• ই-পেপার

আসছে সুপার এল নিনো, খাদ্যসংকটের আশঙ্কা এশিয়ায়

বজ্রপাতে মা-ছেলেসহ ১২ জন নিহত

কালের কণ্ঠ ডেস্ক
বজ্রপাতে মা-ছেলেসহ ১২ জন নিহত

দেশের পাঁচ জেলায় বজ্রপাতে ১২ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছয়জন, গাইবান্ধায় মা-ছেলে, ময়মনসিংহে দুজন এবং পঞ্চগড় ও নীলফামারীতে একজন নিহত হয়। গত বুধবার ও গতকাল বৃহস্পতিবার এসব ঘটনা ঘটে। কালের কণ্ঠের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ : সদর, শিবগঞ্জ ও নাচোল উপজেলায় বজ্রপাতে এক রাখাল, দুই গৃহবধূ, দুই কিশোর-কিশোরী এবং এক এক যুবক নিহত হয়। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বিকেলে জেলায় ঝড়-বৃষ্টির সময় বজ্রপাতে ঘটনাগুলো ঘটে। মৃতরা হলেন সদরের আতাহার গ্রামের মো. রাব্বিলের ছেলে আবদুল্লাহ (১৭), শিবগঞ্জের চককীর্তি ইউনিয়নের চকনরেন্দ্র গ্রামের দুবাইপ্রবাসী আব্দুর রবের স্ত্রী মাহমুদা বেগম (১৯), একই ইউনিয়নের রানীবাড়ি বাজারপাড়া গ্রামের কাশেমের মেয়ে সাদিয়া (১৬), শিবগঞ্জের মোবারকপুর ইউনিয়নের শিকারপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামের ফিটুর ছেলে মেসবাহুল ওরফে মেসবাবাবুর (১৪), নাচোলের লাহাবাড়ি গ্রামের আব্দুর রাকিবের স্ত্রী সুমিয়ারা বেগম (৪০) এবং গোসাইপুর গ্রামের মো. শাফিউলের ছেলে হাসান আলী লালু (২১)। লাহাবাড়ির ঘটনায় আহত হয়েছেন জিয়াউর রহমান (৩৬) নামের এক ব্যক্তি।

সদর থানার ওসি একরামুল হোসাইন, শিবগঞ্জ থানার ওসি মতিউর রহমান, নাচোল থানার ওসি সুকোমল চন্দ্র দেবনাথ এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

গাইবান্ধা : সাঘাটা উপজেলায় বজ্রপাতে মা-ছেলের মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার বিকেলে ভরতখালী ইউনিয়নের মান্দুরা গ্রামের দাসপাড়ায় ঘটনাটি ঘটে। মৃতরা হলেন মান্দুরা গ্রামের শৈলেন চন্দ্র দাসের স্ত্রী কল্পনা রানী দাস (৫৫) ও ছেলে সোহাগ চন্দ্র দাস (৩২)। স্থানীয়রা জানায়, সোহাগ ঢাকায় চাকরি করতেন এবং এবার ঈদের ছুটিতে বাড়িতে আসেন। বিকেলে হঠাৎ বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিলে তিনি মা কল্পনা রানীর সঙ্গে বাড়ির বাইরে শুকাতে দেওয়া খড় তুলতে যান। এক পর্যায়ে বজ্রপাতে মা-ছেলে দুজন বজ্রপাতের শিকার হন। মান্দুরা গ্রামের ইউপি সদস্য সাহিন আলম জানান, বজ্রপাতে আহত মা-ছেলেকে স্থানীয়রা গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু পথেই মা-ছেলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

ময়মনসিংহ : মুক্তাগাছার রৌয়ারচর বাজার এলাকায় গতকাল বজ্রপাতে কলেজ শিক্ষক এ এস এম খালেকুল আজাদ (৫৬) নিহত হন। তিনি উপজেলার রঘুনাথপুর রৌয়ারচর গ্রামের মৃত ইউসুফ আলীর ছেলে। খালেকুল উপজেলার গাবতলী ডিগ্রি কলেজে গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন।

গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) : গফরগাঁওয়ে মাঠ থেকে গরু আনতে গিয়ে বজ্রাঘাতে প্রাণ গেল সিয়ামুল ইসলাম সিয়াম (২৩) নামের এক যুবকের। গতকাল পাগলা থানাধীন পাঁচবাগ ইউনিয়নের মধ্য লামকাইন গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। সিয়াম ওই গ্রামের মৃত রুকন মিয়ার ছেলে।

পঞ্চগড় : সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া এলাকায় গতকাল বিকেলে বজ্রপাতে শাহাদাত হোসেন (১৯) নামের এক তরুণ নিহত হন। তিনি ট্রাক্টরচালকের সহকারী ও এলাকার কেরামত আলীর ছেলে। অমরখানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

নীলফামারী : ডিমলা উপজেলার নাউতারা নিজপাড়া গ্রামে গতকাল সন্ধ্যায় বজ্রপাতে রবিউল আলম নামের এক ব্যক্তি নিহত এবং শেরিনা বেগম নামের এক নারী গুরুতর আহত হন। রবিউল গ্রামটির নুর ইসলামের ছেলে। নাউতারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলাম বাবু এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

মিরপুরে আরো এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক
মিরপুরে আরো এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার

রাজধানীর মিরপুরে এক সপ্তাহের ব্যবধানে আরো এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনিও একা বসবাস করতেন। মিরপুর-৬ এলাকার একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা এই নারীর নাম সেলিনা আফরোজ (৫৫)। তাঁর স্বামী ও দুই সন্তান দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় বসবাস করেন।

পুলিশ জানায়, গত মঙ্গলবার জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে খবর পেয়ে পল্লবী থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. এমদাদুল হক জানান, সেলিনা আফরোজ প্রায় ১২ বছর আগে কানাডা থেকে দেশে ফিরে বাবার ফ্ল্যাটে একা বসবাস শুরু করেন। তাঁর স্বামী ও দুই মেয়ে বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন। ফ্ল্যাটের দরজা খুলে স্বজনরা তাঁর মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, গত ২৬ মে থেকে ৩ জুনের মধ্যের কোনো একসময় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। কারণ ২৬ মে রাতে এক ভাতিজার সঙ্গে ফোনে সর্বশেষ তাঁর কথা হয়েছিল। এর পর থেকে পরিবারের সদস্য বা স্বজনদের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।

পুলিশ জানায়, মরদেহে পচন ধরায় কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল কি না, এ ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা প্রক্রিয়াধীন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন  পেলে ও তদন্ত শেষে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।

এর আগে গত রবিবার রাজধানীর পল্লবী এলাকায় নূরজাহান বেগম নামের এক বৃদ্ধার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনিও একটি ঘরে মৃত অবস্থায় পড়ে ছিলেন। পরে পল্লবী থানার পুলিশ গিয়ে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে।

আদ-দ্বীনে ছয় নবজাতকের মৃত্যু

হাসপাতালের অবহেলার প্রমাণ মিলেছে তদন্তে

নিজস্ব প্রতিবেদক
হাসপাতালের অবহেলার প্রমাণ মিলেছে তদন্তে

রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি। তিন সদস্যের কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে অক্সিজেনের স্বল্পতা তৈরি হয়। বদ্ধ কক্ষে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় অস্ত্রোপচারের পর রাখা নবজাতকদের জন্য পরিবেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর হাসপাতালটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গতকাল বৃহস্পতিবার হাসপাতালের প্রধান ফটকে কারণ দর্শানোর নোটিশ টানিয়ে দেওয়া হয়। এতে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সন্তোষজনক জবাব দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হলে হাসপাতালের নিবন্ধন বাতিল করা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে মন্ত্রণালয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্ত ছাড়া মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ সম্ভব নয়। তবে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং লিখিত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ছোট একটি বদ্ধ কক্ষে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকায় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে নবজাতকদের দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, নার্সদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে।

চরম অবহেলা ও অসহযোগিতা : গতকাল সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন তদন্ত প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তদন্ত কমিটি দায়িত্বরত সেবিকা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং মৃত নবজাতকদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে চরম অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে।

মন্ত্রী জানান, নবজাতকদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলেও সংশ্লিষ্ট নার্স দ্রুত সাড়া দেননি। অভিভাবকদের আহ্বানেও তাঁরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেননি এবং কোনো চিকিৎসককে বিষয়টি অবহিত করেননি। ফলে জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদানে বিলম্ব ঘটে। তদন্তে আরো দেখা গেছে, পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড নম্বর-২-এ রোগীদের দেখাশোনার জন্য কোনো চিকিৎসক দায়িত্বে ছিলেন না। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় সেবিকাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণও ছিল না।

ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ : স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, প্রায় ৯০০ বর্গফুট আয়তনের ওই কক্ষে ১১ জন রোগী, নবজাতক ও তাদের স্বজনসহ প্রায় ৫০ জন অবস্থান করছিল। কক্ষটিতে আলো-বাতাস চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। অতিরিক্ত লোকজনের উপস্থিতিও নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। তিনি বলেন, হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে তাঁরা হাসপাতাল পরিচালনার মৌলিক শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান আইনে যে শাস্তির বিধান রয়েছে, হাসপাতালের বিরুদ্ধে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগামী রবিবারের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, নোটিশের জবাব সন্তোষজনক না হলে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের নিবন্ধন বাতিল করা হবে। সেখানে চিকিৎসাধীন রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হবে। মন্ত্রী আরো বলেন, মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার দিন শেষ। আইনে যতটুকু কঠোর হওয়ার সুযোগ রয়েছে, আমরা তার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করব।

ময়নাতদন্ত হয়নি : গত ২৭ মে ভোর ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনার পর পুলিশ ও সিআইডি ময়নাতদন্তের উদ্যোগ নিলেও শোকাহত পরিবারগুলোর আপত্তির কারণে তা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ময়নাতদন্ত না হওয়ায় মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা যায়নি। তবে তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে।

হাসপাতালের অনুমোদন প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক অনুমোদন থাকলেও পরবর্তী সময়ে ভবনে একাধিক পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা আইনসংগত নয়। রাজউকের এক প্রতিবেদনে ভবনের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয় উঠে এসেছে। তদন্তে নবম তলায় বেকারি স্থাপনের অভিযোগেরও সত্যতা পাওয়া গেছে।

সারা দেশে নজরদারি জোরদার : আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ঘটনার পর দেশের সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ওপর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বিভাগীয় পরিচালক, জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনদের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নতুন হাসপাতাল বা ক্লিনিকের লাইসেন্স দেওয়ার আগে ভবনের উপযোগিতা যাচাই এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

দণ্ডবিধির ১৮৬০ সালের ৩০৪-ক ধারায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। তদন্তে প্রমাণিত অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এ ধারাসহ অন্যান্য প্রযোজ্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

বৃদ্ধার মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন

ওই দিনই মারা যান নূরজাহান পিঠে ছিল ‘শয্যাক্ষত’

অনির্বাণ বিশ্বাস
ওই দিনই মারা যান নূরজাহান পিঠে ছিল ‘শয্যাক্ষত’
নূরজাহান বেগমে

যে মা পরম আদর, স্নেহ আর ভালোবাসায় একেকটিকে সমাজের চোখে সেরা সন্তান হিসেবে গড়ে তুলে গেলেন; দৃষ্টির অগোচরে তাঁরা দেখতে রক্ত-মাংসের মানুষ ঠিকই, কিন্তু ভেতরে আসলে পাথর! নিজের মৃত্যুর পর যখন চারপাশে শোরগোল উঠল, তখন মানুষের মধ্যে এমন ধারণাই ছড়িয়ে পড়ছে। মিরপুরের একাকী ফ্ল্যাটে পড়ে থেকে ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের অসহায় মৃত্যুর পর বিষয়টি এভাবেই চাউর হয়েছে। যদিও নূরজাহান বেগমের সন্দেহবাতিক বা সিজোফ্রেনিয়া রোগও ছিল বলে জানা গেছে। তিনি সবাইকে সন্দেহ করতেন। মনে করতেন সবাই তাঁকে মেরে ফেলবে। তাই তিনি কাউকেই কাছে ঘেঁষতে দিতেন না। মৃত্যুর সময় পাশে কেউ ছিল না। সাধারণ মানুষ মনে করেন, এটিই কাল হয়েছে তাঁর সন্তানদের জন্য। শেষ সময়ে মায়ের পাশে না থাকায় যতই উচ্চশিক্ষিত আর প্রতিষ্ঠিতই হোক না কেন, তাঁদের মূল্যবোধহীন পাষাণ হিসেবেই দেখছেন অনেকে। তবে কালের কণ্ঠের তথ্যানুসন্ধানে বেশ কিছু বিষয় সামনে এসেছে। যেখানে দেখা যায়, নূরজাহান বেগম আসলে এক সপ্তাহ আগে নয়, বরং ওইদিনই মারা গেছেন। নার্স, পুলিশ ও মর্গের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চাঞ্চল্যকর এ তথ্য দিয়েছেন।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, মরদেহের ময়নাতদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মর্গে আনার পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোনো এক সময় নূরজাহান বেগমের মৃত্যু হয়েছে। অনেক দিন আগে মৃত্যুর কারণে শরীরে পচন ধরার বিষয়টি আসলে পিঠের ক্ষত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এর নাম বেডসোর বা শয্যাক্ষত। বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত দেখা যায়।

পরিবার জানায়, মারা যাওয়ার দিনই (৩১ মে) তাঁর মরদেহ পুলিশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। এর পরদিন তাঁর লাশ চাঁদপুরের উত্তর উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। নূরজাহান বেগমের মৃত্যু ঘিরে বিতর্ক ও রহস্যের জট খুলতে টানা দুই দিন অনুসন্ধান করেছে কালের কণ্ঠ। প্রয়াত এই নারীর বড় ছেলে যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমান, ছোট ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম আশিকুর রহমান। মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানা মিরপুরের একটি স্কুলের শিক্ষক।

আলোচিত ভবনটিতে বুধবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটক খোলা থাকলেও ভেতরের আরেকটি গেট তালা দেওয়া। কলিং বেল চাপলে নিচতলার ফ্ল্যাট থেকে একজন নারী বেরিয়ে আসেন। প্রথমে কথা বলতে না চাইলেও পরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, তিন বছর ধরে তিনি নিচতলার ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন। তবে চারতলার ফ্ল্যাটের নূরজাহান বা তাঁর মেয়ে ফাতিমার সঙ্গে কখনো কথা হয়নি।

ওই নারী বলেন, তিনি (ফাতিমা) কারো সঙ্গে কথা বলতেন না। বাসায় কাউকে ঢুকতেও দিতেন না। চুপচাপ বাসা থেকে বের হতেন, চুপচাপ ঢুকতেন। মাথার চুল আউলা-ঝাউলা থাকত বেশির ভাগ সময়। মাঝে মাঝে দেখতাম শুকনা খাবার নিয়ে আসতেন। গত তিন বছরে তাঁর মাকেও কখনো দেখিনি। শুনেছি ঈদের দিন তাঁর (মৃত বৃদ্ধা) নাতি খাবার দিয়ে গেছে। লাশ উদ্ধারের দিন পুলিশ আসার পর শুনলাম তিনি মারা গেছেন।

বাড়ির অন্যদের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ দেখালে তিনি বলেন, গেট খোলার ব্যাপারে বাড়িওয়ালার নিষেধ আছে।

জানা যায়, ভবনটির মালিকানা নূরজাহান বেগমের মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানার শ্বশুরপক্ষের। ফাতিমার স্বামী মারা যান ২০১৭ সালে। স্বামীর মালিকানা সূত্রে পাওয়া ফ্ল্যাটেই মাকে নিয়ে থাকতেন ফাতিমা।

ওই ভবনে ভাড়া থাকা এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর নিঃসন্তান ফাতিমা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। নিঃসঙ্গতা কাটাতে প্রায় দুই বছর আগে ভাইয়ের বাসা থেকে নিয়ে আসেন মাকে।

ফাতিমার ভাই বুয়েটের অধ্যাপক আশিকুর রহমান। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁর দুলাভাই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক। নিঃসঙ্গতা কাটাতে ২০২৪ সালে বুয়েট শিক্ষক ভাইয়ের বাসা থেকে মাকে নিয়ে আসেন নিজের কাছে।

মানসিক জটিলতার ইঙ্গিত : নূরজাহানের মরদেহ উদ্ধারের সময়কার ভিডিওতে দেখা যায়, পুরো ফ্ল্যাটে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশ। রান্নাঘরের চিত্রও ছিল ভয়াবহ। নূরজাহানের মতো একই ধরনের নোংরা পরিবেশ ছিল পুরো ফ্ল্যাটে। এমনকি মেয়ে ফাতিমার কক্ষের চিত্রও একই রকম বলে জানিয়েছেন ঘটনাস্থলে যাওয়া নার্স ও পুলিশ কর্মকর্তা।

নূরজাহান বেগমের ছোট ছেলে অধ্যাপক আশিকুর রহমানও ফ্ল্যাটে নোংরা পরিবেশের কথা স্বীকার করেছেন। তবে তাঁর দাবি, বেশ কয়েকবার ফ্ল্যাট পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিয়েও মা এবং বোনের অনীহার কারণে সফল হননি। এর কারণ হিসেবে তিনি মায়ের দীর্ঘদিনের মানসিক জটিলতার ইঙ্গিতও দিয়েছেন। এই জটিলতা ধীরে ধীরে মেয়ের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা।

মায়ের মানসিক কিছু জটিলতার ইঙ্গিত দিয়ে অধ্যাপক আশিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, আমরা সব সময় উনার ইচ্ছাটাকেই একটু বেশি প্রাধান্য দিতাম। কারণ উনি একটু সন্দেহপ্রবণ ছিলেন। এটা সিজোফ্রেনিয়া বা এই টাইপের কি নাআমরা নিশ্চিত নই। তবে আব্বা বলতেন, এ রকম কিছু একটা আছে। এ জন্য উনার ইচ্ছাটাকেই প্রাধান্য দিতাম।

তবে নূরজাহান বেগমকে কখনো মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নেওয়া হয়নি বলে স্বীকার করেন অধ্যাপক আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, উনার সমস্যাটি বাবা বেঁচে থাকতেই ছিল। আমরা এটা কখনো ওইভাবে ডিল করিনি। এই বাড়ে তো কমে, এটা আসলে কোনো ফিক্সড বিষয় ছিল না।

ফ্ল্যাটের ভেতরে নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ : দুই বেডরুমের ফ্ল্যাটের একটিতে থাকতেন নূরজাহান বেগম, আরেকটিতে তাঁর মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানা। নূরজাহানের মৃত্যুর বিষয়টি প্রথম তাঁর সন্তানদের নিশ্চিত করেন মিরপুরের ল্যাব প্লাস ডায়াগনস্টিকের নার্স তামান্না আহমেদ। বোনের কাছ থেকে ফোন পেয়ে ৩১ মে বিকেলে অধ্যাপক আশিকুর রহমান ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে তামান্নাকে নিয়ে মিরপুরের ফ্ল্যাটে ছুটে যান। তামান্না কালের কণ্ঠকে জানান, শুধু নূরজাহানের কক্ষ নয়, পুরো ফ্ল্যাটই ছিল নোংরা এবং অপরিচ্ছন্ন। ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে ফ্ল্যাটে ঢোকা যাচ্ছিল না। ঘটনাস্থলে যাওয়া পল্লবী থানার এসআই শামসুর রহমানও জানান, ফ্ল্যাটের প্রতিটি কক্ষ ছিল অগোছালো এবং নোংরা। নূরজাহান বেগমের প্রতি সন্তানদের অবহেলার পাশাপাশি ভরণপোষণ না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যদিও এর কোনো সত্যতা নেই বলে দাবি করেছে পরিবার।

মৃতদেহে পচনের তথ্য : মৃতদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত নার্স, পুলিশ কর্মকর্তা, ময়নাতদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন কালের কণ্ঠের প্রতিবেদক। তাঁরা জানান, সপ্তাহখানেক আগে নূরজাহান বেগমের মৃত্যু অথবা মৃতদেহে পচনের কারণে পোকা জন্মানোর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

নার্স তামান্না আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, আমি আমার আরেক কলিগকে নিয়ে ফ্ল্যাটে ঢোকার পর মেয়ে উনার মার রুমটা দেখিয়ে দেন। পরে দেখি মহিলা খাটের ওপর শুয়ে আছেন, উনার গায়ে একটা কম্বল দেওয়া। উনি ডান কাত হয়ে তাকিয়ে আছেন। আমরা পালস চেক করে দেখলাম পালস নেই। আমার কলিগ বিপি চেক করল। তখন দেখলাম উনার বগলের নিচ থেকে একটা পোকার মতো কী যেন বের হচ্ছে। লাশটা শক্ত হয়ে আছে। মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম উনি (নূরজাহান) কখন থেকে এভাবে আছেন। উনি বললেন সকালে মাকে আপেল খাইয়েছেন, দুপুর ১টা-২টার দিকে দুপুরের খাবারের কথা জিজ্ঞেস করেছেন। তখনো নাকি তিনি জীবিত ছিলেন।

তামান্না এরপর ট্রিপল নাইনে কল করে ঘটনাটি পুলিশকে জানান। দেহে পোকার বিষয়টি নিয়ে আবারও প্রশ্ন করলে তিনি আগের তথ্য পরিবর্তন করে বলেন, উনার পুরো শরীরটা দেখিনি। জাস্ট হাতটা দেখছি, আর গলাটা দেখছি। গলা শক্ত হয়ে ডান কাত হয়ে ছিল, এখানে কোনো পোকা ছিল না। কিন্তু বগলের নিচে মে বি পোকা ছিল। আমি শিওর না, আমার কাছে মনে হচ্ছে ওইখানে পচন ধরেছিল। আমি জাস্ট এক পলক দেখামাত্রই হাত নামিয়ে ফেলেছি।

তামান্না আহমেদের ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে যান পল্লবী থানার ওসি মো. হাসান বাসির এবং উপপরিদর্শক শামসুর রহমান। এসআই শামসুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, মাথার ডান পাশে হালকা একটু আঘাতের দাগ আছে। হয়তো পড়ে গিয়েছিলেন। প্রথমে সুরতহাল প্রতিবেদনে আমি এটা লিখিনি। পরে ফরেনসিক ডাক্তার আঘাতের দাগ দেখতে পেয়ে বিষয়টা আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেন।

নূরজাহান বেগমের মরদেহে পচন ছিল কি না জানতে চাইলে শামসুর রহমান বলেন, হাতগুলো স্বাভাবিক ছিল। তবে অনেক দিন ধরে শুয়ে ছিলেন তো, তাই পিঠের দিক দিয়ে পচে গেছে। পিঠ থেকে পাঁজর পর্যন্ত পচে গেছে।

নূরজাহান বেগমের ময়নাতদন্ত হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল মর্গে। এতে জড়িত একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, লাশ পচাগলা ছিল না। ওই দিন উনি বিকেলেই সম্ভবত মারা গেছেন। আর রাতে মর্গে আসে লাশ। পিঠে ঘা ছিল, যেটাকে বেডসোর বলে। পাঁজরেও ঘা দেখেছি। ছোপ ছোপ ঘাগুলো একেক সাইজের। দুই থেকে তিন ইঞ্চি সাইজের ঘা। পিঠের জায়গায় জায়গায় ঘা ছিল। ওই ঘায়ের মধ্যে পোকা দেখিছি। ওই পোকাগুলোই সারা শরীরে ছড়িয়েছে।

কলেজটির মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. নাশাত জাবীন নূরজাহান বেগমের মরদেহের ময়নাতদন্ত করেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, আমাদের কাছে বডিটা ফ্রিজিং গাড়িতে করে আসে। শরীরে ডিকম্পোজিশন (পচন) ছিল না, তবে বেডসোর (শয্যাক্ষত) ছিল।

একই কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আইনুল ইসলাম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, বেডসোর হলো ত্বকের এমন এক ধরনের ক্ষত, যা দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে শুয়ে বা বসে থাকার কারণে শরীরের কোনো অংশে অতিরিক্ত চাপ পড়লে তৈরি হয়। সাধারণত কোমর, পিঠ, নিতম্ব, গোড়ালি বা কনুইয়ে এটি বেশি দেখা যায়। বয়স্কদের ক্ষেত্রে বেডশোর বেশি দেখা যায়। 

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, এ ক্ষেত্রে জটিল মানসিক রোগ হওয়ার আশঙ্কাটাই বেশি। বিশেষ করে এটি সিজোফ্রেনিয়া হয়ে থাকলে রোগীর মধ্যে অনেক ভ্রান্ত চিন্তা-ভাবনা কাজ করে। রোগীকে অনেকভাবে কনভিনসের চেষ্টা করেও নিজস্ব বিশ্বাস থেকে নড়ানো যায় না। তাঁর মধ্যে নানা রকমের সন্দেহ থাকতে পারে এবং সন্দেহগুলা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর পরিবারের মধ্যেই হয়।