ভারতের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোড়ন তোলা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) শত শত সমর্থক শনিবার প্রথমবারের মতো রাজধানী দিল্লিতে সমাবেশ করেছেন। অনলাইনে শুরু হওয়া এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন এবার বাস্তবে রাজপথে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সমর্থকরা ‘ককরোচরা আসছে, ধর্মেন্দ্র প্রধান যাচ্ছেন!’ স্লোগান দেন।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণকারীদের ভারতের জাতীয় পতাকা ও একটি বই সঙ্গে আনতে বলা হয়। তাদের ভাষ্য, বইটি শিক্ষা পাওয়ার অধিকার এবং সবার জন্য সমান সুযোগের প্রতীক।
এ ছাড়া বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন এবং পুলিশের সঙ্গে কোনো ধরনের সংঘাতে না জড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। শুক্রবার সিজেপির আনুষ্ঠানিক এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বার্তায় বলা হয়, ‘এবার এই ছোট্ট রসিকতাকে একটি আন্দোলনে পরিণত করার সময় এসেছে।’
মাত্র তিন সপ্তাহ আগে যাত্রা শুরু করলেও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) দ্রুতই অসন্তুষ্ট তরুণদের একটি আলোচিত প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। সংগঠনটির সমর্থকরা নিজেদের গর্বের সঙ্গে ‘ককরোচ’ বলে পরিচয় দেন।
আরো পড়ুন
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র বিক্ষোভ কর্মসূচি
নয়াদিল্লির জন্তর মন্তরে অনুষ্ঠিত এই বিক্ষোভকে সিজেপির প্রথম বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদ শিরোনামে আলোচনায় থাকা এই আন্দোলন ইতোমধ্যে লাখো তরুণের সমর্থন পেয়েছে। সংসদ ভবনের কাছাকাছি বিক্ষোভ এলাকায় শত শত তরুণ-তরুণী জড়ো হন। অনেকের হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড, আবার কেউ কেউ ককরোচের মুখোশ পরে অংশ নেন। তবে শেষ পর্যন্ত কত মানুষ সমাবেশে যোগ দেবেন, তা শুরুতে স্পষ্ট ছিল না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই কর্মসূচি সিজেপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কারণ সংগঠনটি দেখতে চায়, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের হতাশাকে তারা অনলাইন জনপ্রিয়তার বাইরে বাস্তব জনসমর্থনে রূপ দিতে পারে কি না।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে শনিবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে দিল্লিতে পৌঁছান এবং বিক্ষোভে অংশ নেন। তাকে ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। এ সময় দিল্লির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অতিরিক্ত ব্যারিকেডও স্থাপন করে পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় দিপকে জানান, পুলিশ সিজেপিকে বিক্ষোভের অনুমতি দিয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘ককরোচরা যন্তর মন্তরে জড়ো হচ্ছে।’
সিজেপি আয়োজকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে শনিবারের এই কর্মসূচিতে সমর্থকদের অংশ নিতে আহ্বান জানান। তাদের প্রধান দাবি হলো ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। গত মে মাসে একটি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই দাবি ওঠে। পরে বিষয়টি ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা, বেকারত্ব এবং তরুণদের সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়।
গত মে মাসে এক শুনানির সময় ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত কিছু সমালোচক ও বেকার তরুণকে ‘ককরোচ’-এর সঙ্গে তুলনা করলে তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সেই মন্তব্যকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ ও বোস্টন বিশ্ববিদ্যালযয়ের অভিজিৎ দীপকে একটি ব্যঙ্গধর্মী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সিজেপি গড়ে তোলেন।
ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট চালুর এক সপ্তাহের মধ্যেই সংগঠনটির ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ১ কোটি ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। সিজেপি ‘ককরোচ’ প্রতীকটিকে টিকে থাকার ক্ষমতা ও রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে। বেকারত্ব, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অকার্যকারিতা নিয়ে তৈরি তাদের ভিডিও, মিম ও ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট অনলাইনে কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছেছে।
সংগঠনটির বিভিন্ন সমর্থক অ্যাকাউন্টও ককরোচকে রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা মিম, ব্যঙ্গাত্মক নির্বাচনী স্লোগান এবং রাজনৈতিক মন্তব্যের মাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরছে। সিজেপির বার্তাগুলোতে আত্ম-বিদ্রূপমূলক হাস্যরসের সঙ্গে রাজনৈতিক সমালোচনার মিশেল দেখা যায়। সমর্থকেরা নিজেদের মজা করে ‘বেকার’, ‘সবসময় অনলাইনে থাকা’ এবং ‘প্রভাব বিস্তার থেকে বঞ্চিত’ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
তবে এই হাস্যরসের আড়ালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের প্রতি একটি বিস্তৃত সমালোচনাও রয়েছে। সিজেপি সমর্থকদের দাবি, সাধারণ ভারতীয়রা, বিশেষ করে তরুণরা, আগের তুলনায় কম সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ভারতের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি তরুণ। কিন্তু তাদের অনেকেই সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ, বাড়তে থাকা বেকারত্ব এবং প্রচলিত রাজনীতির প্রতি হতাশার মুখোমুখি হচ্ছেন।
অনেক তরুণ ভোটার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বতন্ত্র ভারতীয় জনতা পার্টির(বিজেপি) সমালোচনা করেন। তাদের অভিযোগ, দেশে ধর্মীয় মেরুকরণ বেড়েছে, অর্থনৈতিক বৈষম্য বিস্তৃত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে। তবে সিজেপির উত্থান নিয়ে সবাই একমত নন। বিশেষ করে বিজেপি-সমর্থক অনেকেই এই আন্দোলনকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক একটি সাময়িক প্রচারণা বা ‘গিমিক’ বলে মনে করেন।
তাদের দাবি, অনলাইনে বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়া মানেই বাস্তবে বড় ধরনের জনসমর্থন পাওয়া নয়। সিজেপির দ্রুত উত্থান যতটা আলোচিত হয়েছে, তত দ্রুতই এর জনপ্রিয়তা কমে যেতে পারে বলেও তারা মনে করেন।
ফলে দিল্লির রাজপথে সিজেপির প্রথম বড় সমাবেশকে অনেকেই আন্দোলনটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন। এই কর্মসূচির মাধ্যমে বোঝা যাবে, সংগঠনটি অনলাইন জনপ্রিয়তাকে বাস্তব জনসমর্থন ও রাজনৈতিক প্রভাবে রূপ দিতে পারে কি না।
বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপির উত্থান দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা একটি বড় প্রবণতার সঙ্গে মিল রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে জন্ম নেওয়া তরুণদের আন্দোলন ইতোমধ্যে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপালের বিভিন্ন সরকারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তবে সিজেপির সামনে এখনও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গত এক দশকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে হওয়া বিভিন্ন বিক্ষোভ দমনে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর মধ্যে বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলন এবং এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা কৃষক আন্দোলনের মতো বড় বিক্ষোভও ছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন আন্দোলনের আয়োজকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং কর্মীদের গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে।
সমালোচকদের দাবি, এসব পদক্ষেপ সরকারের সমালোচনা ও ভিন্নমত দমনের একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। এমন পরিস্থিতিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অনলাইন জনপ্রিয়তাকে দীর্ঘমেয়াদি ও সংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া এবং সম্ভাব্য প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবেলা করা।