুদের বাড়িঘর লুট হতে থাকে। আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। ওদিকে ভারতের বিহার থেকেও দাঙ্গার খবর আসতে থাকে। সেখানে মুসলমানদের বাড়িঘরে আগুন লাগানো হয়। লুটপাট হতে থাকে। আহত-নিহতের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এ সময় যেহেতু শেখ মুজিব কলকাতায় ছিলেন, তাই স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করার জন্য তাঁকে বিহারে পাঠানো হয়। এখান থেকে শেখ মুজিব প্রায় এক হাজার অসহায় মানুষকে নিয়ে আসানসোলে যান। এখানে প্রায় দেড় মাস তিনি দুস্থ মানুষের পাশে থেকে কাজ করে গেছেন। প্রচুর পরিশ্রমের কারণে একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থ শরীরেই কলকাতায় ফিরে আসেন। এখানে এসে জ্বর আরো বেড়ে গেল। খবর পেয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শেখ মুজিবকে হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিলেন।

হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা তখনো একেবারে থামেনি। এক রবিবার ব্যারাকপুরে গোলমালের খবর পেয়ে সোহরাওয়ার্দী শেখ মুজিবকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হন। সেখানে মহাত্মা গান্ধীও আসেন। তাঁরা প্রথম নারকেলডাঙ্গায় আসেন। এখানে যুক্ত হলেন মহাত্মা গান্ধী, মনু গান্ধী, আভা গান্ধী ও তাঁর সেক্রেটারি এবং কয়েকজন কংগ্রেস নেতা। ইয়াকুব নামে শেখ মুজিবের এক ফটোগ্রাফার বন্ধু কলকাতা শহরে দাঙ্গার অনেক ছবি তুলেছেন। শেখ মুজিব ঠিক করলেন, এখান থেকে কয়েকটি ছবি মহাত্মা গান্ধীকে দেবেন। এগুলোর মধ্যে মুসলমান নারী-পুরুষ ও শিশুদের নির্যাতনের বীভৎস ছবি আছে, যাতে গান্ধীজি প্রকৃত চিত্র বুঝতে পারেন। গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে শেখ মুজিব এই ছবিগুলো দিতে পেরেছিলেন।

তরুণ মুজিবের সংগ্রামী জীবনের এই ধারাবাহিকতাই তাঁকে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় করেছিল। বাঙালির মুক্তির অগ্রদূত হিসেবে তাঁর মাথায় কৃতজ্ঞ বাঙালি পরিয়ে দিয়েছিল ‘বঙ্গবন্ধুর’ মুকুট। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি হয়েছিলেন বাঙালির ‘জাতির পিতা’।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা