kalerkantho

সোমবার । ২৩ চৈত্র ১৪২৬। ৬ এপ্রিল ২০২০। ১১ শাবান ১৪৪১

পাপমুক্ত জীবনের প্রত্যাশা

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পাপমুক্ত জীবনের প্রত্যাশা

ঈমান ও আনুগত্যে ভরপুর জীবন যেমন মুমিনের কাছে মহান আল্লাহর প্রত্যাশা, তেমনি তার কাছে পাপমুক্ত নিষ্কলুষ জীবনেরও প্রত্যাশা করেন মহান প্রভু। মুমিনের জীবন হবে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরনের পাপমুক্ত। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য পাপ বর্জন কর। যারা পাপ করে তাদেরকে অচিরেই তাদের পাপের সমুচিত শাস্তি দেওয়া হবে।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ১২০)

 

কেউ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়

নিজেকে ভুল-ত্রুটি ও পাপের ঊর্ধ্বে মনে করা আল্লাহ অপছন্দ করেন। যদিও তার বাস্তব জীবনে সে পাপ পরিহার করে চলে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনি কি তাদের দেখেন না যারা নিজেরাই নিজেদেরকে পবিত্র দাবি করে? বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছে পবিত্র করেন। তাদের ওপর সামান্য পরিমাণও জুলুম করেন না।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৪৯)

 

পাপমুক্ত হতে চাই আল্লাহর অনুগ্রহ

মানব প্রকৃতিতে পাপের প্রবণতা রয়েছে। সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতাও মানুষকে পাপে উৎসাহিত করে। তাই আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ছাড়া কেউ পাপের পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হতে পারবে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-এর ভাষ্যে মানুষের অক্ষমতা ও তাঁর অনুগ্রহের কথা বর্ণনা করেছেন এভাবে—‘আমি নিজেকে নির্দোষ বলি না। নিশ্চয়ই মানুষের মন মন্দ কাজপ্রবণ, কিন্তু সে নয় যার প্রতি তার প্রতিপালক দয়া করেন। নিশ্চয়ই আমার পালনকর্তা ক্ষমাশীল, দয়ালু। (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৫৩)

 

যেসব আমল পাপমুক্ত থাকতে সহায়ক

ভালো কাজের চর্চা মানুষকে মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখে। তাই ইসলাম ধর্মে মানুষকে বেশি বেশি নেক আমল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সব পুণ্যের কাজই পাপ থেকে বিরত থাকার শক্তি জোগায়। তবে বিশেষজ্ঞ আলেমরা বিশেষ কিছু আমলের কথা বলেন—যা মানুষকে পাপ থেকে বেঁচে থাকতে বেশি সহায়তা করে। তার কয়েকটি হলো :

১. আল্লাহকে ভয় করা : আল্লাহর ভয় বা তাকওয়ার অর্থ নিজের ভেতর এই বিশ্বাস জাগ্রত করা যে আমি যা করছি তার সব কিছু আল্লাহ দেখছেন এবং কোনো কিছুই তার দৃষ্টির আড়ালে নয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে তাকওয়া অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় কর এবং মুসলিম (আল্লাহর অনুগত) না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১০২)

২. নামাজ আদায় করা : নামাজ মুমিন বান্দাকে পাপ থেকে বিরত রাখে। যথাযথভাবে নামাজ আদায় করলে ব্যক্তির মন থেকে পাপ ইচ্ছা দূর হয়। আল্লাহ বলেন, ‘নামাজ কায়েম কর। নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত : ১৪৫)

৩. দৃষ্টি সংযত রাখা : অসৎ ও অসংযত দৃষ্টি মানুষের কুপ্রবৃত্তি জাগিয়ে দেয়। পবিত্র কোরআনেও মুমিন নর-নারীকে দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘মুমিনদের বলুন! তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটা তাদের জন্য পবিত্রতর। নিশ্চয়ই তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবগত।’ (সুরা নুর, আয়াত : ৩০)

৪. আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা : ক্ষমা প্রার্থনা আল্লাহর প্রিয় আমল। কোনো বান্দা যখন আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তখন আল্লাহ অত্যন্ত খুশি হন। ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ ক্ষমা করেন এবং জীবনের সংকীর্ণতা দূর করে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের জন্য ‘ইস্তিগফার’ (ক্ষমা প্রার্থনা) আবশ্যক করে নেবে, আল্লাহ তাকে সব দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেবেন, সব সংকীর্ণতা থেকে উদ্ধার করবেন এবং তাকে এমনভাবে জীবিকার ব্যবস্থা করবেন যা তার চিন্তার বাইরে।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৩৮১৯)

৫. বাহ্যিক পবিত্রতা রক্ষা করা : বাহ্যিক পবিত্রতা মানুষকে আত্মিক পবিত্রতা অর্জনে সহায়ক। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীকে পছন্দ করেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীকে ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২২২)

বিশেষজ্ঞ আলেমরা বলেন, এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় মানুষের বাহ্যিক পবিত্রতার সঙ্গে আত্মিক পবিত্রতার সম্পর্ক রয়েছে। ফলে উভয়টির ব্যাপারে ‘ভালোবাসেন’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।

৬. মন্দ কাজের প্রতি ঘৃণা জাগ্রত করা : আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে পাপের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘কাউকে যদি তার মন্দ কাজকে সুশোভিত করে দেখানো হয় এবং সে তাকে ভালো মনে করে, সে কি তার সমান যে ভালো কাজ করে?’ (সুরা ফাতির, আয়াত : ৮)

৭. পরকালকে স্মরণ করা : পরকালের স্মরণ মানুষকে পাপ থেকে বিরত রাখে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পরকালের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে অসৎ কাজ নিয়ে আসবে, তাকে অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং তাদের বলা হবে, তোমরা যা করতে কেবল তারই প্রতিদান তোমাদের দেওয়া হচ্ছে।’ (সুরা নামল, আয়াত : ৯০)

৮. পাপমুক্ত জীবনের প্রার্থনা করা : সব নবী ও রাসুল (আ.) ছিলেন পাপ-পঙ্কিলতার ঊর্ধ্বে। তার পরও রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার ও আমার পাপগুলোর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে দিন, যেমন দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে। হে আল্লাহ! আমাকে গুনাহ এমনভাবে পরিষ্কার করে দেন, যেমন সাদা কাপড় ধুলে পরিষ্কার হয়। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আমার পাপগুলো থেকে ধুয়ে (পবিত্র করুন) দিন। পবিত্র করুন বরফ, পানি ও শিশির দ্বারা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৪৪)

লেখক : প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (সিসি), বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনিস্টিটিউট, ঢাকা।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা