• ই-পেপার

বরিশাল বিভাগে ১৫০ কিলোমিটারজুড়ে নদীভাঙন

  • চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাড়ছে পদ্মার ভাঙন
  • সুরমা, কুশিয়ারায় পানি বাড়লেও তিস্তায় কমেছে

রণধীর জয়সওয়াল

বাংলাদেশের নতুন কূটনীতিকদের সঙ্গে কাজে আগ্রহী ভারত

কালের কণ্ঠ ডেস্ক
বাংলাদেশের নতুন কূটনীতিকদের সঙ্গে কাজে আগ্রহী ভারত
রণধীর জয়সওয়াল

বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আগ্রহী ভারত। নয়াদিল্লি ও কলকাতায় বাংলাদেশের মিশনগুলোতে নতুন দুজন কূটনীতিকের নিয়োগ নিয়ে ওঠা বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত। গতকাল শুক্রবার  ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়  থেকে এ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।

তবে ওই দুই কর্মকর্তার অতীতের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কর্মকাণ্ড নিয়ে মন্তব্যে রাজি হয়নি দিল্লি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল মন্ত্রণালয়ের দ্বিসাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমাদের জানানো হয়েছে যে দুজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমরা আমাদের সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে কাজ করার

প্রত্যাশা করছি।’

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে করা এক প্রশ্নের জবাবে জয়সওয়াল এই প্রতিক্রিয়া জানান। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন ও কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশনে প্রেস উইংয়ের কর্মকর্তা বা মুখপাত্র হিসেবে যে দুজন সাংবাদিককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা অতীতে ভারতের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘কঠোর সমালোচনামূলক’ পোস্ট শেয়ার করেছিলেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নিয়োগের বিষয়টি ‘কূটনৈতিক মহলে বিস্ময়’ সৃষ্টি করেছে। একটি সংবাদপত্র জানিয়েছে, নিয়োগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার পর গত মঙ্গলবার ওই দুই সাংবাদিকের বেশ কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পোস্ট মুছে ফেলা হয়েছে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তিকে উদ্ধৃত করে একটি সংবাদপত্র লিখেছে, ‘বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নেওয়া এই সিদ্ধান্তগুলো অদ্ভুত। বিশেষ করে যখন দুই দেশ গত দুই বছরের টানাপোড়েন কাটিয়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনে মনোযোগ দিচ্ছে, তখন এমন পছন্দ প্রশ্নবিদ্ধ।’

তবে রণধীর জয়সওয়াল এসব বিতর্ক নিয়ে সরাসরি কোনো উত্তর দেননি এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে নতুন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করার সদিচ্ছার মধ্যেই বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখেন।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আসা একটি খবরের বিষয়েও প্রশ্ন করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়েছিল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে জয়সওয়াল বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে পরে আপনাদের বিস্তারিত জানাব।’

যশোরে ছুরি-চাকু আতঙ্ক, ১৮ খুনের ৯টিই গলা কেটে

আকরামুজ্জামান, যশোর
যশোরে ছুরি-চাকু আতঙ্ক, ১৮ খুনের ৯টিই গলা কেটে

যশোরে অপরাধের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় হত্যা বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আগ্নেয়াস্ত্র ও বোমার ব্যবহার বেশি থাকলেও এখন সেই জায়গা দখল করেছে ছুরি, চাকু, চাপাতিসহ বিভিন্ন ধারালো অস্ত্র। হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলদারি থেকে শুরু করে নারী হয়রানির মতো ঘটনাতেও বাড়ছে ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার। একের পর এক গলা কেটে হত্যা, কুপিয়ে খুন, প্রকাশ্যে ছুরি ঠেকিয়ে ছিনতাই এবং সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসের ঘটনায় জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ।

চলতি বছরের ২৩ জুলাই পর্যন্ত যশোর জেলায় অন্তত ১৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ৯টিতে ভুক্তভোগীকে হত্যা করা হয়েছে গলা কেটে। বাকিগুলোতে কুপিয়ে, পিটিয়ে আর গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে—মাদক ব্যবসা, রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিগত শত্রুতাই এসব হত্যাকাণ্ডের প্রধান কারণ। তবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই অপরাধ সংঘটনে ব্যবহৃত হয়েছে ধারালো অস্ত্র।

সর্বশেষ ২৩ জুলাই যশোর শহরের বারান্দিপাড়ায় একটি বসতবাড়িতে ঢুকে চাঁদা দাবি ও এক নারীকে যৌন নিপীড়নের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিক মামলার আসামি জিতু (৩৫) কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে চাঁদা দাবি ও নারীদের হয়রানির

চেষ্টা করে। বাধা দিলে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন তিনি। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে নড়াইলের তুলারামপুর এলাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।

এর আগে ১৩ জুলাই বাঘারপাড়া উপজেলায় যুবদল নেতা রুবেল হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় বিক্ষোভ চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তির বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।

২৪ জুন সদর উপজেলার রঘুরামপুর গ্রামের বাড়ির পাশের ঝোপ থেকে সাইদ সরদার ওরফে ‘চশমা সাইদ’ (৩২) নামে এক যুবকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তে পুলিশ জানিয়েছে, মাদক ব্যবসা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড।

২১ জুন চৌগাছা উপজেলার বেড়গোবিন্দপুর বাঁওড়ের খাল থেকে বিএনপি কর্মী আতিয়ার রহমানের (৪২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তে তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত ও গলা কাটার আলামত পাওয়া যায়। পরিবারের দাবি, মৎস্যঘেরের লিজ ও বাঁওড়কেন্দ্রিক বিরোধের জেরেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।

৮ জুন সদর উপজেলার শেখহাটিতে বিয়ের ছয় মাসের মাথায় স্ত্রী সামিনা আক্তার শাম্মীকে গলা কেটে হত্যা করেন স্বামী সুজন। পুলিশ বলছে, মাদক সেবনের টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। একই দিন রাতে মণিরামপুর উপজেলার শরমপুর গ্রামে নাতনিকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় ইমামুল হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে ২২ এপ্রিল শহরের বেজপাড়ায় শাশুড়ি সকিনা বেগমকে চাপাতি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে লাশ বস্তাবন্দি করে বাড়ির সামনে ফেলে রাখে পুত্রবধূ।

শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, যশোর শহরে ছুরি ঠেকিয়ে ছিনতাইও বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। প্রকাশ্যে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নির্জন সড়ক, রিকশায় চলাচলকারী দম্পতি, তরুণ-তরুণী এবং নিঃসঙ্গ পথচারীদের টার্গেট করছে।

গত ৩ জুলাই ভোরে রেলগেট এলাকায় রাকিব নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাত করে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ১৩ জুলাই উপশহর কলেজের সামনে যাত্রীবেশে অটোরিকশায় উঠে চালক আশরাফুজ্জামান বাবুকে নির্জন এলাকায় নিয়ে ছিনতাইয়ের চেষ্টা চালায় দুই যুবক।

এর আগে ২ জুন শহরের মুজিব সড়কে কলেজশিক্ষার্থী সানি ও তাঁর বান্ধবীকে মোটরসাইকেলে এসে ঘিরে ধরে দুই যুবক। প্রথমে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। পরে চাকু দেখিয়ে টাকা, মোবাইল ফোন, ব্যাংক কার্ড ও পাসওয়ার্ড আদায়ের চেষ্টা করা হয়।

শহরের বিভিন্ন এলাকায় সাংস্কৃতিককর্মী, শিক্ষক ও সাধারণ পথচারীদের অনুসরণ করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি শহর ও শহরতলীতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বাসাবাড়িতে চুরি, এমনকি অব্যবহৃত এসির তামার পাইপ ও তার চুরির ঘটনাও বেড়েছে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করলে অস্ত্র আইনের মামলার ঝুঁকি থাকে। তাই অপরাধীরা সহজলভ্য ছুরি-চাকুকেই বেশি ব্যবহার করছে। গত কয়েক বছরের অপরাধ বিশ্লেষণেও এ প্রবণতা স্পষ্ট।

যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, অপরাধীরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৌশল বদলাচ্ছে। বর্তমানে অধিকাংশ অপরাধে ছুরি ও চাকুর ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো অনলাইনে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। অধিকাংশ ঘটনার রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে এবং অনেক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শহরে টহল ও চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে। বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও দ্রুত ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।

যশোর পৌর নাগরিক উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু অপরাধ দমন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ঘাটতি রয়েছে কার্যকর পদক্ষেপের।

 

৯ ধরনের অপরাধের শিকার নারী ও শিশু

১৮ মাসে ধর্ষণ-নির্যাতনে ৬০৩ শিশু নিহত জুনে ৩৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার

রেজোয়ান বিশ্বাস
৯ ধরনের অপরাধের শিকার নারী ও শিশু

দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণ-নির্যাতনে নারী ও শিশু নিহত হওয়ার ঘটনা বেড়েছে। পুলিশের তথ্য মতে, সামাজিকভাবে ৯ ধরনের অপরাধের শিকার হচ্ছে নারী ও শিশু। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১৮ মাসে দেশে এ ধরনের অপরাধমূলক ঘটনায় ৬০৩ শিশু নিহত হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে নিহত ৩৩ জনের বেশি। এই সময়ে দুই হাজার ৫৪৭ শিশু আহত হয়। শিশু নির্যাতনে মাদরাসার একাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া যায়। এ ছাড়া পুলিশের প্রতিবেদনেও প্রায় একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর বাইরেও অনেক ঘটনা গ্রাম্য সালিশ বা লোকলজ্জার ভয়ে ভুক্তভোগীরা প্রকাশ করে না।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, নারী-শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

অন্যথায় সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে।

পুলিশ সদর দপ্তরের চলতি বছরের পাঁচ মাসের অপরাধবিষয়ক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, এসব ঘটনায় বিভিন্ন থানায় প্রায় আট হাজার মামলা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই সময়ে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১০ হাজার ৮৩০ নারী ও শিশু। নির্যাতনের পর ২৮৮ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। ১২১ নারী ও শিশু আহত হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ওই পরিসংখ্যানের তথ্য বলছে, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৯ ধরনের অপরাধের শিকার হয়েছে ২৮ হাজার ৬৩৩ নারী-শিশু। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩৪ হাজার ৯৪৬টি। এতে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে ৯৭ হাজার ৭৫০ জনকে।

পুলিশের তথ্য বলছে, নারী-শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় করা বেশির ভাগ মামলার তদন্ত শেষ হয়নি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এর মধ্যে শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনে জড়িতদের গ্রেপ্তারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আরো তৎপর হতে বলা হয়েছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির বলেন, সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ তৎপর রয়েছে। ধর্ষণ-নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ দমনে নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

গত ছয় মাসে এক হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে জানানো হয়। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল এক হাজার ৪২। অর্থাৎ নির্যাতনের ঘটনা প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে।

এইচআরএসএসের তথ্য মতে, গত জুন মাসে দেশে ৩৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১০৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার এবং ৭৫ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। ১৯ জন নারী ও কন্যাশিশু দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণের পর দুই কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে।

অন্যদিকে ৯৪ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার। এর মধ্যে রয়েছে ৪৯ শিশু। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত চারজন, আহত চারজন এবং আত্মহত্যা দুই নারীর। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছে ৫৭ জন, আহত ৪৮ জন এবং আত্মহত্যা করেছে ৩৬ জন নারী।

এইচআরএসএসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ মাসে সারা দেশে অন্তত এক হাজার ৮৯০ শিশু নির্যাতনের শিকার। এর মধ্যে ৪৮৩ শিশু নিহত ও এক হাজার ৪০৭ শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার। এসব শিশুর মধ্যে ৫৮০ জন ধর্ষণ ও ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার।

এসব ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম এসব শিশু হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনায় নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত দোষীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের পাঁচ মাসে দেশে হত্যার ঘটনায় এক হাজার ৪৫২টি মামলা হয়েছে। এ সময় নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সাত হাজার ৯১০টি মামলা হয়। এর মধ্যে জানুয়ারিতে এক হাজার ২৮১টি, ফেব্রুয়ারিতে এক হাজার ১৮১টি, মার্চে এক হাজার ৪৮৫টি, এপ্রিলে দুই হাজার ১১টি ও জুনে এক হাজার ৯৫২টি মামলা হয়।

আলোচিত সাম্প্রতিক ঘটনা : গত ২৫ জুন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় ছয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে কওমি মাদরাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ২৩ জুন ময়মনসিংহের ত্রিশালে আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে এক ইমামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গত ২৪ মে রাজধানীর কলাবাগান এলাকায় আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসাকে নির্মমভাবে ধর্ষণ-হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়। গত ১৬ মে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের চান্দের চর গ্রামের মদিনাপাড়ায় আছিয়া আক্তার নামের ১০ বছরে বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। গত ১৯ মে রাজধানীর রামপুরায় ১০ বছর বয়সী এক মাদরাসা শিক্ষার্থীকে বলাৎকার ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ ওঠে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, একের পর এক শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা প্রমাণ করে যে শিশু সুরক্ষায় বিদ্যমান ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর নয়। এ ছাড়া বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ শিশু নির্যাতনের মতো পাশবিক সহিংসতা বৃদ্ধি ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র প্রকাশ করছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, দেশে ধারাবাহিকভাবে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধ প্রতিরোধ, দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর জবাবদিহির ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার কোনো স্থান থাকতে পারে না। সম্প্রতি কক্সবাজারে মা ও মেয়েকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় আসকের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

চালু হচ্ছে কুমিল্লা বিমানবন্দর

অচল রানওয়ে সচল রাজস্ব

জাহিদ পাটোয়ারী, কুমিল্লা
অচল রানওয়ে সচল রাজস্ব

প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা কুমিল্লা। রেমিট্যান্সেও দেশসেরা। দেশি-বিদেশি শিল্প-কারখানায়ও ঠাসা। আছে বিমানবন্দরও। তবে ৩২ বছর ধরে এই বিমানবন্দরে ওড়েনি কোনো বিমান। যদিও সচল রয়েছে বন্দরের কার্যক্রম। এই বিমানবন্দর থেকে প্রতি মাসে সরকার আয় করছে মোটা অঙ্কের রাজস্ব। রানওয়ে কার্পেটিং, ফায়ার ব্রিগেড, এয়ারক্রাফটের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য টাওয়ারে বিএইচএফ সংযুক্ত করাসহ কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলেই এ বিমানবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচলে বাধা থাকবে না বলে জানিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

এদিকে দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটন সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের আটটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর পুনরায় চালুর মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এ তালিকায় কুমিল্লা বিমানবন্দরের নামও রয়েছে বলে জানা গেছে। বাকি সাতটি হলো বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, ঈশ্বরদী, শমশেরনগর (মৌলভীবাজার), খানজাহান আলী (বাগেরহাট) ও পটুয়াখালী বিমানবন্দর।

কুমিল্লা বিমানবন্দর সূত্র মতে, ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নেউরা-ঢুলিপাড়ার পাশে স্থাপিত হয় কুমিল্লা বিমানবন্দর। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে এই বিমানবন্দর ব্যবহার করত সেনাবাহিনী। একই বছর বন্দরটি

সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এরপর ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর বিমান ওঠানামা করে এই বিমানবন্দরে। যাত্রীসংকটে তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৯৯৪ সালে ফের বিমানবন্দরটি চালু করা হলেও পর্যাপ্ত যাত্রী না হওয়ায় মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে এয়ারলাইনসগুলো বিমান ওঠানামা বন্ধ করে দেয়। ওই সময়ে আন্তর্জাতিক কোনো ফ্লাইট চালু না থাকলেও মূলত দেশের অভ্যন্তরের ফ্লাইটগুলো চালু ছিল এ বন্দরে। এরপর ৩২ বছর ধরে এ বিমানবন্দরে বিমান না উড়লেও সচল রয়েছে কার্যক্রম।

এদিকে বিমান ওঠানামা না করলেও এই বন্দরের ডিভিওআর ও ডিএমই সিগন্যাল ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের বিমান থেকে প্রতি মাসে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব আয় করছে সরকার। প্রতিদিন এই বিমানবন্দর থেকে সিগন্যাল ব্যবহার করে ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি বিমান আন্তর্জাতিক আকাশপথে চলাচল করে। বেশি চলাচল করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রুটের বিমান। আগরতলা বিমানবন্দরে যাওয়া বিমানগুলো এই রুটে চলাচল করে থাকে।  

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ৭৭ একর ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বিমানবন্দরটিতে এখন ভূতুড়ে পরিবেশ। হঠাৎ দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটি একটি বিমানবন্দর। বেশির ভাগ এলাকায় চাষ করা হয়েছে গরুর ঘাস। রানওয়ের পিচ উঠে পাথরের কণা বের হয়ে এসেছে। জন্মেছে আগাছা। বিমানবন্দরের ভেতরে রয়েছে ছোট ছোট একাধিক পুকুর। টেক-অফ ও ল্যান্ডিংয়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়ম ভেঙে গড়ে উঠেছে বহু আবাসিক ভবন। জনবসতি গড়ে ওঠায় ভবিষ্যতে বিমান চলাচলে বাধা হবে বলে মনে করছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

এই বিমানবন্দর পুনরায় চালু করতে বেশি অর্থের প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে তাদের। অধিগ্রহণেরও ঝামেলা নেই। প্রয়োজন রানওয়ে কার্পেটিং, ফায়ার সার্ভিস ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের জনবল। বর্তমানে বিমানবন্দরে ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী তিন শিফটে কাজ করছেন।

বিমানবন্দর লাগোয়া কুমিল্লা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড)। এখানে দেশি-বিদেশি ৪৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পণ্য উৎপাদন করছে। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজার) তথ্য মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কুমিল্লা ইপিজেড থেকে রপ্তানি করা হয়েছে ৯০২.২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য।

এ ছাড়া কুমিল্লা প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে এক নামে পরিচিত। জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের তথ্য মতে, গত পাঁচ বছরে এই জেলা থেকে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন সাড়ে চার লাখেরও বেশি মানুষ।

এসব প্রবাসীর বেশির ভাগকেই ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হয়। এতে সময় ও অর্থ ব্যয় দুটিই বাড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কুমিল্লা বিমানবন্দর চালু হলে এ অঞ্চলের মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে।

কুমিল্লার ইতিহাসবিদ ও গবেষক আহসানুল কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমান সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে সার্বিক বিবেচনায় পুনরায় বিমানবন্দরটি চালু করে কুমিল্লাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করার।

কুমিল্লা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ডা. আজম খান নোমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কুমিল্লায় বিমানবন্দর পুনরায় চালু করা সময়ের দাবি। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের প্রতি অনুরোধ থাকবে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার। 

কুমিল্লা বিমানবন্দরের সিএনএস প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিমানবন্দরটির সমস্যা হলো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই বিমানবন্দরের চারপাশে বহু ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। আগামী দিনে যেন বিমানবন্দর এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে কোনো ভবন নির্মাণ না করতে পারে আমরা সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রেখেছি। একই সঙ্গে এই বিমানবন্দরের সিগন্যালের জন্য উন্নত প্রযুক্তির কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’

বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালুর একটি প্রস্তাব এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।