kalerkantho

শুক্রবার । ১৪ মাঘ ১৪২৮। ২৮ জানুয়ারি ২০২২। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ধর্মীয় নেতাদের জ্ঞানগত দক্ষতা অপরিহার্য

আতাউর রহমান খসরু   

১৫ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ধর্মীয় নেতাদের জ্ঞানগত দক্ষতা অপরিহার্য

ধর্মীয় অঙ্গনে নেতৃত্বের জন্য ইসলামী জ্ঞানে দক্ষ হওয়া অপরিহার্য। কেননা যথাযথ জ্ঞান না থাকলে নেতা তার অনুসারীদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারবে না। বরং তার দ্বারা মুসলিম সমাজে বিভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতা ছড়িয়ে পড়ার সমূহ আশঙ্কা আছে। ধর্মীয় নেতৃত্বদানের জন্য কোরআন-হাদিস যথাযর্থভাবে বোঝা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

আর আল্লাহ এ ব্যাপারে বলেন, ‘এসব দৃষ্টান্ত আমি মানুষের জন্য দিই, কিন্তু কেবল জ্ঞানী ব্যক্তিরাই তা বোঝে। ’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৩)

জ্ঞান ধর্মীয় নেতৃত্বের পূর্বশর্ত : ধর্মীয় নেতৃত্ব গ্রহণের পূর্বশর্ত ধর্মের গভীর জ্ঞান লাভ করা। কেননা নেতৃত্ব লাভের পর জ্ঞানচর্চার সুযোগ সংকীর্ণ হয়ে আসে। এ জন্য উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘তোমরা নেতৃত্ব গ্রহণের আগে ধর্মের গভীর জ্ঞান লাভ কোরো। কেননা জ্ঞান তোমাকে অধীনদের ব্যাপারে অহংকার করা থেকে বিরত রাখবে। আর জ্ঞানার্জন না করলে মূর্খ থেকে যাবে। ’ আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) উমর (রা.)-এর এই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘নেতৃত্ব লাভের পরও কোনো ব্যক্তির জন্য জ্ঞানচর্চা ছেড়ে দেওয়া জায়েজ নেই। ইমাম বুখারি (রহ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিদের ব্যাপারে লিখেছেন, তাঁরা বৃদ্ধ বয়সেও দ্বিনি ইলম চর্চা করতেন। ’ (উমদাতুল কারি : ২/৮৪)

জ্ঞান নেতৃত্বকে দৃঢ় করে : জ্ঞান মানুষের নেতৃত্বকে দৃঢ় করে, বরং মানুষকে নেতৃত্বের জন্য যোগ্য করে তোলে। পূর্বসূরি আলেমরা বলেন, তুমি ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করো। কেননা তা তোমাকে শক্তিশালী করবে, শৈশবে তোমাকে সঠিক পথ দেখাবে, যৌবনে তোমাকে এগিয়ে দেবে এবং নেতৃত্বের যোগ্য করবে। তোমার ভুলত্রুটি সংশোধন করবে, তোমার শত্রু ও হিংসুকের গাত্রদাহ বাড়াবে। তোমার ভেতরের বক্রতা ও মন্দ প্রবণতা ঠিক করবে এবং তোমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আশাকে সঠিক পথে চালিত করবে। (আদাবুদ-দিন ওয়াদ-দুনিয়া, পৃষ্ঠা ৩৫)

জ্ঞান নেতৃত্বে ভারসাম্য আনে : ধর্মীয় জ্ঞান মানুষের জীবনে ভারসাম্য আনে। আর ধর্মীয় নেতাদের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান বলেন, ‘হে বৎস! তোমরা জ্ঞানার্জন করো। কেননা তুমি যদি নেতৃত্বের অযোগ্য হও, তবে জ্ঞান তোমাকে যোগ্য করবে। আর যদি তুমি নেতা হও, তবে জ্ঞান তোমার নেতৃত্বে ভারসাম্য আনার মাধ্যমে তাকে স্থায়ী করবে। ’ (মাউসুআতুল কিয়াদাতি ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা ৭৫)

জ্ঞানীরাই যথার্থ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে : নেতৃত্বদানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর জ্ঞানী ব্যক্তিরাই যথার্থ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন শান্তি বা শঙ্কার কোনো সংবাদ তাদের কাছে আসে, তখন তারা তা প্রচার করে থাকে। যদি তারা তা রাসুল বা তাদের মধ্যে যারা ক্ষমতার অধিকারী, তাদের গোচরে আনত, তবে তাদের মধ্যে যারা তথ্যানুসন্ধান করে, তারা তার যথার্থতা নির্ণয় করতে পারত। ’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৮৩)

উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিররা বলেন, নেতৃত্ব এমন ব্যক্তিদের দেওয়া আবশ্যক, যারা ধর্মীয় বিষয়গুলোসহ তার অধীন যেকোনো বিষয়ে সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষমতা রাখে, যেন সে সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারে।

জ্ঞান ছাড়া দায়িত্বপূর্ণ হয় না : ধর্মীয় নেতারা মূলত মুসলিম সমাজের জন্য মহানবী (সা.)-এর উত্তরাধিকারী, নবীজি (সা.)-এর প্রতিনিধি। সুতরাং নবীজি (সা.)-এর রেখে যাওয়া কাজগুলো আঞ্জাম দেবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই উম্মিদের মধ্যে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে, যে তাদের কাছে আবৃত্তি করে তাঁর আয়াতগুলো; তাদের পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও প্রজ্ঞা; ইতিপূর্বে তারা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে। ’ (সুরা : জুমা, আয়াত : ২)

উল্লিখিত আয়াতে মহান আল্লাহ মূলত চারটি দায়িত্বের কথা বলেছেন, তা হলো কোরআন পাঠ করা, আত্মিকভাবে পবিত্র করা, কিতাব শিক্ষা দেওয়া ও প্রয়োজনীয় জাগতিক জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া। ধর্মীয় নেতাদের যদি প্রয়োজনীয় জ্ঞান না থাকে, তবে তাদের পক্ষে উল্লিখিত দায়িত্বগুলো পালন করা সম্ভব নয়।

জ্ঞানীদের দ্বারাই বেশি উপকৃত হওয়া যায় : আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে যে হিদায়াত ও ইলম (ধর্মীয় জ্ঞান) দিয়ে পাঠিয়েছেন তার দৃষ্টান্ত হলো জমিনের ওপর পতিত প্রবল বর্ষণের মতো। কোনো কোনো ভূমি থাকে উর্বর, যা সে পানি শুষে নিয়ে প্রচুর পরিমাণে ঘাসপাতা এবং সবুজ তরুলতা উৎপাদন করে। আর কোনো কোনো ভূমি থাকে কঠিন, যা পানি আটকে রাখে। পরে আল্লাহ তাআলা তা দিয়ে মানুষের উপকার করেন, তারা নিজেরা পান করে ও (পশুপালকে) পান করায় এবং তা দ্বারা চাষাবাদ করে। আবার কোনো কোনো জমি রয়েছে, যা একেবারে মসৃণ ও সমতল, তা না পানি আটকে রাখে আর না কোনো ঘাসপাতা উৎপাদন করে। এই হলো সে ব্যক্তির দৃষ্টান্ত, যে দ্বিনের জ্ঞান অর্জন করে এবং আল্লাহ তাআলা আমাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তাতে সে উপকৃত হয়। ফলে সে নিজে শিক্ষা করে এবং অপরকে শেখায়। আর সে ব্যক্তিরও দৃষ্টান্ত, যে সেদিকে মাথা তুলে দেখে না এবং আল্লাহর যে হিদায়াত নিয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি, তা গ্রহণও করে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৯)

ধর্মীয় নেতারা ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয় : নেতা যত বড়ই হোক, সে নিজের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে যাবে না এবং অন্যরাও তার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে থাকবে না। ধর্মীয় নেতৃত্ব ও তাদের আনুগত্যের ব্যাপারে আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর নিম্নোক্ত বক্তব্য থেকে নির্দেশনা নেওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের শাসক নিয়োজিত হয়েছি। অথচ আমি তোমাদের থেকে উত্তম নই। আমি যদি ভালো করি, তবে আমাকে সাহায্য করবে। আমি ভুল করলে শুধরে দেবে। সত্য হলো আমানত রক্ষা করা আর মিথ্যা হলো খিয়ানত (বিশ্বাস নষ্ট) করা। ... আমি যতক্ষণ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করব, ততক্ষণ আমার আনুগত্য করবে। যদি আমি আল্লাহর অবাধ্য হই, তবে আমার আনুগত্য (নেতৃত্ব) তোমাদের জন্য আবশ্যক নয়। ’ (আল হুকমু ওয়াল ইদারা ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা ৮২-৮৩)

আল্লাহ তাআলা সবাইকে প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

 



সাতদিনের সেরা