মুসলিম বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে নাসিরুদ্দিন তুসি এক অনন্য নাম। তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহু শাখায় অসামান্য অবদান রাখেন। একজন গণিতবিদ হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব সবার ঊর্ধ্বে। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মারাগা গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র, যা বৈজ্ঞানিক চিন্তার বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীকালে এই বিদ্যালয়ের অর্জনগুলো সমরখন্দে একাধিক গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিদ্যালয়ের উত্থানের পথ সুগম করে।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী নাসিরুদ্দিন তুসি গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসাশাস্ত্র, নীতিশাস্ত্রসহ বহু বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত ‘আখলাকে নাসিরি’ সর্বাধিক ব্যাখ্যা-রচিত গ্রন্থগুলোর অন্যতম। নীতিশাস্ত্রবিষয়ক পরবর্তী গবেষণা ও রচনার গতিপথ নির্ধারণে গ্রন্থটির যুগান্তকারী অবদান আছে। নাসিরুদ্দিন তুসি এই বইয়ে তাঁর পূর্বসূরি চিন্তাবিদ ইবন মিসকাওয়াইহ, আল ফারাবি ও ইবনে সিনার বিকশিত নৈতিক, রাজনৈতিক ও নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সুসংবদ্ধ একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর মধ্যে পুনর্ব্যাখ্যা ও সমন্বয় করেছেন। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে রচিত অসংখ্য নীতিশাস্ত্রবিষয়ক গ্রন্থে তাঁর গভীর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
‘আখলাকে নাসিরি’র প্রথম অংশ তাহজিবুল আখলাকে ইবনে মিসকাওয়াইহের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব সুস্পষ্ট; দ্বিতীয় অংশ তাদবিরুল মানাজিলে ইবন সিনার চিন্তাধারার প্রতিফলন; আর তৃতীয় অংশ সিয়াসাতুল মুদুন বা রাষ্ট্র ও নগর-পরিচালনা অধ্যায়ে আল ফারাবির রাজনৈতিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত। যেহেতু মানুষ পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া জীবনধারণ করতে পারে না, তাই তাকে অবশ্যম্ভাবীভাবে একত্রে বসবাস করতে হয়। তুসির মতে, মদিনা বা নগর বলতে কেবল একটি ভৌগোলিক বসতি বোঝায় না; বরং সেখানে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে বিদ্যমান বিশেষ ধরনের সামাজিক সম্পর্ক ও সমষ্টিগত সংগঠনকেই বোঝায়।
এই বিশেষ সামাজিক ব্যবস্থার ন্যায়ভিত্তিক পরিচালনাকেই তুসি সিয়াসাহ বা রাজনীতি নামে অভিহিত করেছেন। তাঁর ভাষায়—এ কারণেই শাসনব্যবস্থার কর্তব্য হলো প্রত্যেক মানুষকে তার ন্যায্য ও প্রাপ্য অবস্থানে সন্তুষ্ট রাখা, প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করা, কাউকে যেন অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করতে বা অন্যের ওপর অবৈধ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না দেওয়া এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত কাজে নিয়োজিত করা। এ ধরনের পরিচালনাকেই রাজনীতি বলা হয়।
নাসিরুদ্দিন তুসি নগরের সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসকে চারটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। প্রতিটি শ্রেণিকে চারটি প্রাচীন মৌলিক উপাদান আগুন, পানি, বায়ু ও মাটির একটির সঙ্গে সম্পর্কিত করেছেন। তিনি ‘কলমের মানুষ’ অর্থাৎ আলেম, ফকিহ, বিচারক, আরিফ (জ্ঞানের অধিকারী), কবি ও প্রকৌশলীদের নিয়ে গঠিত শ্রেণিকে পানির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, যেমন পানি জীবনধারণের মৌলিক উপাদান, তেমনি ধর্মীয় ও পার্থিব উভয় ধরনের জীবনই এই শ্রেণির অবদানের মাধ্যমে টিকে থাকে ও বিকশিত হয়।
জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত শ্রেণিকে তিনি অগ্নির সঙ্গে সম্পর্কিত করেছেন। অন্যদিকে পেশাজীবী, কারিগর ও ব্যবসায়ী সংক্ষেপে অর্থনৈতিক লেনদেন এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে তিনি বায়ুর প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেছেন। আর কৃষিকাজ, খাদ্য উৎপাদন এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত শ্রেণিকে তিনি মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। তাঁর একটি নগরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম মৌলিক শর্ত হলো রাজনীতি যেন এই চারটি উপাদানের মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য বজায় রাখে।
নাসিরুদ্দিন তুসির মতে, মানুষ আত্মা ও দেহ উভয়ের সমন্বয়ে গঠিত। কিন্তু আত্মা যেহেতু ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না, তাই দেহের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও তার অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয় না। এ ছাড়া প্রতিটি সত্তাই নিজের স্বজাতীয় বস্তুর মাধ্যমে শক্তি অর্জন করে এবং তার বিপরীতের দ্বারা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই নীতির ভিত্তিতে তুসি বলেন, আত্মা যতই জড় ও দৈহিক বিষয় থেকে দূরে সরে আসে, ততই সে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সুতরাং আত্মার পরিপূর্ণতার অভিযাত্রা মূলত বস্তুজগৎ ও দেহকেন্দ্রিক আসক্তি থেকে ক্রমেই মুক্ত হওয়ার একটি যাত্রা। এই অভিযাত্রায় মানুষকে তার তিনটি স্বতন্ত্র শক্তিকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তা হলো—ক. বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি, যা চিন্তা ও ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত।
খ. কামনা বা আকাঙ্ক্ষাশক্তি, যা ইচ্ছা, আকর্ষণ ও ভোগপ্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
গ. ক্রোধশক্তি, যা রাগ, প্রতিরোধ ও বিকর্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তুসির মতে, প্রত্যেক সত্তার পরিপূর্ণতা নিহিত রয়েছে তার প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মক্ষমতার পূর্ণ বাস্তবায়নে। সুতরাং মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাশিত বিষয় হলো সে যেন স্বেচ্ছায় এমন প্রচেষ্টা চালায়, যার মাধ্যমে তার আত্মা এই পরিপূর্ণতার অবস্থায় পৌঁছতে পারে। এই প্রচেষ্টা একই সঙ্গে সুখ ও নৈতিক উৎকর্ষ অর্জনের সাধনা।
উল্লেখ, নাসিরুদ্দিন তুসি বিজ্ঞানী ও দার্শনিক হিসেবে সর্বমহলে বারিত হলেও ধর্মবিশ্বাসে তিনি শিয়া মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। ফলে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের অনুসারী আলেমরা তাঁর নিন্দা করে থাকেন।
ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে