গ্রেটেস্ট স্পোর্টস ইভেন্ট অন এশিয়া। এশিয়ান গেমস। এশিয়ান অলিম্পিয়াড। চার বছর পর পর এশিয়ায় তুলনাহীন অনুষ্ঠান। খেলাধুলাই মুখ্য বিষয়। কিন্তু এশিয়ান গেমসের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য এবং নীতি-শিক্ষাও গৌণ নয়। এশিয়ান গেমসে একদিকে নীতির মহিমা, আরেক দিকে গতির কাব্য। শক্তি শৈলী বীরপনারও। এশিয়ার মানুষ একসঙ্গে মিলেমিশে নিষ্কাম শৌর্যে শারীরিক শক্তি-সামর্থ্যের সাক্ষ্য দেবে। আবার সখ্য ও সৌভাগ্যের হাত বাড়িয়ে শান্তি ও মৈত্রীর পথ প্রশস্ত করবে। মানবতার জয়গান গাইবে। ঐক্যবদ্ধভাবে গড়ে তুলবে সুন্দর এশিয়া। প্রগতির জন্য অতিক্রম করবে অনতিক্রম্য বাধা। এটিই হচ্ছে এশিয়ান গেমসের মূল আদর্শ। খেলাধুলার মাধ্যমে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রীতির সম্পর্ক স্থাপনের পরিকল্পনা প্রথম যাঁর মাথায় এসেছিলতিনি হলেন শিক্ষাবিদ ও ক্রীড়ানুরাগীগুরুদত্ত সোন্ধী। ১৯৪৮ সালে লন্ডনে চতুর্দশ অলিম্পিক চলাকালে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিনি এশিয়ান গেমস নিয়ে আলোচনা করেন। প্রতিনিধিরা এক মত হয়ে সিদ্ধান্ত নেন ১৯৫১ সালে ভারতের দিল্লিতে হবে প্রথম এশিয়ান গেমস। সেখানেই এশিয়ান গেমস ফেডারেশন গঠিত হয়। গুরুদত্ত সোন্ধী হন এশিয়ান গেমস ফেডারেশনের প্রথম সম্পাদক। অলিম্পিক আদর্শের অন্যতম পূজারি গুরুদত্ত সোন্ধী এখন আর বেঁচে নেই। কিন্তু এশিয়ান গেমসের মধ্যেই তিনি অমর হয়ে আছেন, যে গেমসের আরেক নাম এশিয়ান অলিম্পিয়াড। ভারতের দিল্লির ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে ১৯৫১ সালের ৪ থেকে ১১ মার্চ প্রথম এশিয়ান গেমস অনুষ্ঠিত হয়। এশিয়ান গেমস কার্যনির্বাহী কমিটির প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন গুরুদত্ত সোন্ধী। সভাপতি পাতিয়ালার মহারাজা যাদবেন্দ্র সিং এবং গেমসের ডাইরেক্টর অ্যান্টনি ডি মেনোর। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর উৎসাহ ও সর্বাত্মক সাহায্যে প্রথম এশিয়ান গেমস এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বিরাট আলোড়ন তোলে। প্রথমবার অংশ নিয়েছিল ১১টি দেশ ছয়টি খেলার ডিসিপ্লিনে। এগুলো হলোফুটবল, বাস্কেটবল, অ্যাথলেটিকস, ভারোত্তলন, সাইক্লিং ও জলক্রীড়া। ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ গেমসের উদ্বোধন করেন। ১৯২৪ ও ১৯২৮ সালের অলিম্পিকে ভারতের ব্রড জাম্পার ব্রিগেডিয়ার দলীপ সিং গেমসের অনির্বাণ শিখা প্রজ্বলিত করেন। প্রথম এশিয়ান গেমসে ফুটবল ও অ্যাথলেটিকস দর্শকদের সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে। বাঙালি ফুটবলার মৈলেন মান্নার নেতৃত্বে ফুটবলে ভারত এশিয়ার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ আখ্যা পেয়েছিল। ভারত আফগানিস্তানকে ৩-০ গোলে পরাজিত করে ফাইনালে ওঠে। ভারতের পক্ষে গোল করেছিলেন ভেঙ্কটেশ, খেওয়ানান ও এস নন্দী। অন্য সেমিফাইনালে ইরান জাপানকে ৩-২ গোলে পরাজিত করে ফাইনালে ওঠে। ফাইনালে ভারত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১-০ গোলে ইরানকে পরাজিত করে ফুটবলে স্বর্ণপদক লাভ করে। খেলার দ্বিতীয়ার্ধের চার মিনিটে খেওয়ানান জয়সূচক গোলটি করেন। অ্যাথলেটিকসে সার্বিকভাবে ভারতের পুরুষ অ্যাথলেটদের সাফল্য ছিল বেশি। ভারতের পেছনেই ছিল জাপান। ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়ে লেভি পিন্টেন প্রথম হয়ে এশিয়ার দ্রুততম দৌড় বীরের সম্মান পেয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালে দ্বিতীয় গেমস অনুষ্ঠিত হয় ম্যানিলায়। এই গেমসে তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে স্থান পেয়েছিলেন শেখ মো. সাহেব আলী ও নবী চৌধুরী। এরপর ১৯৫৮ সালে টোকিও এশিয়ান গেমসে পাকিস্তান ফুটবল দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নবী চৌধুরী। নবী চৌধুরী প্রথম বাঙালি, যিনি পাকিস্তান ফুটবল দলে অধিনায়কত্ব করেছেন। টোকিও এশিয়ান গেমসে নবী চৌধুরী ছাড়াও আরো পাঁচজন বাঙালি খেলোয়াড় ছিলেন। যেটি লক্ষণীয়, তা হলো মধ্য পঞ্চাশ দশকে ঢাকার ফুটবলের মান ছিল অনেক উঁচুতে। পাকিস্তান দলে আর কখনো একসঙ্গে ছয়জন বাঙালি খেলোয়াড়ের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ হয়নি। এশিয়ান গেমস হলো এশিয়ার ক্রীড়াঙ্গনের স্বচ্ছ দর্পণ। এই দর্পণে লক্ষ করা যায় কোন কোন দেশ কিভাবে এগিয়ে চলেছে, এগিয়ে এসেছে, আর কোন কোন দেশ ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে ক্রীড়াঙ্গনে। ২০০২ সালে সিউলে এশিয়ান প্রেস ইউনিয়নের কংগ্রেস (বর্তমানে এআইপিএস এশিয়া) চলাকালীন 'এশিয়ার ক্রীড়াঙ্গন' শীর্ষক একটি গ্রুপ স্টাডিতে অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে সেই ১৯৫১ সাল থেকে পর পর সাতটি এশিয়ান গেমসকে তুলে ধরতে দুই দিন ধরে মাথা ঘামানো হয়েছিল। সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন ডক্টর কিম। যিনি একসময় আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির প্রভাবশালী সহসভাপতি ছিলেন। গ্রুপ স্টাডির পর উপস্থাপনে সুপারিশ পেশ করা হয়েছিল। তখন লক্ষ করেছি আমাদের এই অঞ্চলে ভারতসহ অন্যান্য দেশ প্রথমদিকে এশিয়ান গেমসে ভালো করলেও ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়েছে। এর কারণগুলোও নির্ণয় করা হয়েছিল। এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ প্রথম অংশ নিয়েছে ১৯৭৮ সালের ব্যাংকক গেমসে। সেবার ফুটবলে সহিদুর রহমান সান্টুর নেতৃত্বে মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ০-১ গোলে এবং ভারতের বিপক্ষে ০-৩ গোলে পরাজিত হয়েছে। এরপর ১৯৮২ সালে নয়াদিল্লিতে ভারতের বিপক্ষে ০-২, চীনের বিপক্ষে ০-১ এবং মালয়েশিয়াকে ২-১ গোলে পরাজিত করে বাংলাদেশ। এটিই এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রথম জয়লাভ। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ কুয়েত, ইরান ও জাপানের কাছে যথাক্রমে ০-৪ গোলে পরাজিত হয়েছে। বাংলাদেশ জিতেছে নেপালের বিপক্ষে ১-০ গোলে। এটি দ্বিতীয় ও এ পর্যন্ত শেষ জয়লাভ। বাংলাদেশ এশিয়ান গেমসে ১৯টি খেলার মধ্যে ১৭টিতে পরাজিত হয়েছে। জিতেছে দুইটিতে। ১৭তম ইনচিওন এশিয়াডে বাংলাদেশ ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, হকিসহ আরো বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে অংশ নেবে। চীনের গুয়াং জু এশিয়াডে মাঠে উপস্থিত থেকে খেলা দেখার সুযোগ হয়েছে। সেখানে ফুটবলে বাংলাদেশ উজবেকিস্তানের কাছে ৩-০, হংকংয়ের কাছে ৪-১ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ৩-০ গোলে পরাজিত হয়েছে। স্কোর লাইন দেখে বোঝা যাবে না বাংলাদেশ কোন ধরনের ফুটবল খেলেছিল গত এশিয়াডে। এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের হয়ে ১৯৮৬ সালে সিউলে পদক (ব্রোঞ্জ) জিতেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাবিলদার মোশারফ হোসেন। বক্সিংয়ে তিনি ব্রোঞ্জ অধিকার করেছেন। এরপর এ পর্যন্ত ব্যক্তিগত ইভেন্টে আর কেউ পদক জিতেননি। চীনের বেইজিং এশিয়াডে (১৯৯০ সালে) দলীয় খেলা কাবাডিতে বাংলাদেশ রৌপ্য পদক লাভ করে। এরপর ২০১০ সালে গুয়াং জু এশিয়াডে পুরুষদের ক্রিকেটে স্বর্ণ এবং মেয়েদের ক্রিকেটে রৌপ্য পদক পেয়েছে বাংলাদেশ। আসন্ন এশিয়ান গেমসে ক্রিকেট ছাড়া পদক জয়ের চিন্তা কেউ করছেন বলে মনে হয় না।