মনুষ্য সমাজের একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো সৎ মানুষ অনেক সময় বঞ্চিত হয়, আর অসৎ মানুষ সুবিধা পেয়ে যায়। কর্মক্ষেত্র, ব্যবসা, রাজনীতি, এমনকি পারিবারিক ক্ষেত্রেও দেখা যায়—সত্য কথা বলা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা বা দুর্নীতির বিরোধিতা করার কারণে কেউ কেউ কোণঠাসা হয়ে পড়ে। কখনো আবার (চাকরির ক্ষেত্রে) চাকরিচ্যুতি কিংবা শাস্তিমূলক বদলির শিকার হয়। প্রশ্ন হলো, কেন এমন হয়? এ ব্যাপারে কোরআন-হাদিসেই বা কী আছে?
এর উত্তরে প্রথমত বলতে হবে, দুনিয়া মুমিনের জন্য পরীক্ষাগার। কখনো কখনো আল্লাহ তাআলা মানুষকে পরীক্ষা করেন যে সত্ভাবে চলতে গিয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়েও কারা কারা সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল থাকতে পারে? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘মানুষ কি মনে করে যে ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না?’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ২)
কোনো ঈমানদার ও ভদ্র মানুষের ওপর বিপদ এলে আমরা অনেক সময় ভাবি, লোকটা এত সৎ মানুষ, তার ওপর বিপদ আসে কেন? তার বিরোধী কপট শ্রেণির মানুষরাতো অপবাদ দিয়ে বসে যে তার গোপন বদ আমলের কারণে তার ওপর বিপদ আসছে। অথচ বিষয়টা সব ক্ষেত্রে এমন নাও হতে পারে। আল্লাহর ঈমানদার বান্দাদেরও আল্লাহ পরীক্ষা করেন। এমনকি আল্লাহর বিশেষ বান্দা নবী-রাসুলরাও পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। মুসআব ইবনে সাআদ (রহ.) তাঁর বাবার সূত্রে বর্ণনা করেন, তাঁর বাবা সাআদ (রা.) বলেন, একদিন আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে প্রশ্ন করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! মানুষের মধ্যে কার বিপদের পরীক্ষা সবচেয়ে কঠিন হয়?’ তিনি বলেন, ‘নবীদের বিপদের পরীক্ষা, তারপর যারা নেককার তাদের, এরপর যারা নেককার তাদের বিপদের পরীক্ষা।’ মানুষকে তার ধর্মানুরাগের অনুপাত অনুসারে পরীক্ষা করা হয়। তুলনামূলকভাবে যে লোক বেশি ধার্মিক তার পরীক্ষাও সে অনুপাতে কঠিন হয়ে থাকে। আর যদি কেউ তার দ্বিনের ক্ষেত্রে শিথিল হয়ে থাকে তাহলে তাকে সে মোতাবেক পরীক্ষা করা হয়। অতএব, বান্দার ওপর বিপদ-আপদ লেগেই থাকে, অবশেষে তা তাকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেয় যে সে জমিনে চলাফেরা করে অথচ তার কোনো গুনাহই থাকে না। (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৯৮)
সুতরাং সততার কারণে কষ্ট পাওয়া সব সময় ব্যর্থতার লক্ষণ নয়; বরং এটি ঈমান ও চরিত্রের পরীক্ষার অংশও হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অসৎ লোকেরা অনেক সময় ক্ষমতাবানদের স্বার্থ রক্ষা করে। যে ব্যক্তি অন্যায়কে সমর্থন করে, তোষামোদ করে বা সত্য গোপন করে, তাকে কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থে পছন্দ করাটা স্বাভাবিক। কারণ সে তাদের ভুলের প্রতিবাদ করবে না। পক্ষান্তরে সৎ ব্যক্তি অকপটে সত্য কথা বলে দেয়, নির্দ্বিধায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়; ফলে সে অনেকের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। কিন্তু কর্তাব্যক্তি কিংবা সহকর্মীরা সৎ লোকদের বশে রাখতে চায়, বেআইনি কাজে সহযোগী বানাতে চায়, তা না পারলেই তাদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা করে। মহান আল্লাহ তাঁর হাবিবকে এ ধরনের লোকের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন, তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘তারা কামনা করে, যদি তুমি আপসকামী হও, তবে তারাও আপসকারী হবে।’ (সুরা : কলম, আয়াত : ৯)
অর্থাৎ অন্যায়কারীরা বরাবরই চায় যে সত্যবাদী মানুষ তার নীতিতে ছাড় দিক। যখন সে তা করে না, তখন তাকে চাপের মুখে ফেলা হয়। মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়। বিভিন্ন দিক থেকে তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়।
তবে বাস্তবতা হলো কখনো কখনো বাহ্যিকভাবে সৎ মানুষদের ক্ষতিগ্রস্ত আর অসৎ মানুষদের জয়যুক্ত মনে হলেও তারা আল্লাহর দরবারে হেরে যায়। তাদের পরকাল ধ্বংস হয়ে যায়। এর বিপরীতে যারা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সততার ওপর অটল থাকে, মহান আল্লাহ তাদের কোনো না কোনোভাবে এর প্রতিদান দিয়ে দেন। যেমন—ইউসুফ (আ.)-কে কূপ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে একসময় রাজত্বের আসনে বসিয়ে দেন। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর এমনিভাবে আমি ইউসুফকে জমিনে কর্তৃত্ব প্রদান করেছি, সে তার যেখানে ইচ্ছা অবস্থান করতে পারত। আমি যাকে ইচ্ছা স্বীয় রহমত দান করি, আর আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করি না।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫৬)
এই আয়াত আমাদের শেখায়, দুনিয়ার লাভ-লোকসানই শেষ বিচার নয়; আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচারের দিন রয়েছে। সৎ মানুষের দায়িত্ব হলো হতাশ না হয়ে সত্য, ন্যায় ও আমানতের পথে অটল থাকা। ইনশাআল্লাহ মহান আল্লাহ এর প্রতিদান দুনিয়া ও আখিরাতে দেবেন।