পিতা সন্তানের ভরণ-পোষণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। সে কখনো এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে না। কেননা ভরণ-পোষণে অবহেলা করলে সন্তানের স্বাস্থ্যহানি, অসুস্থতা, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। পিতার আরেকটি দায়িত্ব হলো সন্তানের আত্মার খোরাক জোগানো। এ ক্ষেত্রেও তার অবহেলা করা উচিত নয়। কেননা এই ক্ষেত্রে অবহেলা করলে শারীরিক ক্ষতির চেয়ে আরো মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। সেই ক্ষতি মৃত্যুর চেয়ে কম ভয়াবহ নয়। মানুষের অন্তর ও আত্মার মৃত্যু হলে মানুষ চিরস্থায়ী ধ্বংসের মুখোমুখি হয়। তাই সন্তানকে ঈমান, ইসলাম ও নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সবাই দায়িত্বশীল, প্রত্যেকেই তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।’
বুখারি, হাদিস : ২৫৫৪)
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ এ ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেদের এবং নিজ পরিবারকে রক্ষা কোরো।’ (সুরা : তাহরিম, আয়াত : ৬)
আর এই দায়িত্ব পালনার্থে পিতা সন্তানদের নামাজের প্রশিক্ষণ দেবেন। তিনি তাদের নামাজ শেখাবেন সাত বছর বয়স তথা শিক্ষার বয়স হওয়ার পর থেকে। সন্তানের বয়স ১০ হলে পিতা নামাজের ব্যাপারে তাদের প্রতি কঠোর হবেন। হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও এবং ১০ বছর বয়সে তাদের নামাজে অবহেলার জন্য প্রহার করো।’
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫)
হাদিসে প্রহার দ্বারা শাস্তিদান ও লাঞ্ছিত করা উদ্দেশ্য নয়, বরং উদ্দেশ্য হলো কঠোর মনোভাব প্রদর্শনের মাধ্যমে ইবাদতের গুরুত্ব বোঝান এবং রাগ দেখিয়ে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে ফেরানো; যেভাবে পিতার অন্যান্য নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করলে তার প্রতি রাগ দেখানো হয়।
সন্তানের নৈতিক গঠনে মা বাবার সহযোগী। কেননা মা ঘরের ব্যাপারে দায়িত্বশীল এবং কিয়ামতের দিন সে তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। নবীজি (সা.) হাদিসে নারীদের কথা পৃথকভাবে উল্লেখ করে তাদের দায়িত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া সন্তান পিতার তুলনায় মায়ের সঙ্গেই অধিক সময় অতিবাহিত করে। সন্তানের ওপর মায়ের প্রভাব পিতার তুলনায় বেশি হয়ে থাকে। কন্যাসন্তানের ব্যাপারে মা বিশেষভাবে দায়িত্বশীল। কেননা মেয়েরা তার মাকে অনুসরণ করতেই বেশি পছন্দ করে।
শিশুর নৈতিক গঠনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও দায় আছে। তারা ছেলেমেয়ের নৈতিক গঠনে যত্নশীল হবে। তাদের জন্য এতটুকু যথেষ্ট নয় যে তারা শুধু শিশুকে ব্যাবহারিক ও প্রযুক্তিগত বিদ্যা শেখাবে, তাদের পরিবেশ, প্রকৃতি, জীব ও জীবন সম্পর্কে অবগত করবে। বিপরীতে তাদের মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও অস্তিত্ব সম্পর্কে মূর্খ রেখে দেবে। ফলে তারা জানবে না তারা কোথা থেকে এসেছে? কে তাদের স্রষ্টা? পার্থিব জীবন শেষে তাদের গন্তব্য কোথায়? আসা ও যাওয়া এবং জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী সময়ে তাদের কোনো করণীয় আছে কি না? সেই করণীয়টা কী? কে এই করণীয় নির্ধারণ করেছেন? তা আদায় বা প্রত্যাখ্যানের পরিণতি কী?
শিশুকে এসব প্রশ্নের উত্তর শিক্ষা দেওয়া ঈমানের দাবি। এতে মন ও মস্তিষ্ক প্রশান্ত ও পরিতৃপ্ত হয়, হৃদয় প্রশস্ত হয়। ইসলামী বিশ্বাস ও মূল্যবোধই এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারে। কেননা ইসলাম মানবীয় ভুলত্রুটি, কল্পনা, বাড়াবাড়ি, মোহ ও স্ববিরোধিতামুক্ত। যে বিদ্যালয় শিশুর মনে ঈমানের বীজ বপনে ব্যর্থ হয়, তা শুধু বিভ্রান্ত ও স্ববিরোধী প্রজন্ম তৈরি করে। যারা জীবনের জাহাজে কোনো নাবিক, পথপ্রদর্শক, মানচিত্র, কম্পাস ও বাতিঘর ছাড়াই এর উত্তাল জলে পথ খুঁজে বেড়ায়, সে কোনো তীর খুঁজে পায় না এবং তা খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাও রাখে না।
শিক্ষা নববী মিশনেরই অংশ। আল্লাহ আরব জাতির প্রতি নিজের অনুগ্রহ বর্ণনা করে বলছেন, তিনি তাদের থেকে একজন রাসুল প্রেরণ করেছেন। যার দায়িত্ব হলো ‘তিনি তাদের কাছে তার আয়াত পাঠ করে, তাদেরকে পবিত্র করে, তাদেরকে কিতাব ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেয়।’
(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৬৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের সম্পর্কে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাকে শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করেছেন, যিনি বিষয়গুলোকে সহজ করে দেয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪৭৮)
মহানবী (সা.) উত্তম শিক্ষা দানকারী শিক্ষকের ব্যাপারে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, আসমানবাসী, জমিনবাসী, গর্তের পিপীলিকা, এমনকি সমুদ্রের মাছ পর্যন্ত মানুষকে উত্তম বিষয় শিক্ষাদানকারীর জন্য কল্যাণ কামনা করেন।’ (কানজুল উম্মাল, হাদিস : ২৮৭৪০)
আর মানুষকে যে শিক্ষা দেওয়া হয়, তার ভেতর সর্বোত্তম শিক্ষা হলো—তার রবের পরিচয় শেখানো, তাকে তার উৎস, গন্তব্য ও অস্তিত্বের রহস্য শেখানো। সর্বোপরি তাকে জীবনের হাকিকত শেখানো। কেননা যে নিজেকে চিনতে পারে, সে তার প্রভুকেও চিনতে পারে।
লেখকের ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট থেকে
মো. আবদুল মজিদ মোল্লার ভাষান্তর