kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বইয়ের ফেরিওয়ালা সুনীল গাঙ্গুলি

কোটালীপাড়া (গোপালগঞ্জ) প্রতিনিধি   

১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বইয়ের ফেরিওয়ালা সুনীল গাঙ্গুলি

কোটালীপাড়ায় বই নিয়ে পাঠকদের দ্বারে দ্বারে ঘোরেন সুনীল কুমার গাঙ্গুলি। ছবি : কালের কণ্ঠ

গ্রামের নাম কুমরিয়া। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার কলাবাড়ী ইউনিয়নে সবুজ-শ্যামলিমা সেই গ্রাম। পাশের নলুয়া গ্রামের ভেতর দিয়ে একটি বিধ্বস্ত সড়ক পাড়ি দিয়ে যেতে হয় কুমরিয়ায়। এই কুমরিয়া গ্রামে হাজার দুয়েক লোকের বাস। তাঁদেরই একজন সুনীল কুমার গাঙ্গুলি। তিনি অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক। উপজেলা সদর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ২৫ বছর শিক্ষকতা করেছেন। দীর্ঘ এই শিক্ষাজীবনে অনেক ছাত্রছাত্রীর মাঝেই তিনি শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন। আর এখন বই বিলিয়ে ছড়াচ্ছেন অন্য রকম আলো।

অবসর নেওয়ার পর ২০১৪ সালে নিজ বাড়ির পাশে একক প্রচেষ্টায় গড়ে তোলেন চন্দ্রিকা জ্ঞান পাঠাগার। তাঁর এই পাঠাগারে রয়েছে ছয় শতাধিক বই। তবে এই বই নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন। তাঁর ইচ্ছা পাঠাগারটি বইয়ে বইয়ে ভরে উঠুক। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে সেটি পারছেন না বলে জানিয়েছেন শিক্ষার আলো ছড়ানো এই ‘ফেরিওয়ালা’।

পাঠাগারটিতে তেমন কোনো আসবাব না থাকায় অনেক মূল্যবান বই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনই ঝেড়ে-মুছে নিজের সন্তানের মতো বইগুলো আগলে রাখেন সুনীল গাঙ্গুলি। অন্যান্য পাঠাগারের চেয়ে সুনীলের এই পাঠাগারটি খানিকটা ব্যতিক্রম। এখানে নেই কোনো চেয়ার-টেবিল। পাঠক সমাগমও তেমন নেই। সুনীল তাঁর বইয়ের তালিকা নিয়ে পাঠকদের দ্বারে দ্বারে ছুটে যান। পাঠকের কাছে যে বইটি পছন্দ হয় সুনীল গাঙ্গুলি  পরের দিন ওই পাঠকের কাছে পছন্দের বইটি পৌঁছে দেন। আবার ওই ব্যক্তির বই পড়া শেষ হলে তিনি গিয়ে বইটি নিয়ে আসেন। বিনিময়ে তিনি কোনো টাকা-পয়সা নেন না। যদি কেউ খুশি হয়ে পাঁচ-দশ টাকা দেয়, তা দিয়ে তিনি পাঠাগারের জন্য নতুন বই কেনেন। তবে পাঠকের চাহিদামতো বই না থাকার কারণে দিন দিন পাঠকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বর্তমানে এই পাঠাগারের সহস্রাধিক পাঠক রয়েছে।

চন্দ্রিকা জ্ঞান পাঠাগারের নিয়মিত পাঠক উপজেলার ঘাঘর বাজারের হোমিও চিকিৎসক প্রেম রঞ্জন মণ্ডল বলেন, ‘আমি পাঁচ বছর ধরে চন্দ্রিকা জ্ঞান পাঠাগারের পাঠক। প্রায় ২০ কিলোমিটার দূর থেকে এসে সুনীল কুমার গাঙ্গুলি আমাকে বই দিয়ে যান। বই পড়া শেষ হলে আবার নতুন একটি বই দিয়ে পুরনো বইটি নিয়ে যান। বিনিময়ে তিনি কোনো টাকা-পয়সা নেন না। বর্তমানে তাঁর মতো এ ধরনের ব্যক্তি সমাজে বিরল।’

সুনীল কুমার গাঙ্গুলি বলেন, ‘ছাত্রজীবনে বইপড়ার প্রতি ঝোঁক ছিল। কিন্তু তখন অর্থকষ্টের কারণে বই কিনে পড়তে পারিনি। সেখান থেকেই ইচ্ছা ছিল একটি পাঠাগার করার। চাকরি জীবনে আমার এই পাঠাগার করার ইচ্ছাপূরণ হয়নি। অবসর নিয়ে সেই ইচ্ছা পূরণ করেছি। কিন্তু এখনো ইচ্ছানুযায়ী বই সংগ্রহ করতে পারিনি। পাঠাগারে বই ও আর্থিক সহযোগিতা চেয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে আবেদন করেছি। কিন্তু কেউ সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি। আমি চাই, এলাকার বিত্তবানরা এই পাঠাগার উন্নয়নে এগিয়ে আসুক। পাঠাগারটি নিয়েই আমার এখন সব স্বপ্ন। আমি মৃত্যুর পর এই পাঠাগার ও পাঠকের মাঝে বেঁচে থাকতে চাই।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘বর্তমান সময়ে সুনীল কুমার গাঙ্গুলির কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। আমি ব্যক্তিগত ও সরকারিভাবে চন্দ্রিকা জ্ঞান পাঠাগারের জন্য সব ধরনের সহযোগিতা করব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা