ক্রিকেটার এবং ক্রিকেট অন্তঃপ্রাণ মানুষ আহসান জহির জীবনের 'পপিং ক্রিজ' থেকে ৬০ বছর বয়সে আউট হয়ে অজানা প্যাভেলিয়নে চলে গেছেন। আমরা যারা তাঁর পরিচিত কেউ বয়সে বেশি বা কম তারা একজন খাঁটি ক্রিকেটপ্রেমিক ও অসাধারণ মানুষকে দারুণভাবে 'মিস' করব। বয়সে আমার চেয়ে বছর তিনেকের ছোট জহির এত তাড়াতাড়ি ক্রিকেটের আনন্দময় ভুবন থেকে চলে যাবেন ভাবতেও পারিনি। এই তো কিছুদিন আগে একটি টিভি চ্যানেলে ক্রিকেটের আলোচনায় টেলিফোনে যোগ দিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে বাউন্সি উইকেটের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিলেন। মনে করিয়ে দিয়েছিলেন ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে ভিন্ন কন্ডিশনে 'সিমিং ' এবং 'বাউন্সি' উইকেটে তো খেলতে হবে। জহিরের সঙ্গে দেখা হতো মাঝেমধ্যে। মুঠোফোনে প্রায়ই কথা বলতেন ক্রিকেটের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। তাঁর আইডিয়া শেয়ার করতেন। শেষ কথা হয়েছে মঞ্জুর হাসান মিন্টু ভাইয়ের মৃত্যুর পর। বলেছেন একে একে ক্রীড়াঙ্গনের উজ্জ্বল আলোগুলো নিভে যাচ্ছে। জহির কি তখন জানতেন তাঁকেও অল্পদিনের মধ্যে মিন্টু ভাইকে অনুসরণ করতে হবে! একটি চরম সত্যের কাছে আমরা সবাই অসহায়। সেই অল্প বয়সে ক্রিকেটে হাতে খড়ির পর থেকেই মায়াবী ক্রিকেটের প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছেন জহির। আমৃত্যু ক্রিকেট উপভোগ করেছেন। জহির অনেক বছর ধরে ঢাকার প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে (মোহামেডান, আবাহনী, শান্তিনগর, ভিক্টোরিয়া, ওয়ান্ডারার্স, সূর্যতরুণ, উদিতি ক্লাব) খেলেছেন। ১৯৭৫ সালে জাতীয় ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ঢাকায় বরিশালের হয়ে কুমিল্লার বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে সেটি প্রথম সেঞ্চুরি। জাতীয় দলের হয়ে জহিরের খেলার সুযোগ হয়নি; কিন্তু এতে তাঁর কোনো গ্লানি ছিল না। প্রায়ই বলতেন ক্রিকেটের রূপ, রস আর সৌন্দর্য প্রাণভরে উপভোগ করতে পারছি, এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী আছে! খেলার মাঠ থেকে সরে যাওয়ার পর ক্রিকেটের সান্নিধ্য ছাড়েননি। দেশের ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়ে সব সময় চিন্তা-ভাবনা করেছেন। দেশের ক্রিকেটকে দেখেছেন স্বপ্ন এবং আশাভরা মন নিয়ে। আমার পরিচিত জহিরের মতো খুব কম সাবেক ক্রিকেটারকে পেয়েছি, যাঁরা ক্রিকেট মাঠ থেকে বিদায় নেওয়ার পরও বছরের পর বছর ধরে দেশ এবং বিদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে নিয়মিতভাবে ফলো করেছেন প্রচণ্ড আকর্ষণ, গভীর ভালোবাসা এবং অনুরাগ নিয়ে। আমাদের ক্রিকেট জগতে জহির ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী। জহিরের সঙ্গে প্রথম কবে পরিচিত হয়েছিলাম-মনে করতে পারছি না। বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে তাঁর খেলা মাঠে উপস্থিত থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। সম্ভবত ১৯৮৬ সাল। এক সন্ধ্যায় মরহুম আতাউল হক মল্লিক ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের ক্রীড়া লেখক সমিতির অফিসে দেখা করতে এসেছিলেন জহির। সেদিন মল্লিক ভাইয়ের 'অফ ডে' ছিল। আর তাই আমরা তিনজন দীর্ঘ সময় ধরে ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা করেছি। লক্ষ করেছি জহিরের ক্রিকেট-জ্ঞান এবং বোঝার ক্ষমতা। জহির ছিলেন ক্রিকেটের সত্যিকারের পূজারি। মাঠ ও টেলিভিশনে নিয়মিতভাবে ক্রিকেট দেখা, বেতারে খেলার ধারাবিবরণী শোনা এবং বইয়ের পাতায় মজা করে ক্রিকেট উপভোগ করেছেন। মনে পড়ছে বেশ কয়েক বছর আগে পুরানা পল্টনের মোড়ে পুরনো বইয়ের দোকানে জহিরের সঙ্গে দেখা। তিনিও এসেছেন বই কিনতে। সেদিন অ্যালেন গিবসনের 'জ্যাকসনস্ ইয়ার' বইটি কিনেছিলেন। যেখানে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার ১৯০৫ সালের টেস্ট ম্যাচের সরস কাব্য ঠাসা আছে। আমার উৎসাহ লক্ষ করে সেদিন তিনি বইটি নিজে না পড়ে আমাকে প্রথম পড়তে দিয়েছিলেন! আমি সেদিন অন্য এক জহিরকে চিনতে পেরেছি! সাবেক ক্রিকেটার, ক্রিকেট সংগঠক, এমসিসির অনারারি মেম্বার; যিনি অনেক যুগ ধরে এই দেশের ক্রিকেটকে খুব কাছে থেকে দেখেছেন, সাধ্যমতো ক্রিকেটের সেবা করেছেন-সেই রাইস উদ্দিন আহমদ (রাইস ভাই)। জহির সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, 'জহির ছিল একজন ক্রিকেটপাগল মানুষ। ক্রিকেটের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অন্য রকম। ওঁর খেলা মাঝেমধ্যে দেখার সুযোগ হয়েছে। ভালো ক্রিকেট খেলেছেন প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে। খেলেছেন অনেক ক্লাবে। কেন এত ক্লাবে খেলেছেন জানি না! জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পাননি সত্যি, তবে ক্রিকেটকে আঁকড়ে ধরে, ভালোবেসে জহির ঠকেননি!' জহির আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। টিভিতে টকশোতে আর দেখব না। ক্রিকেটকে ঘিরে টকশোতে তিনি আর টেলিফোন করবেন না। লেখা পড়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন না। স্ত্রী ও এক মেয়েকে রেখে চলে গেছেন জহির। সদা হাস্যময় এ মানুষটির সান্নিধ্য আমরা উপভোগ করেছি। পরম করুণাময় আমাদের লোকচক্ষুর আড়ালে জহিরকে নিশ্চয়ই ভালো রেখেছেন।