মধ্য ইউরোপের স্থলবেষ্টিত দেশ হাঙ্গেরি। এর উত্তরে স্লোভাকিয়া, পূর্বে ইউক্রেন ও রোমানিয়া, দক্ষিণে সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়া, দক্ষিণ-পশ্চিমে স্লোভেনিয়া এবং পশ্চিমে অস্ট্রিয়া অবস্থিত। হাঙ্গেরির বেশির ভাগ অঞ্চল সমতল ও নিম্নভূমি নিয়ে গঠিত। হাঙ্গেরির অর্থনীতি বৈচিত্র্যময় ও রপ্তানিনির্ভর। প্রধান আর্থিক খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে অটোমোবাইল উৎপাদন, যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিকস, ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প, তথ্য-প্রযুক্তি, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পর্যটন। দেশটির আয়তন প্রায় ৯৩ হাজার ৩০ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় ৯.৫ মিলিয়ন (৯৫ লাখ)। ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে আট হাজারের মতো মুসলিম রয়েছে। তবে কোনো কোনো সূত্রের দাবি—হাঙ্গেরিতে মুসলমানের প্রকৃত সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ হাজারের মতো।
ধারণা করা হয়, হিজরি চতুর্থ শতকের শেষভাগে হাঙ্গেরিতে মুসলমানদের আগমন ঘটেছিল। তখন বুলগেরিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশ সেখানে হিজরত করেছিল। ইয়াকুত হামাভি, যিনি ৬২৬ হিজরি মোতাবেক ১২২৮ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন, তিনি সিরিয়ার হালব শহরে হাংকারের (আধুনিক হাঙ্গেরির) একজন শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎ পান। যে তাঁকে বলেছিল, তাদের দেশে ৩০টি মুসলিম গ্রাম রয়েছে এবং তারা হানাফি মাজহাবের অনুসারী। সে আরো জানিয়েছিল, হালবে হাঙ্গেরির আরো বহু শিক্ষার্থী আছে। যারা দেশে ফিরে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় শিক্ষা ও কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দেবে।
খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত মুসলিমরা হাঙ্গেরীয় জনগণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। বোসজোরমেনি নামে পরিচিত মুসলিম হাঙ্গেরির রাজকীয় বাহিনীতে শুধু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত না, বরং তারা ছিল রাজ্যের আক্রমণকারী অগ্রগামী বাহিনী ও আপৎকালীন বিশেষ বাহিনী। মুসলিমরা হাঙ্গেরি রাজ্যে একাধিক শহর ও বসতিও গড়ে তুলেছিল। সামরিক তৎপরতা ছাড়াও তারা সফল ব্যবসায়ী, কারিগর ও শিল্পী হিসেবেও পরিচিত ছিল। তারা পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে ভ্রমণ করত। যেমন ইউরোপের প্রাগ ও সিরিয়ার আলেপ্পো। আরব ও ইহুদি লেখকের বর্ণনায় তাদের বিবরণ পাওয়া যায়।
বুলগেরিয়া থেকে মুসলমানদের হাঙ্গেরিতে হিজরতের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলা হয়, খাজার খাগানাতের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সময় খাজারদের তিনটি গোত্র, যারা সম্মিলিতভাবে কাভার নামে পরিচিত ছিল, ইহুদি দলের কাছে আত্মসমর্পণ করে। পরবর্তী সময়ে কাভাররা খাজারিয়ার সীমানা ত্যাগ করে হাঙ্গেরীয়দের কাছে আশ্রয় নেয় এবং তাদের উপজাতীয় জোট হেত-মাগইয়ার বা ‘সাত গোত্রের’ কনফেডারেশনের অংশে পরিণত হয়।
তখন খাজারিয়ার মুসলিম প্রজাদের একটি অংশ কাভারদের জোটে যোগ দেয়। তারা পরে হাঙ্গেরীয়দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে খোরাসমীয় নামে পরিচিত হয়। হাঙ্গেরীয়রা হাঙ্গেরিতে বসতি স্থাপনকারী মুসলিম খোরাসমীয়দের ‘কালিস’ নামে অভিহিত করত। খাজারিয়ার যেসব মুসলিম নিজেদের ধর্ম অক্ষুণ্ন রেখেও বসবাস করত তারা আল আরসিয়া নামে পরিচিত ছিল। তারা খাজারদের অশ্বারোহী বাহিনীর মূলশক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো। ধারণা করা হয়, হাঙ্গেরীয়দের সঙ্গে যোগ দেওয়া মুসলিমরাও হেত-মাগইয়ার সামরিক কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে অগসবার্গের যুদ্ধে জার্মানদের কাছে পরাজিত হওয়ার পর হাঙ্গেরির শাসক প্রিন্স তাকশোনি তাঁর সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করতে নতুন করে মুসলিম সেনাদের নিয়োগ দেন। এ সময় বিল্লাহ ও বকশ নামের দুই বুলগার রাজপুত্র একদল মুসলিম সৈন্যসহ তাকশোনির অধীনে যোগ দেন। পরে তাদের হাঙ্গেরিতে বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। নতুন আগতদের দুই-তৃতীয়াংশকে পেস্ট দুর্গের আশপাশে এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশকে অন্যান্য মুসলিম শিবিরে বসবাসের জন্য স্থায়ীভাবে বসতি দেওয়া হয়।
হাঙ্গেরিতে মুসলিম বসতির পরবর্তী ঢেউ আসে একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে। এই পর্যায়ে পেচেনেগ মুসলিমদের আগমন ঘটে। আল বাকরির বর্ণনা অনুযায়ী, পেচেনেগরা প্রায় ১০১০ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম গ্রহণ করে। অন্যদিকে আবু হামিদ গারনাতি (গ্রানাডার অধিবাসী) হাঙ্গেরির এই মুসলিম পেচেনেগদের ‘মাগরিবিয়ান’ নামে উল্লেখ করেছেন। ১১৫০ খ্রিস্টাব্দে দেখা যায়, হাঙ্গেরির দুটি প্রধান মুসলিম গোষ্ঠী খোরাসমীয় (কালিস) এবং মাগরিবিয়ান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হাঙ্গেরীয় রাজার অধীনে সহায়ক বাহিনী হিসেবে একসঙ্গে যুদ্ধ করে। ১২৪১ খ্রিস্টাব্দে হাঙ্গেরি এক ভয়াবহ মোঙ্গলীয় আক্রমণের বিরুদ্ধেও মুসলিমরা সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিল।
১৫২৬ সালে মোহাচের যুদ্ধের জয় লাভের মাধ্যমে হাঙ্গেরির ভূমিতে উসমানীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৫৮৬ খ্রিস্টাব্দে উসমানীয়রা হাঙ্গেরির বেশির ভাগ অঞ্চল জয় করে। তখন হাঙ্গেরিতে মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তুর্কিসহ বিভিন্ন মুসলিম জনগোষ্ঠী সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। মাত্র ১০০ বছরের মাথায় ১৬৮৭ খ্রিস্টাব্দে হাঙ্গেরিতে তুর্কি শাসনের পতনের সূচনা হয়। ১৭১৮ সালে উসমানীয়রা চূড়ান্তভাবে হাঙ্গেরি ছেড়ে যায়। এর পরও বহুসংখ্যক মুসলিম হাঙ্গেরিতে থেকে যায়। উসমানীয় আমলে শুধু বুদাপেস্টে ৬১টি মসজিদ, ১২টি ঈদগাহ, ১০টি ইসলামী বিদ্যালয় ছিল। মাদরাসাগুলোর ভেতর মোস্তফা স্কোলি পাশা মাদরাসাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া সেখানে ছোট-বড় অনেক মুসলিম পাঠাগার ছিল।
মুসলিম শাসনের অবসান হলে মুসলমানরা চরম অসহিষ্ণুতা ও বৈষম্যের শিকার হয়। তাদের দেশত্যাগ ও ধর্মান্তরে বাধ্য করা হয়। মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করা হয়। কিছুসংখ্যক মসজিদ ও মাদরাসাকে গির্জায় রূপান্তর করা হয়। বর্তমানে বুদাপেস্টে একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ, সুফি গুল বাবার মাজার ও গোসলখানা টিকে আছে। দক্ষিণ হাঙ্গেরির পেস শহরে একটি মসজিদ, কেন্টসিয়া শহর ও হামজা বেগ গ্রামে কিছু ইসলামী নিদর্শন টিকে আছে। হাঙ্গেরির সংবিধান সব ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর ধর্ম পালনের নিশ্চয়তা দিলেও দেশটির বেশ কিছু আইনকে বৈষম্যমূলক ও মুসলিম বিশ্বাস পরিপন্থী বলে অভিযোগ রয়েছে।
তথ্যঋণ : টিআরটি ওয়ার্ল্ড, আলুকা ডটকম ও ইসলাম ওয়েব ডটনেক