• ই-পেপার

বিশ্বকাপের আগে ‘বিস্ময়বালক’ হারিয়ে বড় ধাক্কা খেল জার্মানি

সমালোচনার মুখে পানি নিয়ে সিদ্ধান্ত বদলাল ফিফা

ক্রীড়া ডেস্ক
সমালোচনার মুখে পানি নিয়ে সিদ্ধান্ত বদলাল ফিফা
ছবি : রয়টার্স

উচ্চ মূল্যের টিকিট, যাতায়াত ও আবাসন নিয়ে অসন্তোষের পর এবার পানি নিয়ে ব্যবসা করার অভিযোগ উঠেছে ফিফার বিরুদ্ধে। ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের ভেন্যুতে দর্শকদের পানির বোতল বহনে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে সমর্থক ও বিশ্বনেতাদের প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে তারা।

ফিফা গত শুক্রবার রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, তীব্র গরমের কথা বিবেচনা করে দর্শকরা এখন থেকে সর্বোচ্চ ২০ আউন্স (৫৯০ মিলি) ধারণক্ষমতার একটি নরম প্লাস্টিকের সিলগালা করা ও একবার ব্যবহারযোগ্য বোতল সঙ্গে নিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতে পারবেন। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে শক্ত আবরণযুক্ত পুনঃব্যবহারযোগ্য বোতল বহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকছে।

এর আগে খেলোয়াড়দের সুরক্ষার অজুহাতে বিশ্বকাপের ১৬টি ভেন্যুতেই পানির বোতল নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল ফিফা। কিন্তু জুন-জুলাইয়ের তীব্র গরমে এমন সিদ্ধান্তকে ‘টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল’ হিসেবে আখ্যা দেন সমর্থকরা। 

এমনকি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং টরন্টোর মেয়র অলিভিয়া চোউ এটিকে ফিফার নিছক ‘টাকা কামানোর জঘন্য ফন্দি’ বলে তীব্র সমালোচনা করেন। অনেকেই বলছিলেন, ‘ওরা শুধু টাকা চেনে!’। 

উল্লেখ্য, আগামী ১১ জুন থেকে উত্তর আমেরিকার তিন দেশে (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা) শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। 
 

নতুন রানি পাচ্ছে ফ্রেঞ্চ ওপেন

ক্রীড়া ডেস্ক
নতুন রানি পাচ্ছে ফ্রেঞ্চ ওপেন
ছবি : ডব্লিউটিএ, বাঁ থেকে চোয়ালিনস্কা, আন্দ্রিভা

চলতি ফ্রেঞ্চ ওপেনে নারী একক ফাইনালে মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন রাশিয়ার মিরা আন্দ্রিভা এবং পোল্যান্ডের মায়া চোয়ালিনস্কা। এরই মধ্য দিয়ে নতুন একজন গ্র্যান্ড স্ল্যাম চ্যাম্পিয়ন পাচ্ছে টেনিস বিশ্ব। ফাইনালে ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামছেন রাশিয়ার ১৯ বছর বয়সী এই তারকা। এদিকে পোলিশ টেনিসকন্যাও নিজের সেরাটা দিয়ে প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম ঘরে তুলতে নিজের সেরাটা দিতে প্রস্তুত।

শনিবার (৬ জুন) প্যারিসের ফিলিপ চ্যাঁতিয়ে কোর্টে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ফ্ল্যাশস্কোরের তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহ দুই আগে চূড়ান্ত বাছাইয়ে ডাচ তারকা সুজান ল্যামেন্সকে ৭-৬, ৭-৫ গেমে কোনোমতে হারায় পোলিশ টেনিশ কুইং মায়া চোয়ালিনস্কা। তারপর পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলে টানা ৯ ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠেন তিনি । এতে রোলাঁ-গ্যারোসের ইতিহাসে সর্বপ্রথম কোনো বাছাই পর্বের খেলোয়াড় হিসেবে ফাইনালে উঠেছেন। 

এদিকে সেমিফাইনালে ইউক্রেনের মার্তা কস্তিউককে ৬-১, ৬-৩ গেমে উড়িয়ে দিয়ে ফাইনালে পা রাখেন এই রুশ তরুণী। ক্লে-কোর্টে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা আন্দ্রিভা এই ম্যাচে নামছেন ফেভারিট হিসেবে। এই প্যারিসের কোর্টেই ২০২৪ অলিম্পিকে তিনি রৌপ্যপদক জিতেছিলেন।

চ্যাম্পিয়নশিপ রাউন্ড পর্যন্ত পৌঁছানোর যাত্রায় ২৪ বছর বয়সী পোলিশ তারকা একে একে সব প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়কে পরাজিত করেছেন। অন্যদিকে মারিয়া প্রতিপক্ষকে হারাতে তিন সেট খেললেও পোলিশ টেনিস কুইং ঝেং কিনওয়েন, এলিস মের্টেন্স, আনা কালিনস্কায়া এবং অতি সম্প্রতি ডায়ানা স্নাইডারকে সরাসরি সেটে হারান।

চোয়ালিনস্কা যদি জয় পান। তবে ২০২১ ইউএস ওপেনে এমা রাডুকানুর পর দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ার হিসেবে কোনো গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের অনন্য কীর্তি গড়বেন তিনি।

 ম্যাচটি মূলত আন্দ্রিভার আগ্রাসী ও পাওয়ার টেনিসের সাথে চোয়ালিনস্কার ড্রপ শট, স্লাইস এবং দারুণ ডিফেন্সিভ ট্যাকটিকসের এক জমজমাট লড়াই হচ্ছে।

টি-টোয়েন্টিতে নতুন অধিনায়ক পেল ভারত

ক্রীড়া ডেস্ক
টি-টোয়েন্টিতে নতুন অধিনায়ক পেল ভারত
ভারতের নতুন টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক শ্রেয়াস আইয়ার। ছবি : বিসিসিআই

ভারতের টি-টোয়েন্টি দলের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন এনেছে বিসিসিআই। নতুন অধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে শ্রেয়াস আইয়ারের নাম। নেতৃত্ব হারানোর পাশাপাশি আয়ারল্যান্ড ও ইংল্যান্ড সফরের দল থেকেও বাদ পড়েছেন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব। 

আজ শনিবার দল ঘোষণার সময় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড জানায়, ২০২৮ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও ২০২৮ সামার অলিম্পিক সামনে রেখে নতুন পরিকল্পনা শুরু করেছে নির্বাচকরা। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই জাতীয় দলে প্রথমবারের মতো ডাক পেয়েছেন ১৫ বছর বয়সী বিস্ময়বালক বৈভব সূর্যবংশী।

সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন তিলক ভার্মা। এর আগে এই দায়িত্বে ছিলেন অক্ষর প্যাটেল। 

গত মার্চে সূর্যকুমারের নেতৃত্বেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রেখেছিল ভারত। তবে ২০২৮ সালের বিশ্বকাপের সময় তার বয়স হবে ৩৮ বছর। সাম্প্রতিক বিশ্বকাপে ৯ ইনিংসে ২৪২ রান এবং আইপিএলে ১৩ ইনিংসে মাত্র ২৭০ রান করার পর থেকেই তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

অন্যদিকে শ্রেয়াস আইয়ার দীর্ঘদিন জাতীয় দলের টি-টোয়েন্টি পরিকল্পনার বাইরে থাকলেও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা নির্বাচকদের আস্থা জুগিয়েছে। তিনি ২০২৪ সালে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে আইপিএল শিরোপা জিতিয়েছিলেন। 

এদিকে বৈভব সূর্যবংশীর অন্তর্ভুক্তি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সদ্য সমাপ্ত আইপিএলে ৭৭৬ রান করে অরেঞ্জ ক্যাপ জেতা এই কিশোর ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক অভিষেক ঘটাতে পারলে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী ক্রিকেটার হিসেবে মাঠে নামবেন। বর্তমানে সেই রেকর্ডটি রয়েছে শচিনের দখলে।

আয়ারল্যান্ড সফরের আগে সূর্যবংশী শ্রীলঙ্কায় ভারত ‘এ’ দলের হয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলবেন।

আগামী ২৬ ও ২৮ জুন বেলফাস্টে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলবে ভারত। এরপর ১ থেকে ১১ জুলাই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে অংশ নেবে দলটি।

বেলো হরিজোন্তের সেই ৭-১ : ব্রাজিলের নান্দনিক ফুটবলের ব্যবচ্ছেদ

ফুয়াদ হাসান
বেলো হরিজোন্তের সেই ৭-১ : ব্রাজিলের নান্দনিক ফুটবলের ব্যবচ্ছেদ
ছবি : রয়টার্স

২০১৪ সালের ৮ জুলাই, ব্রাজিলের বেলো হরিজোন্তে স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে তখন জ্বলজ্বল করছে এক অবিশ্বাস্য স্কোরলাইন ‘৭-১’। কিন্তু সেই রাতে সংখ্যাগুলো আসলে বড্ড অর্থহীন হয়ে পড়েছিল। যে জাতিটি যুগের পর যুগ ধরে ফুটবলের লাইফলাইন হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল, সেই রাতে তারা শুধু ম্যাচটিই হারেনি, হারিয়ে ফেলেছিল নিজেদের চিরচেনা অস্তিত্ব বা ফুটবলীয় পরিচয়।

ফুটবল দুনিয়ায় প্রচলিত হয়ে যায়, সেই অভিশপ্ত রাতেই নাকি ব্রাজিলের ফুটবলের মৃত্যু হয়েছিল। এই সান্ত্বনাটুকু শুনতে বেশ ভালোই লাগে। কারণ, এর মাধ্যমে একটা পুরো শতাব্দীর তিলে তিলে গড়ে ওঠা সাম্রাজ্যের পতনকে স্রেফ ৯০ মিনিটের একটা দুঃস্বপ্নের ফ্রেমে বন্দি করে ফেলা যায়। 

কিন্তু ইতিহাস কখনোই এত সহজ সমীকরণে চলে না। ব্রাজিল সেই রাতে হুট করে ভেঙে পড়েনি। এই ধস নামছিল বিগত কয়েক দশক ধরে, নীরবে-নিভৃতে। একটি মাত্র প্রতিপক্ষ এসে তাদের ধ্বংস করেনি, বরং সময়, ফুটবলীয় কাঠামো আর নিজেদের পরিবর্তনের স্রোতে ভেসে হারিয়ে গেছে তাদের চিরন্তন নির্যাস। 

জার্মানি সেদিন যা করেছিল, তা কোনো ধ্বংসলীলা ছিল না। ওটা ছিল আসলে একটা নির্মম সত্যের উন্মোচন বা ময়নাতদন্ত!

ব্রাজিলের এই পতনকে বুঝতে হলে, প্রথমে বুঝতে হবে ব্রাজিল আসলে কী ছিল। ব্রাজিল শুধু একটা সফল ফুটবল খেলুড়ে দেশ ছিল না, ব্রাজিল ছিল একটা দর্শন, একটা জাদুকরী ধারণা এবং ফুটবলের কঠোর ব্যাকরণের বিরুদ্ধে এক নান্দনিক বিদ্রোহ। 

১৯৫৮ সালে এক ১৭ বছর বয়সী কিশোর পেলে যখন বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হলেন, তিনি শুধু একজন বিস্ময়বালক হিসেবে আসেননি, এসেছিলেন ফুটবলের এক নতুন জাদুকরী ভাষার বার্তাবাহক হয়ে। 

১৯৭০ সালে এসে ব্রাজিল সেই ভাষাকে এক নিখুঁত রূপ দেয়। পেলে, জারজিনহো, গারসন আর কার্লোস আলবার্তো তোরেসের সেই দলটি শুধু বিশ্বকাপই জেতেনি, তারা বিশ্বকাপের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিল।

ফাইনালে ইতালির বিরুদ্ধে তাদের করা শেষ গোলটি কোনো ট্যাকটিক্যাল ছকের সাফল্য ছিল না, ওটা ছিল একটা দার্শনিক ঘোষণা। সে ঘোষণা বলেছে, ফুটবল শুধু কোনো খেলা নয়, ফুটবল হতে পারে এক জীবন্ত শিল্পকলা!

আরো পড়ুন
আর্জেন্টিনার ‘কলঙ্কিত ও পাতানো’ প্রথম বিশ্বকাপ জয়

আর্জেন্টিনার ‘কলঙ্কিত ও পাতানো’ প্রথম বিশ্বকাপ জয়

 

এটাই ছিল ‘জোগা বনিতো’ বা সুন্দর ফুটবল। কোনো করপোরেট ব্র্যান্ডিং বা বিজ্ঞাপনী স্লোগান হিসেবে নয়, ওটাই ছিল ব্রাজিলের বাস্তব জীবন। মাঠের তাৎক্ষণিক উদ্ভাবনী ক্ষমতা বা ইমপ্রোভাইজেশনকে তারা বানিয়েছিল নিজেদের মূল মন্ত্র; চারপাশের বিশৃঙ্খলাকে রূপ দিয়েছিল এক অদ্ভুত নান্দনিকতায়। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই ফুটবল কোনো একাডেমিতে শেখানো হতো না, এর জন্ম হতো সহজাতভাবে।

ব্রাজিলের এই ফুটবলীয় প্রতিভা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অবদান ছিল না; এটা ছিল তাদের চারপাশের পরিবেশের দান।

ফ্যাভেলা (বস্তির গলি) থেকে শুরু করে ধূলিধূসরিত মাটির মাঠে ফুটবল শেখানো হতো না, ফুটবল খেলে টিকে থাকতে হতো। রোনালদো নাজারিও কিংবা রোনালদিনহোর মতো জাদুকরেরা কোনো আধুনিক ফুটবল একাডেমির প্রডাক্ট ছিলেন না; তারা ছিলেন চরম অভাব আর সংকটের সৃষ্টি। সময়, জায়গা আর সুযোগ চরমভাবে সীমিত থাকা গলিগুলোতে সৃজনশীলতা কোনো শৌখিনতা ছিল না, ওটা ছিল টিকে থাকার একমাত্র হাতিয়ার।

আর এ কারণেই ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা অন্য সবার চেয়ে আলাদা হতেন। তারা স্রেফ ফুটবলের নিয়মের মধ্যে খেলতেন না, তারা নিয়মগুলোকে নিজেদের পায়ে নাচাতেন।

ফলে, তারা যখন ইউরোপের ফুটবলে পা রাখতেন, ততদিনে তারা একেকজন সম্পূর্ণ ফুটবলার। ইউরোপের ক্লাবগুলো তাদের গড়ে তোলেনি, বরং তাদের সেই সহজাত জাদুকে পুরো পৃথিবীর সামনে প্রদর্শনের একটা বড় মঞ্চ করে দিয়েছিল মাত্র।

২০০২ সালের বিশ্বকাপ ছিল ব্রাজিলের সেই সনাতন ঐতিহ্যের শেষ সুরলহরি বা ফাইনাল সিম্ফনি। রোনালদো নাজারিও একাই করলেন ৮ গোল, রোনালদিনহো ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পদার্থবিদ্যার সূত্রকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে করলেন সেই অবিশ্বাস্য গোল। মাঝমাঠ থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করা হত স্বর্গীয় ছন্দে।

ওটা স্রেফ একটা বিশ্বজয় ছিল না, ওটা ছিল একটা যুগের চরম শিখর। আর আজ পেছনে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, ওটাই ছিল সেই সুন্দর ফুটবলের শেষ অধ্যায়।

ফুটবলের এই অধঃপতন কখনো সাইরেন বাজিয়ে আসেনি। এটা এসেছিল ‘উন্নতি’ বা প্রোগ্রেসের ছদ্মবেশে। ২০০২ সালের পর ব্রাজিল যে হঠাৎ খুব খারাপ খেলতে শুরু করেছিল, তা কিন্তু নয়। তারা আসলে বদলে যাচ্ছিল। পরিবর্তনটা শুরুতে ছিল খুবই সূক্ষ্ম—গলির ফুটবল কমতে শুরু করল, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠল আধুনিক একাডেমি। সহজাত জাদুকরদের জায়গা দখল করতে শুরু করল ট্যাকটিশিয়ান বা ছকবাঁধা খেলোয়াড়েরা।

এই বদলটা যে শুধু ব্রাজিলের একার ছিল, তা নয়; এটা ছিল বৈশ্বিক ফুটবলের বিবর্তনের এক প্রতিফলন। সহজাত প্রবৃত্তির জায়গা দখল করল আধুনিক সিস্টেম বা কাঠামো। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের মতো লিগগুলো ইউরোপের ফুটবলকে রূপ দিল এক দক্ষ বিজ্ঞানে; যেখানে প্রেসিং, ট্রানজিশন আর পজিশনাল ডিসিপ্লিনই শেষ কথা।

ব্রাজিলও সেই স্রোতে গা ভাসাল, নিজেদের খাপ খাইয়ে নিল। কিন্তু এই আধুনিকায়নের খেরোখাতায় তারা হারিয়ে ফেলল নিজেদের আসল স্বাতন্ত্র্য।

আজকের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কিংবা রদ্রিগোরা নিঃসন্দেহে অসাধারণ খেলোয়াড়—গতির ঝড় তোলেন, প্রতিপক্ষকে চূর্ণ করেন এবং ইউরোপের সেরা এলিট ক্লাবের প্রাণভোমরা। কিন্তু তারা খুব ছোটবেলাতেই ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর ছকে বড় হয়েছেন। তারা বিশ্বমঞ্চে কোনো শৈল্পিক আত্মপ্রকাশের তাগিদ নিয়ে আসেন না। তারা আসেন একজন সুপ্রশিক্ষিত অ্যাথলেট হিসেবে, কোচের দেওয়া ছক নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করতে।

আজ পাইপলাইনটা উল্টো হয়ে গেছে। ব্রাজিল এখন আর পুরো বিশ্বে তাদের ফুটবলীয় ‘পরিচয়’ বা আইডেন্টিটি রপ্তানি করে না; তারা এখন স্রেফ ‘পটেনশিয়াল’ বা কাঁচা প্রতিভা রপ্তানি করে।

২০১৪ সালে জার্মানির মুখোমুখি হওয়ার আগেই ব্রাজিলের এই রূপান্তর সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল—শুধু কেউ সেটা মুখে স্বীকার করতে চায়নি। ব্রাজিল সেই টুর্নামেন্টে নেমেছিল এক প্রবল আবেগের ভেলায় চড়ে। নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ, ১৯৫০ সালের মারাকানাজোর দুঃখ ভোলার পণ, আর পোস্টার বয় নেইমারকে ঘিরে এক উগ্র উন্মাদনা। কিন্তু এই গ্ল্যামারাস আবহের নিচেই লুকিয়ে ছিল এক চরম ভঙ্গুর কঙ্কাল।

নেইমার যখন ইনজুরিতে পড়লেন আর থিয়াগো সিলভা কার্ডের খাড়ায় নিষিদ্ধ হলেন, ব্রাজিল শুধু দুজন খেলোয়াড়কেই হারায়নি; তারা হারিয়ে ফেলেছিল তাদের আবেগের শেষ নোঙরটুকু। মাঠে যা অবশিষ্ট ছিল, তা হলো—সহজাত তাড়নাহীন এগারোজন খেলোয়াড়, এমন এক রোবটিক সিস্টেম, যার কোনো নিজস্ব আত্মা ছিল না।

আধুনিক ফুটবলের নিখুঁত ও সুশৃঙ্খল বিজ্ঞানের প্রতীক জার্মানি সেদিন শুধু ব্রাজিলের ডিফেন্সের দুর্বলতাকে কাজে লাগায়নি; তারা আসলে পুরো বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছিল যে, এই ব্রাজিলের কোনো নিজস্ব ফুটবলীয় চরিত্রই আর বেঁচে নেই। 

মাত্র ১৮ মিনিটে হজম করা সেই ৫টি গোল কোনো ট্যাকটিক্যাল ব্যর্থতা ছিল না; ওটা ছিল একটা ফুটবল দর্শনের চিরতরে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ার জীবন্ত প্রমাণ।

২০১৪ সালের সেই ৭-১ যদি শুধু একটি দুর্ঘটনা হতো, তবে ইতিহাস নিজেকে শুধরে নিত। কিন্তু ইতিহাস তা করেনি। তার পরের গল্পগুলোও ছিল পতনেরই। ২০১৮ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের কাছে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায়। ২০২২ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হেরে আবার কোয়ার্টার থেকেই বিদায়। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কোনো ইউরোপীয় পরাশক্তিকে হারাতে পারেনি সেলেসাওরা! 

এটাকে আর যা-ই হোক, স্রেফ ‘দুর্ভাগ্য’ বলা চলে না। এটি একটি কাঠামোগত দীর্ঘমেয়াদি পতন। এমনকি লাতিন আমেরিকার মাঠেও তাদের সেই একচ্ছত্র আধিপত্য আজ আর নেই; একের পর এক ঐতিহাসিক হার, নিজেদের হারিয়ে ফেলা গ্ল্যামার আর প্রতিপক্ষের মন থেকে ব্রাজিলকে ঘিরে থাকা সেই চিরন্তন ভয়টা আজ উধাও। যে ব্রাজিল একসময় ছিল অনন্য, সাধারণের ঊর্ধ্বে; তারা আজ বড্ড সাধারণ, বড্ড চেনা এক দল।

ব্রাজিলের ফুটবলের এই পুরনো ঐতিহ্য বা গৌরব ফিরিয়ে আনার সব চেষ্টাই বারবার ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, বর্তমানের নীতিনির্ধারকেরা আসল সমস্যাটাই ধরতে পারছেন না। কোচেরা বারবার চেষ্টা করছেন দলে সেই পুরোনো সৃজনশীলতা, পজিশনাল ফ্রিডম বা নান্দনিক ছন্দ ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু তারা ভুলে গেছেন, ‘জোগা বনিতো’ কখনোই কোনো কোচের তৈরি করা সিস্টেম ছিল না, ওটা ছিল আস্ত একটা সংস্কৃতি। কোনো কম্পিউটারের সফটওয়্যারের মতো একে হুট করে ইন্সটল করা যায় না। 

যে খেলোয়াড়রা ছোটবেলা থেকে নিয়মের কঠোর শৃঙ্খলে বড় হয়েছেন, তাদের আপনি মাঠের ভেতরে গিয়ে বলতে পারেন না—‘যাও, গিয়ে মনের আনন্দে বিশৃঙ্খলা তৈরি করো!’ তারা সেটা পারবেন না।

এমনকি কার্লো আনচেলত্তির মতো আধুনিক ফুটবলের চতুর জাদুকরেরাও এই সমস্যার কোনো ট্যাকটিক্যাল সমাধান বের করতে হিমশিম খাচ্ছেন। কারণ, সমস্যাটা ট্যাকটিক্যাল নয়, সমস্যাটা জেনারেশনাল বা প্রজন্মগত। সেই পুরোনো সহজাত ফুটবলীয় ডিএনএ-টাই আজ ভ্যানিশ হয়ে গেছে।

ব্রাজিল আজো বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করছে না? অবশ্যই করছে। সমস্যাটা সেখানে নয়। আসল সমস্যা হলো, এই আধুনিক খেলোয়াড়দের খেলার ধরন, স্টাইল বা ফর্মেশন আর দশটা ইউরোপীয় খেলোয়াড়ের চেয়ে আলাদা করা যায় না। তারা ভীষণ কাজের, অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং শারীরিকভাবে শতভাগ ফিট।

কিন্তু ব্রাজিলের ফুটবল তো কখনোই শুধু ‘দক্ষ’ বা ‘কাজের’ হওয়ার জন্য জন্ম নেয়নি। ব্রাজিলের ফুটবল ছিল আনপ্রেডিক্টেবল বা অভাবনীয়। এই ধর্মই প্রতিপক্ষের সব ছক ভেঙে চুরমার করে দিত এক লহমায়।

তাহলে ব্রাজিলের ফুটবলের আসল ট্র্যাজেডিটা কোথায়? ট্র্যাজেডি এটা নয় যে ব্রাজিলের ফুটবল পিছিয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব ফুটবল শক্তিই বিবর্তিত হয়। আসল ট্র্যাজেডি হলো, ব্রাজিল বিবর্তিত হতে হতে এমন একটা জিনিসে রূপ নিয়েছে, যা আর কোনোভাবেই তাদের নিজেদের গৌরবময় অতীতকে প্রতিফলিত করে না। 

তারা আসলে বিশ্বের চেয়ে পিছিয়ে পড়েনি। তারা আসলে পুরো বিশ্বের মতোই সাধারণ হয়ে গেছে!

বেলু হরিজোন্তের সেই অভিশপ্ত রাতে জোগা বনিতোর মৃত্যু হয়নি। এর মৃত্যু হয়েছিল আরো অনেক আগে—যখন ব্রাজিলের সেই কাঁচা মাটির মাঠগুলোকে পিচ ঢালাই করে কংক্রিটের রাস্তা বানানো হয়েছিল। যখন ব্রাজিলের গলিগুলো শান্ত ও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যখন ফুটবলারদের সহজাত প্রবৃত্তির জায়গা দখল করেছিল কোচের কঠোর ডিক্টেশন বা নির্দেশনা।

সেই ৭-১ স্কোরলাইনটি কোনো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা জানাজা ছিল না। ওটা ছিল আসলে একটা লাশের ময়নাতদন্ত বা অটোপ্সি! আর সেই ময়নাতদন্তের রিপোর্টে যা বেরিয়ে এসেছিল, তা স্রেফ একটা ম্যাচের ব্যর্থতা ছিল না। ওটা ছিল একটা মহাকাব্যিক ফুটবলীয় দর্শনের চিরসমাপ্তি। যে দর্শন হয়তো আর কোনো দিন ফিরে আসবে না। 

তাদের সফল হতে হলে আধুনিক ফুটবলের কঠোর বিজ্ঞানের সঙ্গেই নিজেদের হারিয়ে যাওয়া আত্মার এক নতুন মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। চ্যালেঞ্জটা জোগা বনিতোকে কবর থেকে পুনরুত্থিত করা নয়, চ্যালেঞ্জটা হলো এই নতুন আধুনিক কাঠামোর ভেতরেই সেই পুরনো নান্দনিকতার স্পিরিটটাকে নতুন করে খুঁজে নেওয়া।

যত দিন না সেটা হচ্ছে, ব্রাজিল হয়তো আরো অনেক বিশ্বমানের বড় খেলোয়াড় উপহার দেবে। কিন্তু তারা হয়তো আর কখনোই ফুটবল মাঠে সেই হারিয়ে যাওয়া জাদু তৈরি করতে পারবে না!