ইসলাম আগমনের বহু আগে থেকে ভারতবর্ষের সঙ্গে আরব অঞ্চলের বহু মাত্রিক যোগাযোগ ছিল। ঐতিহাসিকদের বিবরণে প্রাচীনকালে ভারতবর্ষ ও আরব অঞ্চলের বাণিজ্যিক সম্পর্কের বর্ণনাই প্রধানত উঠে আসে। কিন্তু আরবের সঙ্গে ভারতবর্ষের রক্তের সম্পর্কও সুপ্রাচীন। মহানবী (সা.)-এর আগমনের বহু বছর আগ থেকে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়, বিশেষ করে বাহরাইন, বসরা, মক্কা ও মদিনায়। ভারতবর্ষের জাট, মেদ, সিয়াবচা, আহামিরা, বায়াসারাহ ও ঠাকুরি গোত্রের লোকেরা এসব শহরে বসবাস করত। ১০ হিজরিতে নাজরানের বনু হারিসা বিন কাআবের একদল মুসলমান নবীজি (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হলে তিনি তাদের দেখে বলেন, এরা কারা? দেখে তো হিন্দুস্তানি মনে হয়।
(তারিখে তাবারি : ৩/১৫৬)
এটা সুপ্রসিদ্ধ যে ভারতবর্ষে রাজনৈতিকভাবে ইসলামের আগমন ঘটেছিল সিন্ধু অঞ্চলে। সেটা ৯৩ হিজরির কথা। এর বহু বছর আগে উমর (রা.)-এর শাসন আমলে (১৫ হিজরি) মালাবার ও সরনদ্বীপে (শ্রীলঙ্কা) ইসলামের সুবাস ছড়াতে শুরু করে। সেই ধারাবাহিকতায় উমাইয়া আমল পর্যন্ত আরবের বহু বুজুর্গ ও দরবেশ দক্ষিণ ভারতে তাওহিদের বাণী প্রচার করতে আগমন করেন। ভারতবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করতে থাকে। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বরং ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে অনেক শাসক ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিও ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাদের ভেতর মালাবারের রাজা অন্যতম। (আয়নায়ে হাকিকত নামা, পৃষ্ঠা : ৭১-৭২)
মুসলমানের আগমন, তাদের অবস্থান, মুসলিম বিজয় ভারতবর্ষের জন্য ছিল স্রষ্টার আশীর্বাদ। তারা ভারতবাসীর জন্য ঈমান, ইসলাম ও সভ্যতার আলো নিয়ে এসেছিল। ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় মুসলিম আগমনের প্রভাব ছিল অভাবনীয়। আল্লামা শিবলি নোমানি (রহ.) এ বিষয়ে লেখেন, ‘ভিনদেশি কর্তৃক কোনো দেশ বা অঞ্চল জয় করা অন্যায় নয়। সেটি হলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিজেতা সবচেয়ে বড় অন্যায়কারী হতেন। দেখার বিষয় হলো, বিজয়ী জাতি দেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে কী অবদান রেখেছেন। যুদ্ধের জয় বিবেচনা করলে চেঙ্গিস খান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিজেতা। কিন্তু তাঁর উপাখ্যানের প্রতিটি হরফ রক্তে রঞ্জিত। বিপরীতে যখন কোনো সভ্য জাতি কোনো দেশ বা অঞ্চল জয় করে তখন সেখানের সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতি মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে যায়। যোগাযোগ মাধ্যমে, জীবন-জীবিকা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, ঘরবাড়ি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ব্যবসার উপকরণ, শিল্প ও পেশা—সবকিছুতে নতুনত্ব চোখে পড়ে। বিজিত জাতি যদিও বিজয়ীদের কৃতিত্ব অস্বীকার করে, তবু ঘরবাড়ি ও দেয়ালগুলো শত শত বছর ধরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে থাকে। (ইসলামী হুকুমত আওয়ার হিন্দুস্তান মে উসকা তামাদ্দুনি আসর, পৃষ্ঠা : ১-২)
ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত মুসলিম শাসনের ধারাবাহিকতা ছিল এবং তা ছিল আঞ্চলিক। ফলে এই সময়ে ইসলাম ভারতীয় সমাজে গভীর প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। এখানে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির বড় অভাব ছিল। ভারতে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন সম্রাট জহির উদ্দিন বাবর। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে ভারত জয় করেন। ভারতে এসে তিনি এখানকার সামাজিক অবস্থা দেখে বিস্মিত হন। ভারতবাসীদের জীবনযাত্রা ও সভ্যতা তাঁর কাছে অত্যন্ত পশ্চাৎপদ বলে মনে হয়। বাবরের বর্ণনায় তৎকালীন ভারতের অবস্থা ছিল নিম্নরূপ—‘ভারতে ভালো ঘোড়া নেই, উত্কৃষ্ট মাংস নেই, আঙুর নেই, তরমুজ নেই, বরফ নেই, ঠাণ্ডা পানি নেই, গোসলখানা নেই, মাদরাসা নেই, মোমবাতি নেই, এমন কোনো আলোর ব্যবস্থা নেই, যা সর্বত্র কাজে লাগতে পারে; মশাল নেই, মোমবাতির স্ট্যান্ড নেই। আরো বলছেন, বাগান ও অট্টালিকাগুলোতে প্রবহমান পানির ব্যবস্থা নেই। ভবনগুলোতে না আছে পরিচ্ছন্নতা, না আছে সুষম পরিকল্পনা, না উপযুক্ত বায়ুপ্রবাহ, না আছে স্থাপত্যগত সামঞ্জস্য। সাধারণ মানুষ খালি পায়ে শুধু লুঙ্গি পরে ঘুরে বেড়ায়। নারীরাও লুঙ্গি ব্যবহার করে, যার এক অংশ কোমরে পেঁচিয়ে রাখে এবং অপর অংশ মাথার ওপর ফেলে দেয়।’ (ইসলামী হুকুমত অওর হিন্দুস্তান মে উসকা তামাদ্দুনি আসার, পৃষ্ঠা : ২-৩)
মুসলিম শাসকরা ভারতকে শুধু বিজিত ভূখণ্ড হিসেবে দেখেননি; বরং নিজেদের মাতৃভূমি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা দেশটির উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধন ও সমৃদ্ধির জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালান। এ সম্পর্কে সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) লেখেন, ‘মুসলমানরা যদিও বিজয়ীর মর্যাদায় ভারতে প্রবেশ করেছিল, কিন্তু তারা বিদেশি শাসকদের মতো এটিকে শুধু বাণিজ্যের বাজার বা সম্পদ আহরণের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করেনি, বরং তারা এটিকে নিজের দেশ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এখানে বসবাস করেছে, এখানেই জীবন কাটিয়েছে এবং মৃত্যুর পরও এ দেশের মাটিতেই সমাহিত হয়েছে। এ কারণে তারা শাসন ও রাজনীতি, জ্ঞান ও শিল্প, কারিগরি ও হস্তশিল্প, কৃষি ও বাণিজ্য, সভ্যতা ও সামাজিক জীবন—প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারতের উন্নয়নে অবদান রেখেছে এবং প্রকৃত অর্থে ভারতকে স্বর্গসম দেশে পরিণত করেছে।’
(ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতিতে মুসলিম অবদান, পৃষ্ঠা : ১)
ভারতে মুসলিম শাসকদের অবদান অনেক অমুসলিমও স্বীকার করেছেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা ও সাবেক কংগ্রেস সভাপতি বি পট্টাভি সীমারামাইয়া বলেছেন, ‘মুসলমানরা আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে এবং আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোকে সুদৃঢ় করেছে। তারা দেশের দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও নৈকট্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। ভারতের সাহিত্য ও সামষ্টিক জীবনে তাদের প্রভাব অত্যন্ত গভীরভাবে বিদ্যমান।’
(হিন্দুস্তানি মুসলমান, পৃষ্ঠা : ৩০)
ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের সুফল তুলে ধরতে হলে সুদীর্ঘ আলোচনা প্রয়োজন, যা এখানে সম্ভব নয়।