• ই-পেপার

দৈনন্দিন ইসলামী প্রশ্ন-উত্তর

  • সমাধান : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব ১১৯২

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

‘তিনিই তাঁর রাসুলকে পথনির্দেশ ও সত্য দ্বিনসহ প্রেরণ করেছেন অপর সব দ্বিনের ওপর একে জয়যুক্ত করতে। আর সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল; তাঁর সহচরগণ অবিশ্বাসীদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় তুমি তাদেরকে রুকু-সেজদায় অবনত দেখবে।...’ (সুরা : ফাতহ, আয়াত : ২৮-২৯)

আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ঘোষণা করেছেন।

 

শিক্ষা ও বিধান

১. মুসলমানের জন্য ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাস রাখা আবশ্যক। ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরা এবং তা প্রতিষ্ঠা করা মুসলমানের দায়িত্ব।

২. আল্লাহ তাঁর দ্বিনকে জয়যুক্ত করার অঙ্গীকার করেছেন। সুতরাং মুমিন কোনো দ্বিনি কাজে হতাশ হবে না।

৩. আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, অবিশ্বাসী ও আল্লাহর শত্রুর প্রতি অন্তরে ঘৃণা রাখা এবং মুমিনের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা মুসলমানের বৈশিষ্ট্য।

৪. বেশির ভাগ তাফসিরবিদ বলেন, ২৯ নং আয়াতে সাহাবিদের বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে।

৫. হাসান বসরি (রহ.) বলেন, আয়াতে বিশিষ্ট সাহাবিদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলো, ‘রাসুলের সঙ্গী’ দ্বারা আবু বকর, কঠোর দ্বারা ওমর, দয়ালু দ্বারা উসমান, রুকু-সেজদায় অবনত দ্বারা আলী (রা.)-এর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। আর ‘দয়া ও সন্তুষ্টি প্রত্যাশী’ সাধারণভাবে সব সাহাবির বৈশিষ্ট্য। (জাদুল মাসির : ৭/৪৪৫)

প্রশ্ন-উত্তর

সমাধান : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা

প্রশ্ন-উত্তর

অসিয়ত না করলেও বাবার বদলি হজ করা

প্রশ্ন : আমার চাচা একজন ধনী মানুষ ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর জীবদ্দশায় হজ করেননি। তাঁর সন্তানদের তাঁর পক্ষ থেকে বদলি হজ আদায় করার জন্য অসিয়তও করে যাননি। এখন কি তাঁর সন্তানরা তাঁর পক্ষ থেকে বদলি হজ আদায় করতে পারবে? যদি আদায় করতে পারে, তাহলে সন্তানের ওপর এই হজ আদায় করার বিধান কী?

ওয়াজি উল্লাহ, ওয়ারী, ঢাকা

উত্তর : সন্তানরা অসিয়তবিহীন নিজ খরচে পিতার পক্ষ থেকে বদলি হজ আদায় করতে পারবে। তাদের জন্য এই হজ আদায় করাটা আবশ্যক নয়, তবে এই হজ দ্বারা পিতা আল্লাহ তাআলার কাছে দায়মুক্ত হওয়ার আশা করা যাবে। (বুখারি : ১/২৫০, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/২৮৫)

 

অজুতে গর্দান মাসেহ করার বিধান

প্রশ্ন : আমার এক বন্ধু দাবি করেছে, অজুর সময় গর্দান মাসেহ করা নাকি প্রমাণিত নয়, এটা বিদআত। আমার প্রশ্ন হলো, আসলেই কি অজুর মধ্যে গর্দান মাসেহ করা মুস্তাহাব না বিদআত? দয়া করে জানাবেন।

ফয়সাল, বনশ্রী

উত্তর : অজুর মধ্যে গর্দান মাসেহ করা হাদিস দ্বারা মুস্তাহাব বলে প্রমাণিত, বিদআত নয়। (মুসনাদে আহমদ : ১২/৩৮৫, আবু দাউদ : ১/১৮)

 

 

নবীজির স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক আরিস কূপ

আহমাদ মুহাম্মাদ
নবীজির স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক আরিস কূপ

মদিনার ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে কুবার ‘আরিস কূপ’ (বিরে আরিস) বিশেষভাবে স্মরণীয়। ইসলামের ইতিহাসে এই কূপটি একদিকে যেমন নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যবহৃত মোহরখচিত আংটি হারিয়ে যাওয়ার ঘটনার সাক্ষী, অন্যদিকে তেমনি এটি প্রথম তিন খলিফা আবু বকর (রা.), ওমর (রা.) এবং ওসমান (রা.)-কে জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়ার পবিত্র স্মৃতি বহন করে।

সৌদি বিশ্বকোষে উল্লেখ অনুযায়ী, মদিনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত সবচেয়ে বিখ্যাত কূপগুলোর অন্যতম হলো আরিস কূপ। নবীজির আংটি এখানে পতিত হওয়ার ঘটনার পর থেকেই এটি ‘বিরে খাতাম’ (আংটির কূপ) নামেও পরিচিতি লাভ করে। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) আরিস কূপের পাশে অবস্থান করছিলেন। এ সময় তিনি পর্যায়ক্রমে আবু বকর (রা.), ওমর (রা.) এবং ওসমান (রা.)-কে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেন। প্রত্যেককে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেন। তবে ওসমান (রা.)-এর ক্ষেত্রে তিনি এটিও জানান যে তিনি ভবিষ্যতে একটি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হবেন, কিন্তু সে অবস্থায় ধৈর্য ধারণ করবেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৬৯৫, ৩৬৯৭)

যে আংটি ছিল রাষ্ট্রীয় সিলমোহর

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আংটিটি ছিল রুপার তৈরি। এতে তিন লাইনে খোদাই করা ছিল ‘মুহাম্মদ, আল্লাহর রাসুল।’ বিদেশি শাসকদের কাছে পাঠানো সরকারি চিঠি ও রাষ্ট্রীয় দলিলে এই আংটির ছাপ সিলমোহর হিসেবে ব্যবহৃত হতো। নবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর আংটিটি যথাক্রমে আবু বকর (রা.), ওমর (রা.) এবং পরে ওসমান (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত ছিল।

যেভাবে হারিয়ে যায় ঐতিহাসিক সেই আংটি?

ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, ওসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে আনুমানিক ৩০ হিজরি সালে আরিস কূপের পাশে অবস্থানকালে অসাবধানতাবশত আংটিটি তাঁর হাত থেকে কূপে পড়ে যায়। এরপর কয়েক দিন ধরে কূপের পানি তুলে এবং ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়েও আংটিটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই ঘটনাটি ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ঘটনারূপে স্থান পেয়েছে। তাই আজও আরিস কূপ মুসলিমদের কাছে গভীর ঐতিহাসিক ও আবেগঘন স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিবেচিত।

আরিস কূপের গুরুত্ব

ইসলামের ইতিহাসে আরিস কূপ মহানবী (সা.)-এর জীবন, তাঁর রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম এবং খোলাফায়ে রাশেদিনের স্মৃতিবিজড়িত এক অনন্য ঐতিহাসিক নিদর্শন। তাই যুগে যুগে ইতিহাসবিদ, গবেষক ও মুসলিম দর্শনার্থীদের কাছে এই কূপ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এবং মদিনার ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

 

কোরআন-হাদিসে গাছ প্রসঙ্গ

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
কোরআন-হাদিসে গাছ প্রসঙ্গ

মহান আল্লাহ তাঁর অসংখ্য নিয়ামতের মাধ্যমে পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে তুলেছেন। সেই নিয়ামতগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো গাছ। এর মাধ্যমে মানুষের অক্সিজেন, খাদ্য, আসবাব, পশুপাখির আশ্রয়, পরিবেশের ভারসাম্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং অসংখ্য প্রাণের জীবনধারণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই ইসলাম গাছকে শুধু একটি উদ্ভিদ হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর এক মহা নিয়ামত এবং মানবকল্যাণের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছে। নিম্নে গাছ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে আসা কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো—

রিজিকের অন্যতম উৎস : গাছের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাঁর বিভিন্ন মাখলুকের রিজিকের ব্যবস্থা করেন। যার মধ্যে মানুষ, পশুপাখি, পোকা-মাকড় সবই অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তিনিই সৃষ্টি করেছেন এমন বাগানসমূহ, যার কিছু মাচায় তোলা হয় আর কিছু তোলা হয় না এবং খেজুরগাছ ও শস্য, যার স্বাদ বিভিন্ন রকম, জয়তুন ও আনার যার কিছু দেখতে একরকম, আর কিছু ভিন্ন রকম। তোমরা তার ফল থেকে আহার করো, যখন তা ফলদান করে এবং ফল কাটার দিনেই তার হক দিয়ে দাও। আর অপচয় কোরো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’

(সুরা : আনআম, আয়াত : ১৪১)

অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘অতঃপর তাতে আমি উৎপন্ন করি শস্য, আঙুর ও শাক-সবজি,  জয়তুন ও খেজুর বন, ঘনবৃক্ষ শোভিত বাগ-বাগিচা, আর ফল ও তৃণগুল্ম। তোমাদের ও তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুগুলোর জীবনোপকরণস্বরূপ।’

(সুরা : আবাসা, আয়াত : ২৭-৩২)

এ আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, গাছ শুধু মানুষের নয়; পশুপাখির রিজিকেরও অন্যতম উৎস।

মানুষের ব্যাবহারিক কল্যাণের মাধ্যম : মহান আল্লাহ গাছের মাধ্যমে তাঁর বান্দাদের ব্যাবহারিক কল্যাণের ব্যবস্থা করেন। যেমন— নুহ (আ.) নৌকা তৈরি করেছিলেন বলে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি তাকে (নুহকে) কাঠ ও পেরেক নির্মিত নৌযানে আরোহণ করালাম।’

(সুরা : কামার, আয়াত : ১৩)

একইভাবে জ্বালানিরও গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস কাঠ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যিনি সবুজ বৃক্ষ থেকে তোমাদের জন্য আগুন তৈরি করেছেন। ফলে তা থেকে তোমরা আগুন জ্বালাও।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৮০)

এ আয়াতগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গাছের বহুমুখী উপকারিতার প্রতি ইঙ্গিত দেয়। বর্তমান যুগে আমাদের ব্যবহৃত বহু জিনিস এমন আছে, যার উৎস মূলত গাছ।

ছায়া দেয় : গাছের শীতল ছায়ায় ক্লান্ত মানুষ স্বস্তি পায়। শরীরিক সুস্থতা ও মানসিক প্রফুল্লতায়ও গাছ বিশেষ ভূমিকা রাখে। মহান আল্লাহ যখন ইউনুস (আ.)-কে মাছের পেট থেকে নাজাত দিয়েছিলেন, তখন তাঁকে ছায়া দেওয়ার জন্য তাৎক্ষণিক একটি ছায়াদার গাছ উদ্গত করেছিলেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর আমি তাকে তৃণলতাহীন প্রান্তরে নিক্ষেপ করলাম এবং সে ছিল অসুস্থ।  অতঃপর আমি তার ওপর লাউ-কুমড়া জাতীয় লতাপাতাযুক্ত একটা গাছ বের করে দিলাম।’ (সুরা : সাফফাত, আয়াত : ১৪৫-১৪৬)

পরিবেশ রক্ষায় উপকারী : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা জমিনে ফাসাদ কোরো না তার সংশোধনের পর এবং তাঁকে ডাকো ভয় ও আশা নিয়ে। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।’

(সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৬)

কোনো কোনো তাফসিরবিদের মতে, এই আয়াত পরিবেশ ধ্বংস, বন উজাড়, প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহারসহ সব ধরনের ফাসাদ (বিপর্যয়) থেকে বিরত থাকারও একটি মৌলিক নীতি প্রদান করে।

গাছ লাগালে সদকার সওয়াব : গাছ যেহেতু বহুভাবে মানুষের জীবন ও কল্যাণের সঙ্গে জড়িত, তাই সহিহ নিয়তে তা রোপণ করা ও পরিচর্চা করারও বিশেষ সওয়াব রয়েছে। গাছ লাগানোর প্রতি উৎসাহ দিতে গিয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যেকোনো মুসলিম ফলবান গাছ রোপণ করে কিংবা কোনো ফসল ফলায় আর তা হতে পাখি কিংবা মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু খায়, তবে তা তার পক্ষ হতে সদকা বলে গণ্য হবে।’

(বুখারি, হাদিস : ২৩২০)

এমনকি অন্য হাদিসে তিনি কিয়ামতের পূর্বক্ষণেও যদি কেউ গাছ লাগানোর সুযোগ পায়, তাহলেও যেন সে গাছটি রোপণ করে এ ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন।

(মুসনাদে আহমাদ)

অতএব আমাদের সবার উচিত পরিবেশের বন্ধু এই সম্পদ বৃদ্ধি, রক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণে যত্নবান হওয়া।

 

 

 

দৈনন্দিন ইসলামী প্রশ্ন-উত্তর | কালের কণ্ঠ