যে মা পরম আদর, স্নেহ আর ভালোবাসায় একেকটিকে সমাজের চোখে সেরা সন্তান হিসেবে গড়ে তুলে গেলেন; দৃষ্টির অগোচরে তাঁরা দেখতে রক্ত-মাংসের মানুষ ঠিকই, কিন্তু ভেতরে আসলে পাথর! নিজের মৃত্যুর পর যখন চারপাশে শোরগোল উঠল, তখন মানুষের মধ্যে এমন ধারণাই ছড়িয়ে পড়ছে। মিরপুরের একাকী ফ্ল্যাটে পড়ে থেকে ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের অসহায় মৃত্যুর পর বিষয়টি এভাবেই চাউর হয়েছে। যদিও নূরজাহান বেগমের সন্দেহবাতিক বা সিজোফ্রেনিয়া রোগও ছিল বলে জানা গেছে। তিনি সবাইকে সন্দেহ করতেন। মনে করতেন সবাই তাঁকে মেরে ফেলবে। তাই তিনি কাউকেই কাছে ঘেঁষতে দিতেন না। মৃত্যুর সময় পাশে কেউ ছিল না। সাধারণ মানুষ মনে করেন, এটিই কাল হয়েছে তাঁর সন্তানদের জন্য। শেষ সময়ে মায়ের পাশে না থাকায় যতই উচ্চশিক্ষিত আর প্রতিষ্ঠিতই হোক না কেন, তাঁদের মূল্যবোধহীন পাষাণ হিসেবেই দেখছেন অনেকে। তবে কালের কণ্ঠের তথ্যানুসন্ধানে বেশ কিছু বিষয় সামনে এসেছে। যেখানে দেখা যায়, নূরজাহান বেগম আসলে এক সপ্তাহ আগে নয়, বরং ওইদিনই মারা গেছেন। নার্স, পুলিশ ও মর্গের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চাঞ্চল্যকর এ তথ্য দিয়েছেন।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, মরদেহের ময়নাতদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মর্গে আনার পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোনো এক সময় নূরজাহান বেগমের মৃত্যু হয়েছে। অনেক দিন আগে মৃত্যুর কারণে শরীরে পচন ধরার বিষয়টি আসলে পিঠের ক্ষত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এর নাম ‘বেডসোর’ বা ‘শয্যাক্ষত’। বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত দেখা যায়।
পরিবার জানায়, মারা যাওয়ার দিনই (৩১ মে) তাঁর মরদেহ পুলিশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। এর পরদিন তাঁর লাশ চাঁদপুরের উত্তর উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। নূরজাহান বেগমের মৃত্যু ঘিরে বিতর্ক ও রহস্যের জট খুলতে টানা দুই দিন অনুসন্ধান করেছে কালের কণ্ঠ। প্রয়াত এই নারীর বড় ছেলে যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমান, ছোট ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম আশিকুর রহমান। মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানা মিরপুরের একটি স্কুলের শিক্ষক।
আলোচিত ভবনটিতে বুধবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটক খোলা থাকলেও ভেতরের আরেকটি গেট তালা দেওয়া। কলিং বেল চাপলে নিচতলার ফ্ল্যাট থেকে একজন নারী বেরিয়ে আসেন। প্রথমে কথা বলতে না চাইলেও পরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, তিন বছর ধরে তিনি নিচতলার ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন। তবে চারতলার ফ্ল্যাটের নূরজাহান বা তাঁর মেয়ে ফাতিমার সঙ্গে কখনো কথা হয়নি।
ওই নারী বলেন, ‘তিনি (ফাতিমা) কারো সঙ্গে কথা বলতেন না। বাসায় কাউকে ঢুকতেও দিতেন না। চুপচাপ বাসা থেকে বের হতেন, চুপচাপ ঢুকতেন। মাথার চুল আউলা-ঝাউলা থাকত বেশির ভাগ সময়। মাঝে মাঝে দেখতাম শুকনা খাবার নিয়ে আসতেন। গত তিন বছরে তাঁর মাকেও কখনো দেখিনি। শুনেছি ঈদের দিন তাঁর (মৃত বৃদ্ধা) নাতি খাবার দিয়ে গেছে। লাশ উদ্ধারের দিন পুলিশ আসার পর শুনলাম তিনি মারা গেছেন।’
বাড়ির অন্যদের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ দেখালে তিনি বলেন, ‘গেট খোলার ব্যাপারে বাড়িওয়ালার নিষেধ আছে।’
জানা যায়, ভবনটির মালিকানা নূরজাহান বেগমের মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানার শ্বশুরপক্ষের। ফাতিমার স্বামী মারা যান ২০১৭ সালে। স্বামীর মালিকানা সূত্রে পাওয়া ফ্ল্যাটেই মাকে নিয়ে থাকতেন ফাতিমা।
ওই ভবনে ভাড়া থাকা এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর নিঃসন্তান ফাতিমা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। নিঃসঙ্গতা কাটাতে প্রায় দুই বছর আগে ভাইয়ের বাসা থেকে নিয়ে আসেন মাকে।’
ফাতিমার ভাই বুয়েটের অধ্যাপক আশিকুর রহমান। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁর দুলাভাই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক। নিঃসঙ্গতা কাটাতে ২০২৪ সালে বুয়েট শিক্ষক ভাইয়ের বাসা থেকে মাকে নিয়ে আসেন নিজের কাছে।
মানসিক জটিলতার ইঙ্গিত : নূরজাহানের মরদেহ উদ্ধারের সময়কার ভিডিওতে দেখা যায়, পুরো ফ্ল্যাটে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশ। রান্নাঘরের চিত্রও ছিল ভয়াবহ। নূরজাহানের মতো একই ধরনের নোংরা পরিবেশ ছিল পুরো ফ্ল্যাটে। এমনকি মেয়ে ফাতিমার কক্ষের চিত্রও একই রকম বলে জানিয়েছেন ঘটনাস্থলে যাওয়া নার্স ও পুলিশ কর্মকর্তা।
নূরজাহান বেগমের ছোট ছেলে অধ্যাপক আশিকুর রহমানও ফ্ল্যাটে নোংরা পরিবেশের কথা স্বীকার করেছেন। তবে তাঁর দাবি, বেশ কয়েকবার ফ্ল্যাট পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিয়েও মা এবং বোনের অনীহার কারণে সফল হননি। এর কারণ হিসেবে তিনি মায়ের দীর্ঘদিনের মানসিক জটিলতার ইঙ্গিতও দিয়েছেন। এই জটিলতা ধীরে ধীরে মেয়ের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা।
মায়ের মানসিক কিছু জটিলতার ইঙ্গিত দিয়ে অধ্যাপক আশিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সব সময় উনার ইচ্ছাটাকেই একটু বেশি প্রাধান্য দিতাম। কারণ উনি একটু সন্দেহপ্রবণ ছিলেন। এটা সিজোফ্রেনিয়া বা এই টাইপের কি না—আমরা নিশ্চিত নই। তবে আব্বা বলতেন, এ রকম কিছু একটা আছে। এ জন্য উনার ইচ্ছাটাকেই প্রাধান্য দিতাম।’
তবে নূরজাহান বেগমকে কখনো মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নেওয়া হয়নি বলে স্বীকার করেন অধ্যাপক আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘উনার সমস্যাটি বাবা বেঁচে থাকতেই ছিল। আমরা এটা কখনো ওইভাবে ডিল করিনি। এই বাড়ে তো কমে, এটা আসলে কোনো ফিক্সড বিষয় ছিল না।’
ফ্ল্যাটের ভেতরে নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ : দুই বেডরুমের ফ্ল্যাটের একটিতে থাকতেন নূরজাহান বেগম, আরেকটিতে তাঁর মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানা। নূরজাহানের মৃত্যুর বিষয়টি প্রথম তাঁর সন্তানদের নিশ্চিত করেন মিরপুরের ল্যাব প্লাস ডায়াগনস্টিকের নার্স তামান্না আহমেদ। বোনের কাছ থেকে ফোন পেয়ে ৩১ মে বিকেলে অধ্যাপক আশিকুর রহমান ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে তামান্নাকে নিয়ে মিরপুরের ফ্ল্যাটে ছুটে যান। তামান্না কালের কণ্ঠকে জানান, শুধু নূরজাহানের কক্ষ নয়, পুরো ফ্ল্যাটই ছিল নোংরা এবং অপরিচ্ছন্ন। ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে ফ্ল্যাটে ঢোকা যাচ্ছিল না। ঘটনাস্থলে যাওয়া পল্লবী থানার এসআই শামসুর রহমানও জানান, ফ্ল্যাটের প্রতিটি কক্ষ ছিল অগোছালো এবং নোংরা। নূরজাহান বেগমের প্রতি সন্তানদের অবহেলার পাশাপাশি ভরণপোষণ না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যদিও এর কোনো সত্যতা নেই বলে দাবি করেছে পরিবার।
মৃতদেহে পচনের তথ্য : মৃতদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত নার্স, পুলিশ কর্মকর্তা, ময়নাতদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন কালের কণ্ঠের প্রতিবেদক। তাঁরা জানান, সপ্তাহখানেক আগে নূরজাহান বেগমের মৃত্যু অথবা মৃতদেহে পচনের কারণে পোকা জন্মানোর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নার্স তামান্না আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আমার আরেক কলিগকে নিয়ে ফ্ল্যাটে ঢোকার পর মেয়ে উনার মার রুমটা দেখিয়ে দেন। পরে দেখি মহিলা খাটের ওপর শুয়ে আছেন, উনার গায়ে একটা কম্বল দেওয়া। উনি ডান কাত হয়ে তাকিয়ে আছেন। আমরা পালস চেক করে দেখলাম পালস নেই। আমার কলিগ বিপি চেক করল। তখন দেখলাম উনার বগলের নিচ থেকে একটা পোকার মতো কী যেন বের হচ্ছে। লাশটা শক্ত হয়ে আছে। মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম উনি (নূরজাহান) কখন থেকে এভাবে আছেন। উনি বললেন সকালে মাকে আপেল খাইয়েছেন, দুপুর ১টা-২টার দিকে দুপুরের খাবারের কথা জিজ্ঞেস করেছেন। তখনো নাকি তিনি জীবিত ছিলেন।’
তামান্না এরপর ট্রিপল নাইনে কল করে ঘটনাটি পুলিশকে জানান। দেহে পোকার বিষয়টি নিয়ে আবারও প্রশ্ন করলে তিনি আগের তথ্য পরিবর্তন করে বলেন, ‘উনার পুরো শরীরটা দেখিনি। জাস্ট হাতটা দেখছি, আর গলাটা দেখছি। গলা শক্ত হয়ে ডান কাত হয়ে ছিল, এখানে কোনো পোকা ছিল না। কিন্তু বগলের নিচে মে বি পোকা ছিল। আমি শিওর না, আমার কাছে মনে হচ্ছে ওইখানে পচন ধরেছিল। আমি জাস্ট এক পলক দেখামাত্রই হাত নামিয়ে ফেলেছি।’
তামান্না আহমেদের ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে যান পল্লবী থানার ওসি মো. হাসান বাসির এবং উপপরিদর্শক শামসুর রহমান। এসআই শামসুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাথার ডান পাশে হালকা একটু আঘাতের দাগ আছে। হয়তো পড়ে গিয়েছিলেন। প্রথমে সুরতহাল প্রতিবেদনে আমি এটা লিখিনি। পরে ফরেনসিক ডাক্তার আঘাতের দাগ দেখতে পেয়ে বিষয়টা আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেন।’
নূরজাহান বেগমের মরদেহে পচন ছিল কি না জানতে চাইলে শামসুর রহমান বলেন, ‘হাতগুলো স্বাভাবিক ছিল। তবে অনেক দিন ধরে শুয়ে ছিলেন তো, তাই পিঠের দিক দিয়ে পচে গেছে। পিঠ থেকে পাঁজর পর্যন্ত পচে গেছে।’
নূরজাহান বেগমের ময়নাতদন্ত হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল মর্গে। এতে জড়িত একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লাশ পচাগলা ছিল না। ওই দিন উনি বিকেলেই সম্ভবত মারা গেছেন। আর রাতে মর্গে আসে লাশ। পিঠে ঘা ছিল, যেটাকে বেডসোর বলে। পাঁজরেও ঘা দেখেছি। ছোপ ছোপ ঘাগুলো একেক সাইজের। দুই থেকে তিন ইঞ্চি সাইজের ঘা। পিঠের জায়গায় জায়গায় ঘা ছিল। ওই ঘায়ের মধ্যে পোকা দেখিছি। ওই পোকাগুলোই সারা শরীরে ছড়িয়েছে।’
কলেজটির মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. নাশাত জাবীন নূরজাহান বেগমের মরদেহের ময়নাতদন্ত করেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কাছে বডিটা ফ্রিজিং গাড়িতে করে আসে। শরীরে ডিকম্পোজিশন (পচন) ছিল না, তবে বেডসোর (শয্যাক্ষত) ছিল।’
একই কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আইনুল ইসলাম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেডসোর হলো ত্বকের এমন এক ধরনের ক্ষত, যা দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে শুয়ে বা বসে থাকার কারণে শরীরের কোনো অংশে অতিরিক্ত চাপ পড়লে তৈরি হয়। সাধারণত কোমর, পিঠ, নিতম্ব, গোড়ালি বা কনুইয়ে এটি বেশি দেখা যায়। বয়স্কদের ক্ষেত্রে বেডশোর বেশি দেখা যায়।’
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে জটিল মানসিক রোগ হওয়ার আশঙ্কাটাই বেশি। বিশেষ করে এটি সিজোফ্রেনিয়া হয়ে থাকলে রোগীর মধ্যে অনেক ভ্রান্ত চিন্তা-ভাবনা কাজ করে। রোগীকে অনেকভাবে কনভিনসের চেষ্টা করেও নিজস্ব বিশ্বাস থেকে নড়ানো যায় না। তাঁর মধ্যে নানা রকমের সন্দেহ থাকতে পারে এবং সন্দেহগুলা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর পরিবারের মধ্যেই হয়।’