• ই-পেপার

নাইট্রিক এসিড আবিষ্কারে মুসলমানদের অবদান

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব ১১৪৮

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

‘তারা বলে, একমাত্র পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন, আমরা মরি ও বাঁচি আর কালই আমাদেরকে ধ্বংস করে। বস্তুত এ ব্যাপারে তাদের কোনো জ্ঞান নেই, তারা তো কেবল মনগড়া কথা বলে।...বলো, আল্লাহই তোমাদেরকে জীবন দান করেন এবং তোমাদের মৃত্যু ঘটান। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে কিয়ামত দিবসে একত্র করবেন, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ তা জানে না।’
(সুরা : জাসিয়া, আয়াত : ২৪-২৬)

আয়াতগুলোতে বস্তুবাদে বিশ্বাসীদের নিন্দা করা হয়েছে।

 

শিক্ষা ও বিধান

১. বস্তুবাদী লোকেরাই পরকাল অস্বীকার করে। তারা দৃশ্যমান জগৎ দ্বারা সবকিছু বিচার করে। অথচ তারাও স্বীকার করে, দৃষ্টির অগোচরে অনেক কিছু আছে।

২. ‘কালই আমাদের ধ্বংস করেছে’ বাক্য দ্বারা তাদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যারা বলে—সময়ের আবর্তনে সবকিছু ধ্বংস হয় এবং আপন রূপে ফিরে আসে।

৩. হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, ‘বনি আদম আমাকে কষ্ট দেয়। তারা কালকে গালি দেয়। অথচ আমিই কাল সৃষ্টিকারী। সর্বময় ক্ষমতা আমার হাতে। আমিই দিন-রাতের পরিবর্তন করি।’

৪. রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সময়কে গালি দিয়ো না। কেননা আল্লাহই সময়ের স্রষ্টা।’

৫. কিয়ামত অস্বীকারের একটি রূপ হলো তাকে সুদূর মনে করা। কেননা কোরআনে কিয়ামতকে নিকটবর্তী বলা হয়েছে। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ১০/১৮৬)

 

 

দোয়ায়ে আবুদ দারদা

ঘরবাড়ির নিরাপত্তায় দোয়া

ঘরবাড়ির নিরাপত্তায় দোয়া

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি, লা ইলাহা ইল্লা আনতা আলাইকা তাওয়াক্কালতু ওয়া আনতা রাব্বুল আরশিল আজিম, মাশা-আল্লাহু কানা, ওয়ামা লাম ইয়াশা‘ লাম ইয়াকুন, লা হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম, আ‘লামু আন্নাল্লাহা আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদির, ওয়া আন্নাল্লাহা ক্বাদ আহাত্বা বিকুল্লি শাইয়িন ই‘লমা, আল্লাহুম্মা ইন্নি আ‘উজুবিকা মিন শাররি নাফসি, ওয়া মিন শাররি কুল্লি দাব্বাতিন আনতা আখিজুম বিনাসিয়্যাতিহা, ইন্না রাব্বি আ‘লা সিরাতিম মুস্তাকিম।

 

অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি আমার প্রভু, আপনি ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নাই, আপনার ওপর ভরসা করলাম, আপনি সম্মানিত আরশের মালিক। আল্লাহ্ তাআলা যা ইচ্ছা করেন, তা-ই হয়, আর তিনি যা ইচ্ছা করেন না তা হয় না; আল্লাহ তাআলার শক্তি ও সামর্থ্য ব্যতীত অন্য কোনো শক্তি বা সামর্থ্য নাই। জেনে রেখো যে আল্লাহ তাআলা সমস্ত জিনিসের ওপর শক্তিশালী, ক্ষমতাবান এবং তাঁর জ্ঞান সমস্ত জিনিস ব্যাপ্ত। হে আল্লাহ! আমার নফসের মন্দ হতে আপনার নিকট আশ্রয় চাই এবং প্রত্যেক প্রাণীর মন্দ হতে যার ঝুঁটি আপনি ধরে রেখেছেন; নিশ্চয়ই আমার প্রভু সরল পথে অধিষ্ঠিত আছেন।

 

সূত্র : আবু দারদা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা এই বাক্যগুলো পাঠ করবে, তার কোনো বিপদ-আপদ হবে না।
(তাবরানি শরিফ)

মসজিদে নববীতে প্রতিদিন ২৩৫ টন জমজমের পানি বিতরণ

আবু তাশফিন
মসজিদে নববীতে প্রতিদিন ২৩৫ টন জমজমের পানি বিতরণ

পবিত্র মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববীর অন্যতম আকর্ষণ জমজম কূপের পানি। প্রতিটি মুসল্লি এ দুই মসজিদে অবস্থানকালে বরকতময় এই পানি বিনামূল্যে পান করতে পারেন। পবিত্র জমজম কূপ মক্কায় অবস্থিত হওয়ায় মক্কার মসজিদে হারামে ব্যাপকভাবে এর বিতরণ কঠিন কিছু নয়। কিন্তু শত শত মাইল দূরে অবস্থিত মসজিদে নববীতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জন্য পানির ব্যবস্থা করা সত্যিই দুঃসাধ্য। প্রশ্ন জাগতে পারে, মসজিদে নববীতে মুসল্লিদের জন্য প্রতিদিন কী পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়? এর উত্তর সম্প্রতি তাদের কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যে উঠে এসেছে।

দুই পবিত্র মসজিদের সেবাবিষয়ক সাধারণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সারা বছর ইবাদতকারী ও দর্শনার্থীদের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে মসজিদে নববীতে প্রতিদিন প্রায় ২৩৫ টন জমজমের পানি বিতরণ করা হয়। তাদের মতে, এটি দুই পবিত্র মসজিদে আগত মুসল্লিদের জন্য উন্নত সেবা নিশ্চিত করার চলমান প্রচেষ্টার অংশ।

এই উদ্দেশ্যে মসজিদে নববী ও এর চত্বরজুড়ে ১০ হাজারেরও বেশি জমজমের পানির কুলার (ডিসপেনসার) স্থাপন করা হয়েছে। এসব কুলারে নিয়মিতভাবে পানি সরবরাহ ও পুনরায় ভরার ব্যবস্থা করা হয় এবং সার্বক্ষণিক তদারক করা হয়। পাশাপাশি জমজমের পানির গুণগত মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বাধুনিক বিশেষায়িত পানি পরীক্ষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালিত হয়, যাতে মুসল্লিরা নিরাপদ ও সহজ উপায়ে এই বরকতময় পানি গ্রহণ করতে পারেন।

কর্তৃপক্ষ জানায়, এসব সেবা মসজিদে নববীর দর্শনার্থীদের যত্ন ও কল্যাণে গড়ে তোলা সমন্বিত সেবাব্যবস্থার অংশ, যার লক্ষ্য সর্বোচ্চ মানের গুণগত সেবা ও কার্যকর পরিচালনার মাধ্যমে আগতদের সর্বোত্তম সুবিধা প্রদান করা।

সূত্র : রিয়াদ ডেইলি

 

 

মুসলিম বিশ্বে কাগজ বিপ্লবের ইতিহাস

সাইয়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
মুসলিম বিশ্বে কাগজ বিপ্লবের ইতিহাস

ইসলামের সূচনা হয়েছিল একটি শব্দ দিয়ে— ‘ইকরা’। পড়ো। ইতিহাসের বিচারে এটি শুধু একটি ধর্মীয় আহবান ছিল না; ছিল জ্ঞানকে মানবজীবনের কেন্দ্রে স্থাপন করার ঘোষণা। কোরআন কলমের শপথ করেছে, লেখার কথা বলেছে, জ্ঞান অর্জনকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। ফলে মুসলিম সমাজের ভেতরে শুরু থেকেই লিখিত জ্ঞান সংরক্ষণের একটি প্রবল সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। হাদিস সংকলন, কোরআনের কপি প্রস্তুত, ফিকহ ও তাফসির রচনা—সবকিছুই নির্ভর করছিল লেখার ওপর। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন তখনো রয়ে গিয়েছিল—জ্ঞান লেখা হবে কোথায়? অষ্টম শতাব্দীতে সেই প্রশ্নের উত্তর হয়ে আসে কাগজ।

আজকের মানুষের কাছে কাগজ খুব সাধারণ একটি বস্তু। কিন্তু এক হাজার বছর আগে এটি ছিল সভ্যতা নির্মাণের প্রযুক্তি। কাগজ মুসলিম বিশ্বের হাতে পৌঁছার আগে বই ছিল ব্যয়বহুল সম্পদ। পশুর চামড়া কিংবা প্যাপিরাসের ওপর লেখা পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করতে বিপুল সময় ও অর্থ ব্যয় হতো। ফলে জ্ঞান প্রায়ই সীমাবদ্ধ থাকত অভিজাতদের গ্রন্থাগার বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতর। কাগজ সেই দেয়াল ভেঙে দেয়।

সমরখন্দ থেকে বাগদাদ, বাগদাদ থেকে কায়রো, দামেস্ক ও কুরতুবা—মুসলিম বিশ্বের নগরীগুলো দ্রুত কাগজ উৎপাদন ও বই বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়। আব্বাসীয় যুগে বাগদাদের যে চিত্র ইতিহাসে পাওয়া যায়, তা বিস্ময়কর। এখানে শুধু পণ্ডিতরাই ছিলেন না; ছিলেন পেশাদার অনুলিপিকার, বই বিক্রেতা, বাঁধাইকারী ও পাঠক। বই একটি সাংস্কৃতিক পণ্যে পরিণত হয়েছিল। এমনকি কিছু বাজারে বইয়ের দোকানগুলো বিদ্বজ্জনদের আড্ডা ও বিতর্কের কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত ছিল।

এই পরিবেশে জন্ম নেয় মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অনুবাদ আন্দোলন। গ্রিসের দর্শন, ভারতের গণিত, ফরাসির রাষ্ট্রচিন্তা এবং বিভিন্ন ভাষার চিকিৎসাবিজ্ঞান আরবিতে অনূদিত হতে থাকে। কিন্তু এই আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি ছিল অনুবাদক নয়, কাগজ। কারণ কোনো ধারণা তখনই সভ্যতাকে বদলায়, যখন তা হাজার মানুষের হাতে পৌঁছে।

বাইতুল হিকমাহকে আমরা প্রায়ই একটি গ্রন্থাগার বা গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে স্মরণ করি। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল একটি বৃহত্তর বৌদ্ধিক অবকাঠামোর অংশ। সেই অবকাঠামোর ভিত্তি ছিল কাগজ। কাগজ জ্ঞানকে বন্দি কক্ষ থেকে বের করে নগরের রাস্তায় নিয়ে এসেছিল। একটি পাণ্ডুলিপি আর একক কপি হয়ে থাকত না; তার অনুলিপি তৈরি হতো, ছড়িয়ে পড়ত, বিতর্ক সৃষ্টি করত, নতুন চিন্তার জন্ম দিত।

এ কারণেই মুসলিম বিশ্বের স্বর্ণযুগকে শুধু মনীষীদের যুগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আল-খাওয়ারিজমি, ইবনে সিনা, আলবিরুনি কিংবা ইবনুল হাইসামের পেছনে ছিল এমন একটি সমাজ, যেখানে জ্ঞান উৎপাদনের পাশাপাশি জ্ঞান প্রচারেরও ব্যবস্থা ছিল। কাগজ সেই ব্যবস্থার প্রাণরস হিসেবে কাজ করেছিল।

আন্দালুসের কুরতুবা এই ইতিহাসের আরেকটি উজ্জ্বল অধ্যায়। ইউরোপ যখন দীর্ঘ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল, তখন কুরতুবার গ্রন্থাগারগুলো হাজার হাজার পাণ্ডুলিপিতে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। জ্ঞানান্বেষীরা দূরদূরান্ত থেকে সেখানে আসতেন। বই তখন শুধু শিক্ষার উপকরণ নয়; ছিল সামাজিক মর্যাদা, সাংস্কৃতিক শক্তি এবং সভ্যতার পরিচয়ের অংশ।

আজ আমরা ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে আছি। তথ্যের প্রাচুর্য আমাদের চারপাশে। কিন্তু ইতিহাসের কাগজ বিপ্লব একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়—প্রযুক্তি কখনো একা সভ্যতা গড়ে না। সভ্যতা গড়ে মানুষের জ্ঞানপিপাসা, প্রশ্ন করার সাহস এবং শেখার সংস্কৃতি। মুসলিম বিশ্বের কাগজ বিপ্লবের প্রকৃত তাৎপর্য এখানেই যে তারা একটি প্রযুক্তিকে জ্ঞানচর্চার বাহনে পরিণত করেছিল।

টাইগ্রিসের তীরে সেই কাগজকলগুলোর চাকা বহু আগেই থেমে গেছে। কিন্তু তাদের উত্তরাধিকার এখনো জীবিত। প্রতিটি গ্রন্থাগারে, প্রতিটি বইয়ের পাতায়, এমনকি ডিজিটাল পর্দায় ভেসে ওঠা প্রতিটি লেখার মধ্যেও যেন লুকিয়ে আছে সেই পুরনো বিপ্লবের প্রতিধ্বনি। ইতিহাসের অনেক সাম্রাজ্য বিলীন হয়েছে, কিন্তু জ্ঞানের জন্য নির্মিত সেই অবকাঠামোর স্মৃতি আজও মানবসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন হয়ে আছে।

পাঠঋণ

জোনাথন এম. ব্লুম, Paper Before Print: The History and Impact of Paper in the Islamic World

দিমিত্রি গুতাস, Greek Thought, Arabic Culture

ফ্রাঞ্জ রোজেনথাল, Knowledge Triumphant: The Concept of Knowledge in Medieval Islam

মার্শাল জি. সে. হজসন, The Venture of Islam

ইয়োহানেস পেডারসেন, The Arabic Book

সৈয়দ আলী আশরাফ, মুসলিম শিক্ষাচিন্তার ইতিহাস।

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুল মানার

মহাখালী, ঢাকা

নাইট্রিক এসিড আবিষ্কারে মুসলমানদের অবদান | কালের কণ্ঠ