টানা বৃষ্টি, অতিরিক্ত জোয়ার আর পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে, বিশেষ করে বরিশাল ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। এ ছাড়া সিলেটে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বাড়লেও লালমনিরহাটে তিস্তার পানি কিছুটা কমেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কালের কণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
বরিশাল : কীর্তনখোলা, তেঁতুলিয়া, কালাবদর, মাছকাটা, মেঘনা, বিষখালীসহ বিভাগের বেশ কয়েকটি নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি ও বসতভিটা।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের নদীর তীরবর্তী প্রায় ১৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে ভাঙন রোধে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে পাউবো। এ ছাড়া ১০২ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে ঝুঁকির মুখে। ১৪ হাজার ৯৩২ হেক্টর জমির ফসল এখনো পানিতে নিমজ্জিত।
কালাবদর, মাছকাটা ও মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে বরিশালের হিজলা উপজেলার থানারঘাট, লঞ্চঘাট, হরিনাথপুর, দুর্গাপুর ও গৌরবদী ইউনিয়ন। মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালিয়া, চরগোপালপুর, আন্দারমানিক, দোরীর চর, খাজুরিয়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকাও রয়েছে ঝুঁকির মুখে। কালাবদর ও মাছকাটা নদীর গত চার দিনের ভাঙনে মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের ১,৩ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অর্ধশতাধিক বসতঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মসজিদ বিলীন হয়ে গেছে।
জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য আলতাফ হোসেন মির গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু হওয়া ভাঙনে এখন পর্যন্ত আমার বসতঘরসহ অন্তত ২০টি ঘর নদীর মধ্যে চলে গেছে।’
একই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য হারুন হাওলাদার জানান, তাঁর ঘরসহ অন্তত ৩০টি ঘর এবং একটি মসজিদ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
আন্দারমানিক এলাকার গাজী মহিউদ্দিন বলেন, ‘দুটি ভাঙনের সম্মুখীন হওয়ার পর ফের পাকা ঘরবাড়ি ও ধানি জমি করি। গত সপ্তাহের ভাঙনে সবকিছুই চোখের সামনে তলিয়ে গেছে।’
শুধু মেঘনাই নয়, কীর্তনখোলা, কালাবদর, আড়িয়ালখাঁ, সন্ধ্যা, তেঁতুলিয়া, কারখানা ও সুগন্ধা নদ-নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বরিশালের বিস্তীর্ণ এলাকা। কীর্তনখোলা নদীর ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চরবাড়িয়া ও শায়েস্তাবাদ ইউনিয়ন। সেখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরও বর্ষা মৌসুমে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বরিশাল বিভাগের (দক্ষিণাঞ্চল) প্রধান প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভুঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নদীভাঙন সব সময়ই থাকে। তবে বর্ষার মৌসুমে বেশি ভাঙে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আমরা চিহ্নিত করেছি। জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধের পাশাপাশি স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য কয়েকটি বড় প্রকল্প প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাড়ছে পদ্মার ভাঙন
চাঁপাইনবাবগঞ্জে দুই সপ্তাহ ধরে বাড়ছে পদ্মা, মহানন্দা, পুনর্ভবা, পাগলাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি। এখনো বিপৎসীমার অনেক নিচে থাকলেও বৃদ্ধির হার বেশ দ্রুত। এর সঙ্গে সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে পদ্মা নদীর তীর ভাঙন।
শিবগঞ্জের দুর্লভপুর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম আজম বলেন, পদ্মাপারের খাকসাপাড়া, মনোহরপুর, দোভাগি ঘাইপাড়া এলাকায় ভাঙন তীব্র। খাকসাপাড়া থেকে আটটি পরিবার সরিয়ে নিতে হয়েছে। পাকা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক বলেন, ৫ নম্বর ওয়ার্ড ক্রমাগত ভেঙে পদ্মায় প্রায় বিলীন হয়েছে। এখন ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভাঙন চলছে। গত চৈত্র মাস থেকে এসব এলাকার শতাধিক বাড়ি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সদরের নারায়ণপুর ইউপি চেয়ারম্যান নাজির হোসেন বলেন, পদ্মাপারের ১, ৩, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে পুরনো ভাঙন আবার শুরু হয়েছে।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র বলছে, মৌসুমি এই বৃদ্ধি স্বাভাবিক। উজানে ভারতে বৃষ্টি ও ধেয়ে আসা পানির ঢল এর মূল কারণ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দেশে মৌসুমি বৃষ্টিপাত।
ফারাক্কা বাঁধের অদূরে বাংলাদেশের পাংখা পয়েন্টে পদ্মার বিপৎসীমা ২২.০৫ মিটার। গতকাল সকালে ওই পয়েন্টে পানি ১৮.৪৯ মিটারে প্রবাহিত হচ্ছিল। ২৪ ঘণ্টায় প্রবাহ ৯ সেন্টিমিটার বেড়েছে।
শহরঘেঁষা মহানন্দা নদীর বিপৎসীমা ২০.৫৫ মিটার, গতকাল এর পানি ১৭.০৩ মিটারে প্রবাহিত হচ্ছিল। ২৪ ঘণ্টায় প্রবাহ ১৭ সেন্টিমিটার বেড়েছে।
ফুঁসছে সিলেটের নদ-নদী
ভারতের আসামে বন্যা পরিস্থিতির কারণে ফের পাহাড়ি ঢল বেড়ে সিলেটের নদ-নদী ফুঁসে উঠতে শুরু করেছে।
পাউবোর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর পানি গতকাল সকাল ৬টায় বিপৎসীমার পয়েন্ট ৩৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে সন্ধ্যায় তা দুই পয়েন্ট কমেছে। অন্য কয়েকটি পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার একেবারে কাছাকাছি।
কানাইঘাটে সুরমা নদীর পানি সকাল ৬টায় বিপৎসীমার মাত্র ৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও সন্ধ্যায় তা আরো ১৩ পয়েন্ট কমেছে। জকিগঞ্জের অমলসিদে কুশিয়ারা সকাল ৬টায় বিপৎসীমার মাত্র ৫ সেন্টিমিটার নিচে ছিল, যা সন্ধ্যায় আরো পয়েন্ট ৬ সেন্টিমিটার কমেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, ‘ভারতের আসামের বন্যার পানি নামছে। এ কারণে সুরমা ও কুশিয়ারায় পানি বেড়েছে। তবে আপাতত নতুন করে সিলেট কিংবা ভারতের আসাম, মেঘালয়ে ভারি বর্ষণের কোনো পূর্বাভাস নেই। তাই সিলেট অঞ্চলে আপাতত বন্যার আশঙ্কা নেই।’
আবার কমেছে তিস্তার পানি
লালমনিরহাটে বৃহস্পতিবার দিন শেষে তিস্তা নদীর পানি নতুন করে বৃদ্ধি পেলেও গতকাল সকাল থেকে আবারও কমেছে। গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তা ব্যারাজ (ডালিয়া) পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর আগের দিন একই সময়ে পানিপ্রবাহ ছিল বিপৎসীমার সাত সেন্টিমিটার নিচে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এই তথ্য জানায়।
এদিকে আগামী তিন দিন তিস্তার পানি হ্রাস পেতে পারে বলে গতকাল জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

