ভারতে ডেটা সেন্টার প্রকল্পে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছেন রবিন খুদা নামের এক বাংলাদেশি শিল্পপতি। এর অংশ হিসেবে গত শুক্রবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করেন তিনি। জানা গেছে, ভারতে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ব্ল্যাকস্টোন সমর্থিত ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠান এয়ারট্রাংক। পাঁচ গিগাওয়াটেরও বেশি ডেটা সেন্টার সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া এ উদ্যোগকে ভারতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম বৃহৎ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্ববাজারে দ্রুত উত্থানের মাধ্যমে তিনি এরই মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছেন।
রবিন খুদার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। তিনি রাজধানীর শের-ই-বাংলা নগর সরকারি বয়েজ স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। ১৯৯৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। সেখানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনিতে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরে ম্যানচেস্টার বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পেশাগত হিসাববিজ্ঞান সনদ লাভ করেন। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম ধনী ব্যক্তি তিনি। ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর সম্পদের পরিমাণ দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি।
ভারতে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে রবিনের লক্ষ্য হলো বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশে এআই এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের চাহিদা বৃদ্ধি করা। মোদির সঙ্গে রবিন দেখা করার পর তাঁর কম্পানি এয়ারট্রাংক এই বিশাল বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। কম্পানিটি ভারতজুড়ে পাঁচ গিগাওয়াটের ডেটা সেন্টার তৈরি করবে।
এয়ারট্রাংকের বিনিয়োগ নিয়ে মোদি মাইক্রো ব্লগিং সাইট এক্সে লিখেছেন, ‘এ ধরনের বিনিয়োগের ফলে বৈশ্বিক ক্লাউড কম্পিউটিং ও এআই প্রযুক্তির কেন্দ্র হিসেবে ভারতের অবস্থান আরো মজবুত হবে। পাশাপাশি এটি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে, দেশীয় সাপ্লাই চেইনকে চাঙ্গা করবে এবং উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরো গতিশীল করবে।’
৩০ বিলিয়ন ডলারের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগটি করা হবে মহারাষ্ট্রে। সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী দেভেন্দ্র ফাদনাভিস জানান, এয়ারট্রাংক মহারাষ্ট্রে তিন গিগাওয়াটের ডেটা সেন্টার তৈরি করবে। এর অংশ হিসেবে মুম্বাইয়ের রায়গঞ্জে একটি জমি কেনার চুক্তিও করেছে এয়ারট্রাংক।
ফোর্বস এশিয়াকে এই বিনিয়োগের ব্যাপারে রবিন খুদা বলেছেন, ‘ভারত বিশ্বের এমন হাতে গোনা কয়েকটি বাজারের একটি, যেখানে আমাদের বড় বড় পরিকল্পনা ও লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মতো বিপুল ভবিষ্যৎ চাহিদার সম্ভাবনা রয়েছে।’
২০২৩ সালে ‘বিজনেস পারসন অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হওয়া রবিন খুদা নিজ প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা একজন বিলিয়নেয়ার। ডেটা সেন্টার নির্মাণ ব্যবসার মাধ্যমে তিনি তাঁর বেশির ভাগ সম্পদ অর্জন করেছেন। ব্ল্যাকস্টোন এবং কানাডা পেনশন প্ল্যান ইনভেস্টমেন্ট বোর্ডের সমর্থনে প্রস্তাবিত এই বিনিয়োগকে ভারতের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ডিজিটাল অবকাঠামো কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ডেটা সেন্টার খাতে ভারতের অন্যান্য বড় বিনিয়োগের মধ্যে রয়েছে আদানি গ্রুপের ১০০ বিলিয়ন ডলারের নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর ডেটা সেন্টার নির্মাণ পরিকল্পনা।
এয়ারট্রাংক জানিয়েছে, তাদের প্রকল্প ভারতের একাধিক রাজ্য ও কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে বিস্তৃত হবে এবং ক্লাউড কম্পিউটিং ও এআই প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে লুমিনা ক্লাউডইনফ্রা অধিগ্রহণের মাধ্যমে ভারতে কার্যক্রম শুরু করে এয়ারট্রাংক। ওই চুক্তির ফলে মুম্বাই, চেন্নাই ও হায়দরাবাদে ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার উন্নয়ন প্রকল্প তাদের হাতে আসে।
প্রযুক্তি খাতে তাঁর যাত্রা ছিল প্রচলিত প্রযুক্তি বিলিয়নেয়ারদের মতো নয়। তিনি ফুজিত্সুর অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড শাখাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ ও ক্লাউডভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। পরে তিনি পাইপ নেটওয়ার্কের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রতিষ্ঠানটির কৌশলগত পরিকল্পনা ও একীভূতকরণ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরে তিনি ডেটা সেন্টার কম্পানি নেক্সটডিসিতে যোগ দেন।
২০১৫ সালে এয়ারট্রাংক প্রতিষ্ঠা করেন রবিন খুদা। শুরুর সময় অর্থায়ন সংগ্রহে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। এমনকি ব্যক্তিগত সঞ্চয়ও ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে হয়েছিল। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি সিডনি ও মেলবোর্নে বড় ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস চালু করে। ২০২৪ সালে ব্ল্যাকস্টোনের নেতৃত্বাধীন একটি জোট ২৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে এয়ারট্রাংক অধিগ্রহণ করে। তবে প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে বহাল থাকেন খুদা। বর্তমানে এয়ারট্রাংক নিজেকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক একটি হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচয় দেয়। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম অস্ট্রেলিয়া, হংকং, ভারত, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং সৌদি আরবে বিস্তৃত। এয়ারট্রাংকের মতে, ভারতের বিশাল বাজার, দক্ষ জনশক্তি এবং সরকারি নীতিগত সহায়তা দেশটিকে ডেটা সেন্টার বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ভারতের ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’, ‘ইন্ডিয়া এআই মিশন’ এবং ‘ইন্ডিয়া সেমিকন্ডাক্টর মিশন’কে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
রবিন খুদার ভাষ্য, বৈশ্বিক বিনিয়োগ দ্রুত স্থানান্তরিত হতে পারে এবং যেসব দেশ নীতিগত নিশ্চয়তা, সমন্বয় ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হবে, তারাই এআই অবকাঠামো বিনিয়োগের পরবর্তী ধাপের সুবিধা পাবে। তাঁর মতে, ভারত সেই পথেই এগোচ্ছে। এয়ারট্রাংকের ৩০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ঘোষণার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেশটির ডিজিটাল অবকাঠামো খাতের অগ্রগতির প্রশংসা করেন। সূত্র : ফোর্বস, ফিন্যানশিয়াল টাইমস