kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে অভিজ্ঞতা ও কিছু কথা

এ কে এম শহীদুল হক

১১ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৭ মিনিটে



তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে অভিজ্ঞতা ও কিছু কথা

নির্বাচন এলেই কেয়ারটেকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। টক শো, সভা-সমিতি ও বক্তব্য-বিবৃতিতে পক্ষে-বিপক্ষে ঝড় ওঠে। কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন ছিল? কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হলো? এসব প্রশ্নের জবাব পেতে হলে আমাদের অতীতের দিকে চোখ ফেরাতে হবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর যে নির্বাচনগুলো হয়েছে, সেগুলোর বিশ্লেষণ থেকে আমরা আমাদের প্রশ্নের জবাব পেতে চেষ্টা করব।

সামরিক শাসনামলে জিয়াউর রহমান নির্বাচনের নামে একটির পর একটি প্রহসনের জন্ম দেন। তিনি ১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট সেনাপ্রধানের পদ দখল করেন। সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায়ই তিনি ১৯৭৭ সালের ২১ আগস্ট রাষ্ট্রপতি সাদাত মুহাম্মাদ সায়েমকে সরিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল জিয়াউর রহমানের (সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি) ওপর জনগণের আস্থা আছে কি না, তা যাচাই করার জন্য তিনি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের আয়োজন করেন। ১৯৭৭ সালের  ৩০ মে আস্থা ভোট গ্রহণ করা হয়। প্রহসনের এই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটে ভোটারের হাজিরা দেখানো হয় ৮৮.১ শতাংশ। জিয়াউর রহমানের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট ৯৮.৯ শতাংশ এবং  ‘না’ ভোট ২.১ শতাংশ দেখানো হয়। এ প্রহসনের ভোট দিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংসের সূত্রপাত হয়। এরপর জিয়াউর রহমান সামরিক শাসনের মধ্যে ৩ জুন ১৯৭৮ তারিখে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। ওই নির্বাচনে জিয়াউর রহমান তাঁর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের প্রার্থী হয়ে রাষ্ট্রপতির পদে অধিষ্ঠিত থেকে নির্বাচন করেন। তিনি ৭৬.৬ শতাংশ ভোট পেয়ে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গণতান্ত্রিক ঐক্যজোটের প্রার্থী এম এ জি ওসমানীকে পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

জিয়াউর রহমান দ্বিতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন  ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। ওই নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল অংশগ্রহণ করে। বিএনপি জন্মের সাড়ে পাঁচ মাস পরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। আওয়ামী লীগ ৩৯টি আসনে জয়লাভ করে। মুসলিম লীগ ২০, জাসদ আট এবং স্বতন্ত্র ১৬টি আসনে জয়লাভ করে। বাহ্যিকভাবে ওই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ার আবরণ দেওয়া হলেও তা ছিল পাতানো নির্বাচন। এটা সচেতন মহল বুঝতে ভুল করেনি।

জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিচারপতি সাত্তার প্রায় ১০ মাস এবং আহসানউদ্দিন চৌধুরী এক বছর আট মাস রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত থাকলেও মূলত সেনাশাসনেই দেশ পরিচালিত হয়। এইচ এম এরশাদ তখন সেনাপ্রধান ছিলেন। তিনি ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে অপসারণ করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি হন। একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধানের পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। তিনি  আট বছর একই সঙ্গে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতির পদ দখল করে রেখেছিলেন।

১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরশাদ জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে উর্দি পরে ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার চার মাস পর ৭ মে অনুষ্ঠিত তৃতীয়  জাতীয় সংসদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ১৫৩ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী জয়ী হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী  জয়লাভ করেন ৭৬টি আসনে। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। জামায়াতে ইসলামী ১০টি আসনে জয়লাভ করে। সামরিক সরকারের আমলে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হবে—এ ধারণা পোষণ করেই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ  হাসিনা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।

আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে তা বাতিলের দাবি জানায়। শেখ হাসিনা সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সব সদস্য পদত্যাগ করলে ১৯৮৭ সালের ৬ ডিসেম্বর  এরশাদ সংসদ ভেঙে দেন। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চে চতুর্থ সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ওই নির্বাচন বয়কট করে। এরশাদের জাতীয় পার্টি, আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে গঠিত সম্মিলিত বিরোধী দল (সম্ভবত ৭০ দলের মোর্চা), ফ্রিডম পার্টি, জাসদ (সিরাজ)সহ কিছু দল নির্বাচনে অংশ নেয়। ভোটারের উপস্থিতি দেখানো হয় ৫২.৫ শতাংশ। জাতীয় পার্টি ২৫১ আসনে, আ স ম রবের সম্মিলিত বিরোধী দল (Combined Opposition Party) ১৯টি আসনে,  ফ্রিডম পার্টি দুটি আসনে,  জাসদ তিনটি আসনে এবং ২৫টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হন। এ নির্বাচনও একটি প্রহসনমূলক নির্বাচন ছিল। বিরোধী দলগুলো পার্লামেন্ট বাতিলের আন্দোলন শুরু করে। একই সঙ্গে স্বৈরাচারী সামরিক এরশাদ সরকারের পদত্যাগ দাবি করে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল সর্বাত্মক আন্দোলন অব্যাহত রাখে। আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নেয়। আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পদত্যাগের মাধ্যমে স্বৈর সরকারের পতন হয়। প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

আন্দোলনের সব রাজনৈতিক দল; যেমন—আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও অন্যরা একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য একমত হয়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হয়। ১৯৯০ সালের ৯ ডিসেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ১৭ জন উপদেষ্টার শপথ হয়। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তত্ত্বাবধানে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

বিএনপি জয়লাভ করে ১৪০ আসনে, আওয়ামী লীগ ৮১টি আসনে, জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসনে, জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসনে, বাকশাল পাঁচটি আসনে, কমিউনিস্ট পার্টি পাঁচটি আসনে, ছয়টি দল ছয়টি আসনে এবং স্বতন্ত্র তিনটি আসনে জয়লাভ করে।

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পঞ্চম পার্লামেন্ট নির্বাচন ১৯৭৫ সালের পর সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছিল। দেশি-বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক সবাই এ নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ বলে অভিহিত করেছেন। তবে আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনকে সূক্ষ্ম কারচুপির নির্বাচন বলে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এরশাদ ও তাঁর দল জাতীয় পার্টি এ নির্বাচনে নিরপেক্ষ আচরণ পায়নি বলে অভিযোগ উঠেছিল।

বিএনপি আমলে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচন কমবেশি প্রশ্নবিদ্ধ ছিল, বিশেষ করে ১৯৯৪ সালের মাগুরা-২ আসনে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে বিএনপি ভোট কারচুপির যে নজির স্থাপন করেছিল, তা দেশে গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি ন্যক্কারজনক ঘটনা এবং কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে মাগুরা-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়লাভ করে। তাঁর মৃত্যুতে আসন শূন্য হলে ১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ এ আসনে উপনির্বাচন হয়। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে ব্যাপক কারচুপি হয়। কেন্দ্র দখল, জোরপূর্বক ব্যালট পেপারে সিল মারা, আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া এবং ব্যালট পেপারের বাক্স ছিনতাই করে বিএনপি কারচুপির সব রেকর্ড ভঙ্গ করে ইতিহাস তৈরি করেছিল। আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল বিএনপি সরকারের পদত্যাগ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে এবং ঘোষণা দেয় যে বিএনপি সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করবে না। আন্দোলনের অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগের সব সদস্য একযোগে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল সরকারের পতন এবং তত্ত্বাবধায়ক  সরকারের দাবিতে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর করতে থাকে। ১৯৯৪ সালের ১৩ অক্টোবর কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফান দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আপসহীন আন্দোলনের মধ্যেও বিএনপি অনড় অবস্থানে থেকে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়। আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল নির্বাচন বয়কট করে। বিএনপি এককভাবে নির্বাচন করে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৯টি আসনে জয়লাভ করে, বাকি ১০টি স্বতন্ত্র এবং একটি আসনে এনডিএ জয়লাভ করে। ভোটারের উপস্থিতি ছিল ২১ শতাংশ। প্রকৃতপক্ষে ৩০০ আসনে বিজয়ী প্রার্থীরা নেপথ্যে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ছিলেন। আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল প্রহসনের নির্বাচন বাতিল করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখে। আন্দোলনের মধ্যে ষষ্ঠ সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১৯৯৬ সালের ১৯ মার্চ সংবিধানের ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রবর্তন করা হয়। ৩০ মার্চ সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন এবং বিচারপতি হাবিবুর রহমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হন।

বিচারপতি হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম পার্লামেন্ট নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬ আসনে, বিএনপি ১১৬ আসনে, জাতীয় পার্টি ৩২ আসনে এবং জামায়াতে ইসলামী তিন আসনে জয়লাভ করে। ইসলামী ঐক্যফ্রন্ট, জাসদ (রব) ও স্বতন্ত্র একটি করে আসন পায়। ভোটার টার্ন আউট ৭৫.৬ শতাংশ। বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সার্বিক কার্যক্রমে তেমন কোনো অভিযোগ বা বিতর্ক ছিল না। সপ্তম সংসদ নির্বাচন সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য ছিল। তবে সামরিক অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা ছিল, যা সফল হয়নি।

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিচারপতি লতিফুর রহমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩ আসনে, আওয়ামী লীগ ৬২ আসনে, জাতীয় পার্টি ১৮ আসনে এবং জামায়াতে ইসলামী ১৭ আসনে জয়লাভ করে। বাকি ১৭টি আসনে ছোট ছোট দল জয়লাভ করে।

বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নবিদ্ধ সরকার ছিল। ওই সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার ভূমিকাও পক্ষপাতমূলক ছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের বিপক্ষে কাজ করার অভিযোগ ওঠে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা নিয়ে গণমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

আমি নিজেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষপাতমূলক ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করেছি। তখন আমি চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার ছিলাম। সরকারের উঁচু মহল থেকে বেশির ভাগ নির্দেশনা কৌশলগতভাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ছিল। পুলিশ সুপার পদের একজন কর্মকর্তা, যিনি স্পেশাল ব্রাঞ্চে ছিলেন, তাঁর ভূমিকা পক্ষপাতমূলক ছিল। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তিনি আমাকে একাধিকবার কতগুলো সন্ত্রাসী তালিকা ফ্যাক্সে পাঠিয়ে তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে নির্দেশ দেন। তিনি যাদের তালিকা পাঠাতেন, তারা সবাই ছিল আওয়ামী লীগের কর্মী ও অঙ্গসংগঠনের সদস্য। আমি একবার তাঁকে বললাম, ‘স্যার, আপনি তো আমাকে শুধু আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের তালিকা দিয়েছেন। আমার কাছে তো সব দলের সন্ত্রাসীদের তালিকা আছে। আমি জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে সব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছি।’

বিএনপি-জামায়াত সরকারের মেয়াদ ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর শেষ হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার কথা। সংবিধান অনুযায়ী সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার বিধান ছিল। কে এম হাসান সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। কে এম হাসান হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে বিএনপি নেতা ছিলেন এবং বিএনপির প্রতি তাঁর আনুগত্য থাকায় বিচারপতিদের অবসরের বয়স দুই বছর বৃদ্ধি করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল কে এম হাসান যেন অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে পারেন। আওয়ামী লীগ কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেনে নিতে নারাজ ছিল। আওয়ামী লীগের আন্দোলন অব্যাহত থাকে। কোনো সমঝোতা না হওয়ায় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। তিনি ১০ জন উপদেষ্টা নিয়োগ দেন।

আওয়ামী লীগ ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেও মেনে না নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যায়। দেশে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। ওই অবস্থায় সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে। ইয়াজউদ্দিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং ফখরুদ্দীনকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়। ২০০৭ সালের ১২ জানুয়ারি ফখরুদ্দীন শপথ নেন। তিনি ১০ জন উপদেষ্টা নিয়োগ দেন। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়ন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়ে কার্যক্রম শুরু করে।

সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানের স্লোগান তুলে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। রাজনীতিবিদদের চরিত্র হরণ করার জন্য নানা রকম অপপ্রচার চালায়। মাইনাস টু ফর্মুলা গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করে। পরবর্তী সময়ে তদন্তে বেশির ভাগ মামলা মিথ্যা ও সাজানো প্রমাণিত হয়। জনসমক্ষে তাঁদের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করার মানসেই ওই অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। বিশিষ্ট ব্যবসায়ীরাও নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। তখন দেশে একটা অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছিল। অনেক রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী ভয়ে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। ওই সময়েও কিছু সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ ও সুধীসমাজের সদস্য ব্যক্তিস্বার্থে অসাংবিধানিক সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট জয়লাভ করে ২৩০টি আসনে, বিএনপির নেতৃত্বে জোট জয়লাভ করে ৩০টি আসনে, জাতীয় পার্টি জয়লাভ করে ২৭টি আসনে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। প্রদত্ত ভোটের ৪৯ শতাংশ আওয়ামী লীগ জোট, ৩৩.২০ শতাংশ বিএনপি জোট এবং ৭ শতাংশ জাতীয় পার্টি পায়।

দেশে-বিদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও সচেতন নাগরিকরা নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলে মতামত দিলেও বিএনপি এ নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ করে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের মধ্যে যতগুলো নির্বাচন হয়েছিল, তা ছিল প্রহসনের নির্বাচন। সেগুলো অবাধ ও নিরপেক্ষতার ধারেকাছেও ছিল না। এরশাদ আমলের শেষ দিকে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল এই মর্মে একমত হয় যে স্বৈরাচার এরশাদকে ক্ষমতায় রেখে কোনোভাবেই  সুষুম, অবাধ ও  নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না। তাই তারা একমত হয় যে সুষ্ঠু,  অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য স্বৈরাচার এরশাদের পদত্যাগ করাতে হবে এবং নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। সে লক্ষ্যে তারা আন্দোলন শুরু করে এবং আন্দোলন যখন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয় তখন এরশাদ ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন। সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন। তিনি ১৭ জন উপদেষ্টা নিয়োগ দেন। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি সুষুম ও অবাধ নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। এই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল। তাদের আমলের নির্বাচনগুলো প্রশ্নাতীত ছিল না। বিশেষ করে মাগুরা উপনির্বাচনে বিএনপি যেভাবে কারচুপি ও ভোট ডাকাতি করেছে, তা ছিল নজিরবিহীন। এ কারণে আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করেছিল। তারা ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি অব্যাহত রাখে। বিএনপি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলেও শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তন করে।

সংবিধানে প্রবর্তিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ২০০১ সালেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয় এবং বিএনপি ক্ষমতায় আসে। ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং ২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারও বিতর্কিত ছিল। ২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হয়রানিমূলক আচরণে রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরা মানসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও  আর্থিকভাবে খতিগ্রস্ত হন। তাঁরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে অসাংবিধানিক সরকার দেখতে চান না। তাঁদের বক্তব্য, সাংবিধানিক সরকার থাকলে তাঁরা অন্যায় ও বেআইনি হয়রানির বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন। রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ বা আরজি নিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু অসাংবিধানিক সরকারের সময় তা পারেন না। কারণ অসাংবিধানিক সরকারের জনগণের কাছে কোনো জবাবদিহি থাকে না।  অসাংবিধানিক সরকারের আমলে তাঁরা কোনো অন্যায়ের প্রতিকার পান না।

এটাও লক্ষ করা গেছে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হওয়ার বিধান থাকার কারণে বিচার বিভাগে দলীয়করণ করা হয়েছিল। ২০১১ সালের ১০ মে সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অসাংবিধানিক হিসেবে রায় দেন। সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারে বিচারপতিদের অন্তর্ভুক্ত করার বিপক্ষেও রায় দেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে নবম জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়।

পাকিস্তান ও গ্রিস ছাড়া বিশ্বের কোথাও তত্ত্বাবধায়ক সরকার নেই। পাকিস্তানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারও ভীষণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। সব দেশেই নির্বাচিত সরকারই নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এবং সুষুম, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটাই কাম্য। যে ব্যবস্থা বিতর্কিত হওয়ার কারণে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সংসদ কর্তৃক বাতিল হয়েছে, তা পুনঃপ্রবর্তনের সুযোগ নেই, যুক্তিও নেই।

গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় জনগণের প্রতিনিধিরা জনস্বার্থে দেশ পরিচালনা করবেন। নিরপেক্ষ নির্বাচন ছাড়া প্রকৃত জনপ্রতিনিধি নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অবশ্যই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি এবং গণতন্ত্রে উত্তরণের সোপান। কিন্তু শুধু নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। আমরা ধরে নিই যে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচন, ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচন এবং ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুুষুম ও নিরপেক্ষ হয়েছে। কিন্তু তাতে কি বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে? বিজয়ী দলের নেতাকর্মীরা কি গণতান্ত্রিক আচরণ করেছে? আমরা কী দেখলাম? ১৯৯৪ সালের মাগুরার উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি কি আমরা দেখিনি? ২০০১ সালের নির্বাচনের পরপরই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নৃশংস হামলা, জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাদের একের পর এক পরিকল্পিতভাবে হত্যা, ২১ আগস্টে আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনাসহ সব নেতাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার উদ্দেশ্য নিয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করে ২৪ জনকে হত্যা ও তিন শতাধিক নেতাকর্মীকে গুরুতর আহত করা এবং জঙ্গিদের মদদ দেওয়ার ঘটনাও জাতি দেখেছে। সংসদকে কার্যকর করার জন্য সংসদ সদস্যদের আগ্রহ ও গঠনমূলক ভূমিকা আমরা প্রত্যক্ষ করিনি।

গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি থাকা প্রয়োজন, যাতে নেতাকর্মীরা গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। কর্ম ও আচরণে গণতান্ত্রিক দৃষ্টান্তের প্রতিফলন ঘটিয়ে সবার মধ্যে পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সমাজ, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিজীবনে গণতন্ত্র চর্চা করতে হবে এবং গণতান্ত্রিক মানসিকতাসম্পন্ন হতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে প্রকৃত অর্থেই স্বাধীন ও ক্ষমতায়ন করতে হবে। গণতন্ত্র এবং দেশ ও জাতীয় স্বার্থে নির্বাচনকালে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য সংবিধানের আওতায় একটি সুষুম, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে দল-মত-নির্বিশেষে সবাইকে অবদান রাখতে হবে। এভাবেই গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে এবং জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধিদের দ্বারা দেশ পরিচালিত হবে।

লেখক : সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ

মন্তব্য