kalerkantho

আপত্তিকর ডিভিও প্রকাশ

জামালপুরের ডিসি ওএসডি

নিজস্ব প্রতিবেদক ও জামালপুর প্রতিনিধি   

২৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জামালপুরের ডিসি ওএসডি

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জামালপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আহমেদ কবীরকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। সেখানে নতুন ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে পরিকল্পনামন্ত্রীর একান্ত সচিব (উপসচিব) মোহাম্মদ এনামুল হককে। গতকাল রবিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পৃথক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জনস্বার্থে জারি করা এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গা ও খাগড়াছড়ি জেলার বর্তমান ডিসিদের সরিয়ে ওই দুটি জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সাধারণত এক কর্মস্থলে আড়াই থেকে তিন বছর পর্যন্ত একজন সরকারি কর্মচারীকে রাখা হয়। এ দুই জেলার ডিসির কার্যকাল হয়েছে যথাক্রমে আট মাস ও এক বছর। তবে তাঁদের কী কারণে সরানো হয়েছে সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

জামালপুরের ডিসি ওএসডি : জামালপুরের ডিসি আহমেদ কবীরের বিরুদ্ধে অন্তত তিন মাস আগে থেকেই দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলা সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ ছিল। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এসব অভিযোগ এলেও তাঁর বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চ পর্যায়ের সূত্র কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করে যে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের কারণে আহমেদ কবীরকে ডিসি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চিন্তা তাদের ছিল। কিন্তু ডিসি ফিটলিস্ট অনুযায়ী একসঙ্গে ২২টি জেলার ডিসি পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া চলছে। এর সঙ্গে জামালপুরের ডিসিকেও সরানোর পরিকল্পনা ছিল। তার আগেই আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশের ঘটনায় তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

গতকাল উপসচিব এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকারের সই করা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জামালপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ কবীরকে ওএসডি করা হয়েছে। তাঁকে বদলিপূর্বক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে একটি ফেসবুক আইডিতে আপত্তিকর একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। গত কয়েক দিনে ভিডিওটি ভাইরাল হয়। ওই ভিডিওতে একজন পুরুষ ও এক নারীকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখা যায়। পুরুষটিকে অনেকেই ডিসি আহমেদ কবীর বলে চিহ্নিত করেন। আর নারী তাঁর অফিসের একজন কর্মী। ভিডিওতে যে কক্ষটি দেখা গেছে সেটিকে ডিসির কার্যালয়সংলগ্ন খাসকামরা বলে চিহ্নিত করা হয়।

ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোরগোল তৈরি হলে স্থানীয় সাংবাদিকরা ডিসির কাছে ব্যাপারটি জানতে চান। কিন্তু ডিসি আহমেদ কবীর দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিটি তিনি নন। তবে খাসকামরাটি তাঁরই বলে স্বীকার করেন তিনি। বিষয়টি সাজানো দাবি করে আহমেদ কবীর স্থানীয় সাংবাদিকদের সংবাদ প্রকাশ না করতেও অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ডিসি আহমেদ কবীর অনেক আগে থেকেই ওই নারীর সঙ্গে মেলামেশা করে আসছিলেন। গতকাল মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদককে ডিসির বাংলোতে দুজনের অন্তরঙ্গ আরেকটি ছবি দেখান।

আহমেদ কবীরের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন থেকে ডিসি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এসব বিষয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেখা হবে। সেই সঙ্গে কর্মরত কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

এদিকে আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশের ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গতকাল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আদেশ জারি করে। পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মুশফিকুর রহমানকে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন শৃঙ্খলা অধিশাখার উপসচিব সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনারের প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) প্রতিনিধি। কমিটিকে আগামী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একটি সূত্রে জানা গেছে, দোষী প্রমাণিত হলে আহমেদ কবীরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে চাকরি হারাতে হতে পারে।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মুশফিকুর রহমান গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আগামীকাল (আজ সোমবার) থেকে কাজ শুরু করব। আশা করি নির্ধারিত ১০ কর্মদিবসের মধ্যেই প্রতিবেদন দিতে পারব।’

ডিসি অফিসের কর্মচারী ওই নারী আত্মগোপনে : গত শনিবার রাতে ডিসি আহমেদ কবীর তাঁর সরকারি বাসভবন ত্যাগ করেছেন। অন্যদিকে দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটির পর গতকাল কর্মস্থলে যোগদান করেননি ডিসি অফিসের আলোচিত সেই নারী কর্মচারী। তাঁর মোবাইল ফোনে ফোন করে বন্ধ পাওয়া গেছে। তাঁর অনুপস্থিতির বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রাজীব কুমার সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সে আমাদের কাছ থেকে ছুটি নেয়নি। পূর্বানুমতি ছাড়াই অফিসে অনুপস্থিত রয়েছে।’

এ ছাড়া ডিসির খাসকামরাটি তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজীব কুমার সরকার। তিনি বলেন, ‘আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ওই কক্ষটি তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর এ নিয়ে একাধিক তদন্ত কমিটি কাজ করবে বলে জানানোর পর থেকেই এই ব্যবস্থা নিয়েছি।’ ওই নারী কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তার ব্যাপারে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো আদেশ-নির্দেশনা এখনো পাইনি। পেলে সেই আদেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

চুয়াডাঙ্গা ও খাগড়াছড়িতেও নতুন ডিসি

গতকাল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আরেকটি প্রজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়েছে, চুয়াডাঙ্গার ডিসি গোপাল চন্দ্র দাসকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপসচিব এবং খাগড়াছড়ির ডিসি মো. শহীদুল ইসলামকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে বদলি করা হয়েছে। তাঁদের জায়গায় চুয়াডাঙ্গার ডিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব মো. নজরুল ইসলাম সরকার। আর খাগড়াছড়ির ডিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস।

 

মন্তব্য