kalerkantho

রবিবার । ২ অক্টোবর ২০২২ । ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

পশ্চিম সাহারা

এক ভাগ্যাহত মুসলিম জনপদ

মুফতি সাইফুল ইসলাম   

১৮ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এক ভাগ্যাহত মুসলিম জনপদ

ইদ্দারাহাম মসজিদ, পশ্চিম সাহারা অঞ্চল

পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক ও কঠিন জনপদের একটি সাহারা মরুভূমির পশ্চিমে অবস্থিত পশ্চিম সাহারা। এ দেশের মানুষ যুগের পর যুগ ধরে সংগ্রাম করে যাচ্ছে তাদের অধিকার আদায়ের জন্য। তারা আজও পায়নি স্বাধীনতার স্বাদ। আফ্রিকা মহাদেশের উত্তরপ্রান্তে আটলান্টিক মহাসাগরের তীর ঘেঁষে অবস্থিত স্বাধীনতাকামী অঞ্চল পশ্চিম সাহারা।

বিজ্ঞাপন

সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনসংখ্যার এই অঞ্চলের আয়তন প্রায় দুই লাখ ৬৬ হাজার বর্গকিলোমিটার। আনুমানিক ছয় লাখ এখানে বসবাস করে। জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ বৃহত্তম শহর লাইয়োনে বসবাস করে থাকে। এ জনপদের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা মরক্কোর নিয়ন্ত্রণাধীন। যেটিকে মরক্কো তাদের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ হিসেবে দাবি করে থাকে।   বাকি ২০ শতাংশ এলাকা পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকামী সংগঠন পোলিসারিও ফ্রন্ট নিয়ন্ত্রিত। পোলিসারিও ফ্রন্ট পুরো অঞ্চলটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে সেখানে সাহরাওয়ি আরব ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক নামে এক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। অষ্টম শতাব্দীতে ইসলামের আগমনের পর থেকে বিশ্ববাসীর কাছে পশ্চিম সাহারার গুরুত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

পশ্চিম সাহারার ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন ছিল। নানা চড়াই-উতরাই মারিয়ে ১৮৮৪ সালে জার্মানির বার্লিনে আফ্রিকা মহাদেশে গড়ে ওঠা সমস্ত উপনিবেশিক শক্তিগুলোর একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সে সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্পেন সরকার পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এরপর ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর থেকে বিভিন্ন ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো উপনিবেশগুলো থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করে। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ পশ্চিম সাহারা অঞ্চলের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটাতে স্পেন সরকারের কাছে আহ্বান জানায়। আর পোলিসারিও ফ্রন্টও ১৯৭৩ সালের দিক থেকে স্পেনের উপনিবেশিক শাসনের অবসানের জন্য সংগ্রাম শুরু করে।

অন্যদিকে এই অঞ্চলের ফসফেট খনি, সমুদ্রবন্দর এবং ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধা থাকার কারণে পশ্চিম সাহারায় স্পেনের উপনিবেশিক থাকাকালীন আলজেরিয়া, মরক্কো ও মৌরিতানিয়া এই তিনটি দেশ এই অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে বসে। আর সেটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরস্পরের মধ্যে তীব্র বিরোধে জড়িয়ে যায়। ১৯৭৫ সালের শেষের দিকে স্পেন পশ্চিম সাহারা অঞ্চল থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। সে বছরের ৬ নভেম্বর মরক্কোর তৎকালীন বাদশাহ দ্বিতীয় হাসান গ্রিন মার্চ নামে এক অভিযানের মাধ্যমে পশ্চিম সাহারা নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। এতে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে ১৯৭৫ সালের ১৪ নভেম্বর স্পেনের মাদ্রিদে মৌরিতানিয়া, মরক্কো আর স্পেনের মধ্যে একটি ত্রিদেশীয় চুক্তি সম্পাদিত হয়। যার আলোকে পশ্চিম সাহারাকে মরক্কো ও মৌরিতানিয়ার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।

এই চুক্তি পশ্চিম সাহারা স্বাধীনতাকামী সংগঠন পোলিসারিও ফ্রন্ট পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে এবং তারা আলজেরিয়ার সহায়তা নিয়ে ১৯৭৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা দিয়ে আলজেরিয়ায় একটি প্রবাসী সরকার গঠন করে। এরপর পোলিসারিও ফ্রন্ট গেরিলাদের প্রতিরোধ আক্রমণের  মুখে টিকতে না পেরে মৌরিতানিয়া পশ্চিম সাহারায় নিজেদের দাবি প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। মরক্কো পোলিসারিও ফ্রন্ট গেরিলাদের প্রতিরোধের মুখোমুখি হলেও এখনো যেকোনো মূল্যে পশ্চিম সাহারা অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে বদ্ধপরিকর। বিশাল ভৌগোলিক এলাকা বেষ্টিত এই মুসলিম জনপদে প্রতি কিলোমিটারে মাত্র ২.০৩ জন মানুষ বসবাস করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত আর কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হওয়ার পরও দেশটিতে মাথা পিছু আয় আড়াই হাজার মার্কিন ডলার।

নিষ্ঠার ইসলামী কৃষ্টি-কালচার মেনে চলা এ জনপদের মানুষগুলো আদৌ কখনো স্বাধীনতার স্বাদ পাবে কি না সেটাই এখন চিন্তার বিষয়। কেননা আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এই মজলুম জনপদে মরক্কোর দখলদারির স্বীকৃতি দিয়েছিল। যদি সেটি বর্তমান মার্কিন প্রশাসনও অনুসরণ করে তাহলে পানি আরো বহু দূর গড়াবে—এটাই বোঝা যায়।

লেখক : প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও মুহাদ্দিস

 



সাতদিনের সেরা