• ই-পেপার

হামের রোগী লাখ ছাড়াল, মৃত্যু ৬৬৬

দুনিয়া মাতানো ফুটবল বিশ্বকাপ

‘লিওনেল মেসিই সর্বকালের সেরা’

ক্রীড়া প্রতিবেদক
‘লিওনেল মেসিই সর্বকালের সেরা’
বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিকের পর মেসি-বন্দনায় মেতেছেন কিংবদন্তিরা। ছবি : রয়টার্স

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সেরা ফুটবলার কে, এই বিতর্কে কয়েকটি নাম ঘুরেফিরে আসে বারবার। পেলে, ডিয়েগো ম্যারাডোনার পর লিওনেল মেসি নাকি ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো সর্বকালের সেরা, তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনাটা অন্তহীন। তবে ক্যারিয়ারের শেষ ভাগে এসে ৩৯ ছুঁই ছুঁই বয়সেও রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলায় থাকা মেসির শ্রেষ্ঠত্ব মানার বিষয়ে অনেক কিংবদন্তিই এখন এক কাতারে। এবার ব্রাজিলের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোনালদো নাজারিও ঘোষণা দিয়েছেন, মেসিই সর্বকালের সেরা এবং তা সবারই মেনে নেওয়া উচিত।

এবার বিশ্বকাপে মেসি খেলবেন কি না তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার স্কোয়াডে জায়গা করে তিনি। আলবিসিলেস্তেদের হয়ে বিশ্বকাপ জেতা বাকি ছিল, সেটিও পূর্ণ করেছেন গতবার। এবার তাহলে কী করবেন মেসি, আলজেরিয়ার বিপক্ষে দলের প্রথম ম্যাচেই তিনি নতুন কিছুই করে দেখালেন। রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামা প্রথম ফুটবলার হিসেবে নেমে করলেন হ্যাটট্রিক। আগের পাঁচটি আসরে তা করা হয়নি। এতেই ছুঁয়ে ফেলেছেন অবসরে যাওয়া জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার বৈশ্বিক মঞ্চে সর্বাধিক ১৬ গোলের রেকর্ড। গ্রুপ পর্বেই আরো দুটি ম্যাচ বাকি থাকায় আর্জেন্টাইন সুপারস্টারের জন্য দারুণ সুযোগ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় ওঠার। একটি মাত্র গোলের প্রয়োজন মেসির, এমন এক ঘটনায় ক্লোসাও চুপ থাকেননি। তিনি বলেছেন, এই টুর্নামেন্টে আমার রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার অপেক্ষাতেই ছিলাম। নিশ্চিতভাবেই এটা সঠিকভাবে হয়েছে, এটা করার জন্য মেসিকে অভিবাদন। আমি মেসির অনেক বড় ভক্ত, সব সময়ই থাকব। মেসি নিশ্চিতভাবেই অসাধারণ।

লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের প্রথম এবং বিশ্বের ইতিহাসে তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে ২০০তম ম্যাচ খেলতে নামার মাইলফলকেই নয়া কীর্তি গড়েছেন তিনি। তাতে মুগ্ধ হয়েছেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও, যতবারই মেসি মাঠে নামেন, বাকি সবকিছুই ঐতিহাসিক ও দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে। বিশ্বের মানুষের এখন আর লুকিয়ে না থেকে এই সত্যটি মেনে নেওয়ার সময় এসেছে যে তিনিই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়। তিনি মাঠে যা করেন, তা সব যুক্তিকে হার মানায়। আগের পাঁচ বিশ্বকাপে বয়সে তরুণ থেকেও হ্যাটট্রিক করাটাই বাকি ছিল, যে অপ্রাপ্তিটাও ঘুচিয়েছেন এলএমটেন। তাই রোনালদোর দাবি, এই বয়সেও এমন মঞ্চে এত শান্ত থেকে এবং নিখুঁতভাবে তাঁকে খেলতে দেখাটা ফুটবল ভালোবাসে এমন যেকোনো মানুষের জন্য এক পরম সৌভাগ্য। তিনি প্রতিটি মৌসুমে এবং বিশ্বকাপে পারফরম করে চলেছেন, তবু তাঁকে নিয়ে এখনো মানুষের মনে সন্দেহ জাগে। এটি একটি অবিস্মরণীয় ও ঐতিহাসিক রাত, যা চিরকালের জন্য ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে।

গত বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে হৃদয়ভাঙা হার দেখা আর্জেন্টিনাকে আলো ঝলমলে পারফরম্যান্সে শিরোপা জিতিয়েছেন মেসি। তাঁর মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে রোনালদোর মত, আর যে মানুষটি এই রেকর্ডগুলো ভাঙছে, তা বিশ্বজুুড়ে ফুটবলভক্তদের জন্য বিস্ময়কর কিছু নয়। আর্জেন্টিনা দারুণ একটি দল, তবে তিনিই (মেসি) এখন পার্থক্য গড়ে দেওয়া খেলোয়াড়। এ বয়সেও তিনি বিজয়ী হওয়ার মানসিকতা নিয়ে নামেন, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখে। এ জন্যই হারের পরও আলজেরিয়ার কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচ বলেছিলেন, আমরা কোনো বয়স্ক ফুটবলারকে নিয়ে কথা বলছি না, এমন এক ফুটবলারকে নিয়ে বলছি যে আটবার ব্যালন ডির জিতেছে, যার ভাবনাচিন্তা সুস্থির থাকে খেলার কঠিন সময়েও। এক যুগ ধরে তিনি অবিশ্বাস্য কাজগুলো এভাবেই করে যাচ্ছেন।

শীতলক্ষ্যা নদী দূষণ

শীতলক্ষ্যা নদী দূষণ
রাজধানীর চারপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলো দূষণ ও দখলের শিকার। দূষণের মাত্রা কতটা ভয়াবহ তা এই ছবিই বলে দেয়। বালু নদের কালো দূষিত পানি ডেমরা এলাকা দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে পড়ে দূষণ ছড়াচ্ছে। দুই নদীর পানির রং দুই রকম। গতকাল তোলা। ছবি : মঞ্জুরুল করিম

চট্টগ্রামে হাম উপসর্গে মৃত্যুর তথ্য না জানানোর ‘নির্দেশনা’!

সরকারি নথিতে মৃত্যু ১৪ হলেও হাসপাতালের তথ্যে ৫ গুণ বেশি

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামে হাম উপসর্গে মৃত্যুর তথ্য না জানানোর ‘নির্দেশনা’!

চট্টগ্রামে হামের প্রকোপ শুরুর পর থেকে গত ১৬ মে পর্যন্ত আগ্রাবাদের বেসরকারি চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের পিআইসিইউতে হাম শনাক্ত ও উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল ৭৬ জন। চিকিৎসকদের তথ্যানুযায়ী, এর মধ্যে মারা গেছে ১৮ জন। আর হাম শনাক্ত হয় ১১ শিশুর। কিন্তু হাসপাতাল থেকে এ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

ওই হাসপাতালের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে গত বুধবার রাতে কালের কণ্ঠকে জানান, মার্চে হামের প্রকোপ শুরুর পর থেকে গত মে মাস পর্যন্ত হাসপাতালের পিআইসিইউতে মোট ৩১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদের বেশির ভাগ হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যায়। তবে চলতি মাসে কোনো মৃত্যু নেই।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত মে মাস পর্যন্ত হাম শনাক্ত, নিউমোনিয়াসহ হামের উপসর্গে হাসপাতালে মোট ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরপর আরো কয়েকজন মারা গেছে। বেসরকারি রয়েল হাসপাতালে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া আরো কয়েকটি হাসপাতালে হাম ও উপসর্গে কয়েকজন মারা গেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। সব মিলিয়ে হাম শনাক্ত ও উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ৭৫ থেকে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অথচ সরকারি তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রামে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হাম শনাক্ত ও উপসর্গে মোট মারা গেছে ১৪ জন। এর মধ্যে হাম শনাক্ত তিনজন ও উপসর্গ নিয়ে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়। কিন্তু চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্যে বিশ্লেষণে জানা যায়, জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যের চেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা পাঁচ গুণের বেশি।

এদিকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এখন হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর তথ্য না জানানোর মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে একাধিক চিকিৎসক-কর্মকর্তা জানান। শুধু হাম শনাক্ত রোগী মারা গেলে তার তথ্য জানাতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলমকে গতকাল বৃহস্পতিবার কয়েক দফায় ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, হাম শনাক্ত ও উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়ার তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রতিদিন প্রকাশ করা হচ্ছে। আমরা হাম শনাক্ত ও উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়ার তথ্য আলাদাভাবে অধিদপ্তরে নিয়মিত পাঠাচ্ছি। চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, হাসপাতালে হাম শনাক্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, উপসর্গ আসলে কনফার্ম হাম না।

সম্প্রতি (গত ২৪ মে) তিনি জানিয়েছিলেন, চমেক হাসপাতালে নিউমোনিয়াসহ হামের বিভিন্ন উপসর্গে প্রায় ৪২ জন মারা গেছেএই প্রশ্নে চমেক হাসপাতাল পরিচালক বলেন, উপসর্গ নিয়ে ৪২ নয়, ৩৫ জন মারা গিয়েছিল। নিউমোনিয়া তো হামের উপসর্গ না। এখন শুধু হাম শনাক্ত রোগী মৃত্যুর তথ্য জানাতে বলা হয়েছে।

এদিকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম উপসর্গে রোগী মারা যাওয়ার তথ্য না জানানোর অভিযোগ উঠলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রতিদিনই হামের বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে হাম শনাক্তে মৃত্যু ও হাম উপসর্গে (সন্দেহজনক হাম) মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। হাম নিয়ে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার প্রতিবেদনে জানানো হয়, চট্টগ্রামে গতকাল বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছে ৫৭ জন। আর এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে মোট রোগী (হাম শনাক্ত ও উপসর্গ নিয়ে) ভর্তি হয়েছে তিন হাজার ১৪৩ জন। বর্তমানে ভর্তি আছে ২৮৬ জন। এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে ১১ জন ও হাম শনাক্তে তিনজন মারা গেছে।

মানুষ বেশি গ্রামে স্বাস্থ্যকর্মী শহরে

গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সেবায় মাত্র ২৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক
মানুষ বেশি গ্রামে স্বাস্থ্যকর্মী শহরে

দেশের বেশির ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবার মোট মানবসম্পদের ৭৫ শতাংশ থাকে শহরে। এতে শহর ও গ্রামের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবায় গভীর বৈষম্য তৈরি হয়েছে, যার  নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কোটি মানুষের চিকিৎসাসেবার ওপর।

জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) দুটি গবেষণার ফলাফলে এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা দুটি হলো বাংলাদেশে জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্ভাবনা : সুযোগ, চ্যালেঞ্জ এবং নীতিগত প্রয়োজনীয়তা এবং বিভিন্ন ধরনের মহামারি রোগ সঠিকভাবে মোকাবেলা বা ব্যবস্থাপনার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুতির মূল্যায়ন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আজিমপুরে নিপোর্টের অডিটরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষের বসবাস গ্রামে হলেও তাঁদের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন মাত্র ২৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী। অন্যদিকে শহরে বসবাসকারী ৩২ শতাংশ মানুষের জন্য কর্মরত রয়েছেন মোট স্বাস্থ্যকর্মীর ৭৫ শতাংশ। নিপোর্টের মহাপরিচালক ইসরাত জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত,  স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম প্রমুখ বক্তব্য দেন। আলোচিত গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন ড. মো. আমিনুল হক। তিনি বলেন, দেশে স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট যেমন রয়েছে, তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো বিদ্যমান জনবলের অসম বণ্টন।  বাংলাদেশে চিকিৎসকের সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা হলেও বাস্তবতা হলো, চিকিৎসকের ঘাটতির চেয়ে তাঁদের অবস্থানগত বৈষম্যই বড় সমস্যা। শহরে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘনত্ব বেশি হলেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখনো প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।

গবেষণার ফলাফল বলছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য অন্তত ০.৫২ জন চিকিৎসক প্রয়োজন। সে হিসাবে দেশে প্রায় ৮৮ হাজার চিকিৎসক প্রয়োজন হলেও বর্তমানে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা এক লাখ ২৯ হাজারের বেশি। অর্থাৎ কাগজে-কলমে চিকিৎসকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু তাঁদের বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক এবং বেসরকারি খাতে কর্মরত। এতে গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসক-জনসংখ্যার অনুপাত প্রয়োজনের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ কম। বিপরীতে শহরে এই অনুপাত প্রয়োজনের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি। ড. মো. আমিনুল হক বলেন, শুধু নতুন চিকিৎসক তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। চিকিৎসকদের গ্রামীণ এলাকায় ধরে রাখতে কার্যকর নীতি ও প্রণোদনা প্রয়োজন। ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় মানবসম্পদ পরিকল্পনাকে আরো বাস্তবমুখী করতে হবে।

এদিকে চিকিৎসকের চেয়েও বড় সংকট দেখা যাচ্ছে নার্স ও মিডওয়াইফে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ডব্লিউএইচওর মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য ১.৪৮ জন নার্স প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশে বর্তমানে রয়েছে মাত্র ০.৫৪ জন। ফলে দেশে প্রায় এক লাখ ৬৬ হাজার নার্সের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

আরো বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে, ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় এক লাখ ১৩ হাজার নার্স স্নাতক হলেও তাঁদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো বেকার রয়েছেন। গবেষকদের মতে, এটি নিয়োগ, পদসৃজন ও জনবল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রতিফলন। প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি না হওয়ায় প্রশিক্ষিত জনশক্তি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

গবেষণায় স্বাস্থ্যকর্মীর সামগ্রিক সংকটের চিত্রও উঠে এসেছে। ডব্লিউএইচওর মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ৪৪.৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী থাকা প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশে বর্তমানে এই সংখ্যা মাত্র ১২.৭৮ জন। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা এখনো অনেক কম। একজন চিকিৎসকের সঙ্গে অন্তত তিন থেকে পাঁচজন নার্স, মিডওয়াইফ ও সহকারী স্বাস্থ্যকর্মী থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে প্রয়োজনীয় সহায়ক জনবল না থাকায় চিকিৎসকদেরই অনেক প্রশাসনিক ও কারিগরি কাজ করতে হয়। এতে রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া এবং সেবার মান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। আলোচনায় ফিজিওথেরাপিস্ট, অপটোমেট্রিস্টসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যপেশার স্বীকৃতির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি রোগের বিস্তার এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব পেশাজীবীর গুরুত্বও বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এসব পেশার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও স্বীকৃতি গড়ে ওঠেনি।

বিশেষ করে অপটোমেট্রি (চোখের চিকিৎসা) পেশার বিকাশ না হওয়ায় সাধারণ দৃষ্টিজনিত সমস্যায় ভোগা বহু মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছে না। অথচ একটি সাধারণ রিডিং গ্লাসও একজন মানুষের কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।

গবেষণায় স্বাস্থ্যকর্মীদের বিদেশে কর্মসংস্থানের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, বিদেশে চাকরি, লাইসেন্সিং, ভাষা দক্ষতা ও স্বীকৃতি বিষয়ে সহায়তার জন্য দেশে কার্যকর কোনো ফরেন ইনফরমেশন ডেস্ক নেই। বর্তমানে মাত্র ৯.৫ শতাংশ চিকিৎসক, ৩.৩ শতাংশ নার্স এবং ৪.৯ শতাংশ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট আন্তর্জাতিক ভাষা দক্ষতা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। ফলে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যকর্মীদের অংশগ্রহণ সীমিত রয়ে গেছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত বলেন, দেশের জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও মোট চিকিৎসকের ৮০ শতাংশ থাকে শহরে। এ ছাড়া চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ সরকারি সিস্টেমের বাইরে বেসরকারি খাতে কাজ করছে।

স্বাস্থ্য খাতের অন্যান্য জনবল নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, দেশে নার্স আর মিডওয়াইফ সংখ্যা বাড়ানো উচিত। অথচ এটি নিয়ে কোনো আলোচনাই হচ্ছে না। একইভাবে ফিজিওথেরাপিস্টদের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক হলেও তাঁদের এখনো সেভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে এই উপেক্ষিত জনবলগুলোকে ফোকাস করা এবং তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো দরকার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে গবেষণার ফলাফল বলছে, স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য কমাতে শুধু নতুন জনবল নিয়োগ নয়; বরং সুষম বণ্টন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।