ইসলামের সূচনা হয়েছিল একটি শব্দ দিয়ে— ‘ইকরা’। পড়ো। ইতিহাসের বিচারে এটি শুধু একটি ধর্মীয় আহবান ছিল না; ছিল জ্ঞানকে মানবজীবনের কেন্দ্রে স্থাপন করার ঘোষণা। কোরআন কলমের শপথ করেছে, লেখার কথা বলেছে, জ্ঞান অর্জনকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। ফলে মুসলিম সমাজের ভেতরে শুরু থেকেই লিখিত জ্ঞান সংরক্ষণের একটি প্রবল সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। হাদিস সংকলন, কোরআনের কপি প্রস্তুত, ফিকহ ও তাফসির রচনা—সবকিছুই নির্ভর করছিল লেখার ওপর। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন তখনো রয়ে গিয়েছিল—জ্ঞান লেখা হবে কোথায়? অষ্টম শতাব্দীতে সেই প্রশ্নের উত্তর হয়ে আসে কাগজ।
আজকের মানুষের কাছে কাগজ খুব সাধারণ একটি বস্তু। কিন্তু এক হাজার বছর আগে এটি ছিল সভ্যতা নির্মাণের প্রযুক্তি। কাগজ মুসলিম বিশ্বের হাতে পৌঁছার আগে বই ছিল ব্যয়বহুল সম্পদ। পশুর চামড়া কিংবা প্যাপিরাসের ওপর লেখা পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করতে বিপুল সময় ও অর্থ ব্যয় হতো। ফলে জ্ঞান প্রায়ই সীমাবদ্ধ থাকত অভিজাতদের গ্রন্থাগার বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতর। কাগজ সেই দেয়াল ভেঙে দেয়।
সমরখন্দ থেকে বাগদাদ, বাগদাদ থেকে কায়রো, দামেস্ক ও কুরতুবা—মুসলিম বিশ্বের নগরীগুলো দ্রুত কাগজ উৎপাদন ও বই বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়। আব্বাসীয় যুগে বাগদাদের যে চিত্র ইতিহাসে পাওয়া যায়, তা বিস্ময়কর। এখানে শুধু পণ্ডিতরাই ছিলেন না; ছিলেন পেশাদার অনুলিপিকার, বই বিক্রেতা, বাঁধাইকারী ও পাঠক। বই একটি সাংস্কৃতিক পণ্যে পরিণত হয়েছিল। এমনকি কিছু বাজারে বইয়ের দোকানগুলো বিদ্বজ্জনদের আড্ডা ও বিতর্কের কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত ছিল।
এই পরিবেশে জন্ম নেয় মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অনুবাদ আন্দোলন। গ্রিসের দর্শন, ভারতের গণিত, ফরাসির রাষ্ট্রচিন্তা এবং বিভিন্ন ভাষার চিকিৎসাবিজ্ঞান আরবিতে অনূদিত হতে থাকে। কিন্তু এই আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি ছিল অনুবাদক নয়, কাগজ। কারণ কোনো ধারণা তখনই সভ্যতাকে বদলায়, যখন তা হাজার মানুষের হাতে পৌঁছে।
বাইতুল হিকমাহকে আমরা প্রায়ই একটি গ্রন্থাগার বা গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে স্মরণ করি। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল একটি বৃহত্তর বৌদ্ধিক অবকাঠামোর অংশ। সেই অবকাঠামোর ভিত্তি ছিল কাগজ। কাগজ জ্ঞানকে বন্দি কক্ষ থেকে বের করে নগরের রাস্তায় নিয়ে এসেছিল। একটি পাণ্ডুলিপি আর একক কপি হয়ে থাকত না; তার অনুলিপি তৈরি হতো, ছড়িয়ে পড়ত, বিতর্ক সৃষ্টি করত, নতুন চিন্তার জন্ম দিত।
এ কারণেই মুসলিম বিশ্বের স্বর্ণযুগকে শুধু মনীষীদের যুগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আল-খাওয়ারিজমি, ইবনে সিনা, আলবিরুনি কিংবা ইবনুল হাইসামের পেছনে ছিল এমন একটি সমাজ, যেখানে জ্ঞান উৎপাদনের পাশাপাশি জ্ঞান প্রচারেরও ব্যবস্থা ছিল। কাগজ সেই ব্যবস্থার প্রাণরস হিসেবে কাজ করেছিল।
আন্দালুসের কুরতুবা এই ইতিহাসের আরেকটি উজ্জ্বল অধ্যায়। ইউরোপ যখন দীর্ঘ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল, তখন কুরতুবার গ্রন্থাগারগুলো হাজার হাজার পাণ্ডুলিপিতে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। জ্ঞানান্বেষীরা দূরদূরান্ত থেকে সেখানে আসতেন। বই তখন শুধু শিক্ষার উপকরণ নয়; ছিল সামাজিক মর্যাদা, সাংস্কৃতিক শক্তি এবং সভ্যতার পরিচয়ের অংশ।
আজ আমরা ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে আছি। তথ্যের প্রাচুর্য আমাদের চারপাশে। কিন্তু ইতিহাসের কাগজ বিপ্লব একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়—প্রযুক্তি কখনো একা সভ্যতা গড়ে না। সভ্যতা গড়ে মানুষের জ্ঞানপিপাসা, প্রশ্ন করার সাহস এবং শেখার সংস্কৃতি। মুসলিম বিশ্বের কাগজ বিপ্লবের প্রকৃত তাৎপর্য এখানেই যে তারা একটি প্রযুক্তিকে জ্ঞানচর্চার বাহনে পরিণত করেছিল।
টাইগ্রিসের তীরে সেই কাগজকলগুলোর চাকা বহু আগেই থেমে গেছে। কিন্তু তাদের উত্তরাধিকার এখনো জীবিত। প্রতিটি গ্রন্থাগারে, প্রতিটি বইয়ের পাতায়, এমনকি ডিজিটাল পর্দায় ভেসে ওঠা প্রতিটি লেখার মধ্যেও যেন লুকিয়ে আছে সেই পুরনো বিপ্লবের প্রতিধ্বনি। ইতিহাসের অনেক সাম্রাজ্য বিলীন হয়েছে, কিন্তু জ্ঞানের জন্য নির্মিত সেই অবকাঠামোর স্মৃতি আজও মানবসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন হয়ে আছে।
পাঠঋণ
জোনাথন এম. ব্লুম, Paper Before Print: The History and Impact of Paper in the Islamic World
দিমিত্রি গুতাস, Greek Thought, Arabic Culture
ফ্রাঞ্জ রোজেনথাল, Knowledge Triumphant: The Concept of Knowledge in Medieval Islam
মার্শাল জি. সে. হজসন, The Venture of Islam।
ইয়োহানেস পেডারসেন, The Arabic Book
সৈয়দ আলী আশরাফ, মুসলিম শিক্ষাচিন্তার ইতিহাস।
লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুল মানার
মহাখালী, ঢাকা