দুনিয়া মাতানো ফুটবল বিশ্বকাপ
‘লিওনেল মেসিই সর্বকালের সেরা’
শীতলক্ষ্যা নদী দূষণ

চট্টগ্রামে হাম উপসর্গে মৃত্যুর তথ্য না জানানোর ‘নির্দেশনা’!
সরকারি নথিতে মৃত্যু ১৪ হলেও হাসপাতালের তথ্যে ৫ গুণ বেশি

চট্টগ্রামে হামের প্রকোপ শুরুর পর থেকে গত ১৬ মে পর্যন্ত আগ্রাবাদের বেসরকারি চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের পিআইসিইউতে হাম শনাক্ত ও উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল ৭৬ জন। চিকিৎসকদের তথ্যানুযায়ী, এর মধ্যে মারা গেছে ১৮ জন। আর হাম শনাক্ত হয় ১১ শিশুর। কিন্তু হাসপাতাল থেকে এ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ওই হাসপাতালের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে গত বুধবার রাতে কালের কণ্ঠকে জানান, মার্চে হামের প্রকোপ শুরুর পর থেকে গত মে মাস পর্যন্ত হাসপাতালের পিআইসিইউতে মোট ৩১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদের বেশির ভাগ হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যায়। তবে চলতি মাসে কোনো মৃত্যু নেই।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত মে মাস পর্যন্ত হাম শনাক্ত, নিউমোনিয়াসহ হামের উপসর্গে হাসপাতালে মোট ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরপর আরো কয়েকজন মারা গেছে। বেসরকারি রয়েল হাসপাতালে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া আরো কয়েকটি হাসপাতালে হাম ও উপসর্গে কয়েকজন মারা গেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। সব মিলিয়ে হাম শনাক্ত ও উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ৭৫ থেকে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অথচ সরকারি তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রামে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হাম শনাক্ত ও উপসর্গে মোট মারা গেছে ১৪ জন। এর মধ্যে হাম শনাক্ত তিনজন ও উপসর্গ নিয়ে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়। কিন্তু চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্যে বিশ্লেষণে জানা যায়, জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যের চেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা পাঁচ গুণের বেশি।
এদিকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এখন হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর তথ্য না জানানোর ‘মৌখিক নির্দেশনা’ দেওয়া হয়েছে বলে একাধিক চিকিৎসক-কর্মকর্তা জানান। শুধু হাম শনাক্ত রোগী মারা গেলে তার তথ্য জানাতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলমকে গতকাল বৃহস্পতিবার কয়েক দফায় ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাম শনাক্ত ও উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়ার তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রতিদিন প্রকাশ করা হচ্ছে। আমরা হাম শনাক্ত ও উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়ার তথ্য আলাদাভাবে অধিদপ্তরে নিয়মিত পাঠাচ্ছি।’ চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, হাসপাতালে হাম শনাক্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, উপসর্গ আসলে কনফার্ম হাম না।
সম্প্রতি (গত ২৪ মে) তিনি জানিয়েছিলেন, চমেক হাসপাতালে নিউমোনিয়াসহ হামের বিভিন্ন উপসর্গে প্রায় ৪২ জন মারা গেছে—এই প্রশ্নে চমেক হাসপাতাল পরিচালক বলেন, ‘উপসর্গ নিয়ে ৪২ নয়, ৩৫ জন মারা গিয়েছিল। নিউমোনিয়া তো হামের উপসর্গ না। এখন শুধু হাম শনাক্ত রোগী মৃত্যুর তথ্য জানাতে বলা হয়েছে।’
এদিকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম উপসর্গে রোগী মারা যাওয়ার তথ্য না জানানোর অভিযোগ উঠলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রতিদিনই হামের বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে হাম শনাক্তে মৃত্যু ও হাম উপসর্গে (সন্দেহজনক হাম) মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। হাম নিয়ে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার প্রতিবেদনে জানানো হয়, চট্টগ্রামে গতকাল বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছে ৫৭ জন। আর এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে মোট রোগী (হাম শনাক্ত ও উপসর্গ নিয়ে) ভর্তি হয়েছে তিন হাজার ১৪৩ জন। বর্তমানে ভর্তি আছে ২৮৬ জন। এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে ১১ জন ও হাম শনাক্তে তিনজন মারা গেছে।
হামের রোগী লাখ ছাড়াল, মৃত্যু ৬৬৬

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৩৯ জনের। একই সময়ে উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৯ জন। এ নিয়ে মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৬৭৭ জনে। এই সময়ে হামের উপসর্গে আরো পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়।
চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশে হামের প্রকোপ দেখা দেয়। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ১৫ মার্চ থেকে রোগটি নিয়ে পরিসংখ্যান ও তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বিশ্ব স্বাস্থ্য অনুযায়ী, এর আগে ২০০৫ সালে দেশে সর্বোচ্চ ২৫ হাজারের বেশি শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১০ হাজার ৭৭৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া আরো ৮৯ হাজার ৯০৪ জনের মধ্যে রোগটির উপসর্গ দেখা গেছে। হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এ পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে ৭৪ হাজার ১৮৪ জন। তাঁদের মধ্যে ৭০ হাজার ৫০৩ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে সন্দেহভাজন রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭৩ জনে। এ ছাড়া শনাক্ত ৯৩ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
সব মিলিয়ে চলতি বছর হাম ও এর উপসর্গে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৬৬ জন। গত ২০ বছরে দেশে হামে এত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে সবচেয়ে বেশি ২৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়। এরপর রাজশাহী বিভাগে ৮৯ জন, সিলেটে ৭৫ জন, চট্টগ্রামে ৫৮ জন, বরিশালে ৫৭ জন, ময়মনসিংহে ৫৫ জন, খুলনায় ২৭ জন এবং রংপুর বিভাগে আটজনের মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাম-পরবর্তী সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো নিউমোনিয়া। এবারের নিউমোনিয়া বেশ ভয়াবহ। এতে রোগীর ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে। সাধারণ নিউমোনিয়ায় সুস্থতার হার বেশি থাকলেও হাম-পরবর্তী এই নিউমোনিয়ায় অনেক ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিকও কার্যকর হচ্ছে না। এ ছাড়া ডায়রিয়া, সেপসিস ও কানের সংক্রমণের মতো জটিলতাও দেখা দিচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী বলেন, হামে প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। যদিও শনাক্ত রোগীর সংখ্যায় বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না, তবু উদ্বেগের বিষয় হলো প্রতিদিন তিন থেকে ছয়জন রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। তাঁর মতে, এটি সরকারি হিসাব; বাস্তবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে।
তিনি বলেন, হামের প্রকোপে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। আগে শিশুদের মধ্যে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি থাকলেও এখন তুলনামূলকভাবে বয়স্কদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে যাদের বিভিন্ন রোগ বা চিকিৎসাজনিত কারণে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘসূত্রতা : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের পদক্ষেপগুলো দেরিতে এসেছে। বিশেষ করে হামের জন্য সরকারিভাবে পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট প্রটোকল প্রকাশ করা হয়নি। ফলে চিকিৎসকরা সমন্বিত নির্দেশনা পাচ্ছেন না। এ ছাড়া শিশুমৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে কোনো ডেথ রিভিউ বা ক্লিনিক্যাল অডিটও করা হচ্ছে না। এতে একই ধরনের ভুল বারবার হওয়ার ঝুঁকি থাকছে। পাশাপাশি টিকাদানের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বে-নজির আহমেদ বলেন, যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়েছে। সরকারের দুর্বল সংক্রমণ ব্যবস্থাপনার কারণে রোগটির বিস্তার দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে, যা স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য একটি বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
তিনি বলেন, টিকাদানে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও সব এলাকায় হাম প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় ৯৫ শতাংশ টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। মূলত যেসব এলাকায় এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি, সেসব স্থান থেকেই সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। তাঁর মতে, শুরুতে স্বাস্থ্য বিভাগ হামের বিষয়টিকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেয়নি। তারা মনে করেছিল পরিস্থিতি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্রুত মৃত্যুহার কমে আসবে—এমন একটি ভুল ধারণাও ছিল। ফলে পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী মহামারির চক্রে রূপ নিয়েছে।
মানুষ বেশি গ্রামে স্বাস্থ্যকর্মী শহরে
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সেবায় মাত্র ২৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী

দেশের বেশির ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবার মোট মানবসম্পদের ৭৫ শতাংশ থাকে শহরে। এতে শহর ও গ্রামের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবায় গভীর বৈষম্য তৈরি হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কোটি মানুষের চিকিৎসাসেবার ওপর।
জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) দুটি গবেষণার ফলাফলে এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা দুটি হলো ‘বাংলাদেশে জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্ভাবনা : সুযোগ, চ্যালেঞ্জ এবং নীতিগত প্রয়োজনীয়তা’ এবং ‘বিভিন্ন ধরনের মহামারি রোগ সঠিকভাবে মোকাবেলা বা ব্যবস্থাপনার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুতির মূল্যায়ন’। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আজিমপুরে নিপোর্টের অডিটরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষের বসবাস গ্রামে হলেও তাঁদের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন মাত্র ২৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী। অন্যদিকে শহরে বসবাসকারী ৩২ শতাংশ মানুষের জন্য কর্মরত রয়েছেন মোট স্বাস্থ্যকর্মীর ৭৫ শতাংশ। নিপোর্টের মহাপরিচালক ইসরাত জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম প্রমুখ বক্তব্য দেন। আলোচিত গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন ড. মো. আমিনুল হক। তিনি বলেন, দেশে স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট যেমন রয়েছে, তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো বিদ্যমান জনবলের অসম বণ্টন। বাংলাদেশে চিকিৎসকের সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা হলেও বাস্তবতা হলো, চিকিৎসকের ঘাটতির চেয়ে তাঁদের অবস্থানগত বৈষম্যই বড় সমস্যা। শহরে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘনত্ব বেশি হলেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখনো প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।
গবেষণার ফলাফল বলছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য অন্তত ০.৫২ জন চিকিৎসক প্রয়োজন। সে হিসাবে দেশে প্রায় ৮৮ হাজার চিকিৎসক প্রয়োজন হলেও বর্তমানে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা এক লাখ ২৯ হাজারের বেশি। অর্থাৎ কাগজে-কলমে চিকিৎসকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু তাঁদের বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক এবং বেসরকারি খাতে কর্মরত। এতে গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসক-জনসংখ্যার অনুপাত প্রয়োজনের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ কম। বিপরীতে শহরে এই অনুপাত প্রয়োজনের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি। ড. মো. আমিনুল হক বলেন, শুধু নতুন চিকিৎসক তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। চিকিৎসকদের গ্রামীণ এলাকায় ধরে রাখতে কার্যকর নীতি ও প্রণোদনা প্রয়োজন। ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় মানবসম্পদ পরিকল্পনাকে আরো বাস্তবমুখী করতে হবে।
এদিকে চিকিৎসকের চেয়েও বড় সংকট দেখা যাচ্ছে নার্স ও মিডওয়াইফে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ডব্লিউএইচওর মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য ১.৪৮ জন নার্স প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশে বর্তমানে রয়েছে মাত্র ০.৫৪ জন। ফলে দেশে প্রায় এক লাখ ৬৬ হাজার নার্সের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
আরো বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে, ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় এক লাখ ১৩ হাজার নার্স স্নাতক হলেও তাঁদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো বেকার রয়েছেন। গবেষকদের মতে, এটি নিয়োগ, পদসৃজন ও জনবল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রতিফলন। প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি না হওয়ায় প্রশিক্ষিত জনশক্তি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
গবেষণায় স্বাস্থ্যকর্মীর সামগ্রিক সংকটের চিত্রও উঠে এসেছে। ডব্লিউএইচওর মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ৪৪.৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী থাকা প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশে বর্তমানে এই সংখ্যা মাত্র ১২.৭৮ জন। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা এখনো অনেক কম। একজন চিকিৎসকের সঙ্গে অন্তত তিন থেকে পাঁচজন নার্স, মিডওয়াইফ ও সহকারী স্বাস্থ্যকর্মী থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে প্রয়োজনীয় সহায়ক জনবল না থাকায় চিকিৎসকদেরই অনেক প্রশাসনিক ও কারিগরি কাজ করতে হয়। এতে রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া এবং সেবার মান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। আলোচনায় ফিজিওথেরাপিস্ট, অপটোমেট্রিস্টসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যপেশার স্বীকৃতির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি রোগের বিস্তার এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব পেশাজীবীর গুরুত্বও বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এসব পেশার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও স্বীকৃতি গড়ে ওঠেনি।
বিশেষ করে অপটোমেট্রি (চোখের চিকিৎসা) পেশার বিকাশ না হওয়ায় সাধারণ দৃষ্টিজনিত সমস্যায় ভোগা বহু মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছে না। অথচ একটি সাধারণ রিডিং গ্লাসও একজন মানুষের কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষণায় স্বাস্থ্যকর্মীদের বিদেশে কর্মসংস্থানের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, বিদেশে চাকরি, লাইসেন্সিং, ভাষা দক্ষতা ও স্বীকৃতি বিষয়ে সহায়তার জন্য দেশে কার্যকর কোনো ‘ফরেন ইনফরমেশন ডেস্ক’ নেই। বর্তমানে মাত্র ৯.৫ শতাংশ চিকিৎসক, ৩.৩ শতাংশ নার্স এবং ৪.৯ শতাংশ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট আন্তর্জাতিক ভাষা দক্ষতা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। ফলে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যকর্মীদের অংশগ্রহণ সীমিত রয়ে গেছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত বলেন, ‘দেশের জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও মোট চিকিৎসকের ৮০ শতাংশ থাকে শহরে। এ ছাড়া চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ সরকারি সিস্টেমের বাইরে বেসরকারি খাতে কাজ করছে।’
স্বাস্থ্য খাতের অন্যান্য জনবল নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, দেশে নার্স আর মিডওয়াইফ সংখ্যা বাড়ানো উচিত। অথচ এটি নিয়ে কোনো আলোচনাই হচ্ছে না। একইভাবে ফিজিওথেরাপিস্টদের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক হলেও তাঁদের এখনো সেভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে এই উপেক্ষিত জনবলগুলোকে ফোকাস করা এবং তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো দরকার।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে গবেষণার ফলাফল বলছে, স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য কমাতে শুধু নতুন জনবল নিয়োগ নয়; বরং সুষম বণ্টন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
