kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

পরমতসহিষ্ণুতা সুষ্ঠু সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত

ডঃ আ ফ ম খালিদ হোসেন   

১২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পরমতসহিষ্ণুতা সুষ্ঠু সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত

অপরের মত, পরামর্শ, ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাসের প্রতি ইসলাম সব সময় শ্রদ্ধাশীল। গঠনমূলক সমালোচনাকে সে স্বাগত জানায়। কারণ মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে সুষ্ঠু সমাজ গঠন ও পরিচালনা করা অসম্ভব। সহিষ্ণুতা মানবিক গুণাবলির মধ্যে শ্রেষ্ঠতম এবং সামাজিক মূল্যবোধ নির্মাণে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বুনিয়াদ। অপরের কথা, বক্তব্য, মতামত, পরামর্শ ও জীবনাচার সহ্য করার মতো ধৈর্য যদি মানুষের মধ্যে না থাকে, তা সমাজে নৈরাজ্য, উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে বাধ্য। পবিত্র কোরআনে সহিষ্ণুতার মহৎ গুণটি অর্জনে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। মহানবী মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর মহান সাহাবিরা পরের মতামত ও বিশ্বাসের প্রতি নমনীয় ও সহানুভূতিপ্রবণ ছিলেন—ইতিহাসে তার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে।

মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ইসলাম উৎসাহী করেছে, তবে তাকে বল্গাহীন করেনি। কারণ কোনো উগ্র মতামত ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য যদি অপরাপর দল, জাতি, গোষ্ঠী ও ধর্মের অনুভূতিকে আহত করে অথবা সমাজে বিশৃঙ্খলা জন্ম দেয়, তাহলে তা বর্জনীয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা সত্যের আদেশ দেয় এবং অন্যায় থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা : তওবা, আয়াত : ১০৪)

উপর্যুক্ত গুণ মত প্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া সৃষ্টি হতে পারে না। আয়াত থেকে আরো বোঝা যায়, একজন মুসলমান মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে শুধু সত্য ও কল্যাণের বিকাশে ব্যবহার করবে। অসত্য ও অন্যায় প্রচারে তা ব্যবহার করবে না। কোরআনে বনি ইসরাইলের পতনের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ‘তারা যেসব গর্হিত কাজ করত তা থেকে তারা একে অন্যকে বারণ করত না। তারা যা করত তা কতই না নিকৃষ্ট।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৭৯)

সাধারণ অবস্থায় ইসলাম দোষচর্চা ও সমালোচনা পছন্দ করে না। তবে কোনো সমাজের অধিপতি বা শাসক যদি মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত, মানুষের অধিকার নষ্ট করে এবং বৃহত্তর স্বার্থ তার দ্বারা ক্ষুণ্ন হয়, তখন ইসলাম তাদের সমালোচনা করার অনুমতি দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘মন্দ কথার প্রচারণা আল্লাহ পছন্দ করেন না, তবে যার ওপর জুলুম করা হয়েছে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৪৮)

ইতিহাস সাক্ষী, মদিনার ইসলামী রাষ্ট্রের জনগণ নির্বিঘ্ন ও নির্ভয়ে মহানবী (সাঃ) ও চার পুণ্যবান খলিফার সামনে তাঁদের মতামত ব্যক্ত করতে পারতেন। মহানবী (সাঃ)-এর অভ্যাস ছিল বিভিন্ন বিষয়ে তিনি সাহাবায়ে কেরামের মতামত নিতেন এবং মত প্রকাশে উৎসাহী করতেন। জোবায়ের (রাঃ) ও এক আনসারির মধ্যে সৃষ্ট বিরোধের এক মামলা বিশ্বনবী (সাঃ)-এর আদালতে এলে তিনি জোবায়ের (রাঃ)-এর অনুকূলে রায় দেন। কিন্তু ক্ষুব্ধ আনসারি মন্তব্য করেন, ‘আপনি ফুফাতো ভাইয়ের পক্ষে রায় দিলেন।’ এটা ছিল বিশ্বনবীর (সাঃ) সততা ও ন্যায় ইনসাফের প্রতি চ্যালেঞ্জ। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাকে ক্ষমা করে দেন। ভিন্নমতের জন্য কোনো শাস্তি দেননি।

ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রাঃ) জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাকে অনুসরণ কোরো যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অনুসরণ করি। যদি আমি বিভ্রান্তির পথে পরিচালিত হই, তবে তোমরা আমাকে সঠিক পথের দিশা দেবে।’ ওমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) ক্ষমতায় থাকাকালীন একদিন জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি যদি ভুল পথে পরিচালিত হই, তখন তোমরা কী করবে?’ একজন বলল, ‘এই তলোয়ার দিয়ে সোজা পথে নিয়ে আসব।’ পরমতসহিষ্ণুতার এই উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে দুনিয়াবাসী অভিভূত হয়েছে।

পথ চলার সময় এক মহিলা ওমর (রাঃ)-কে বলে, ওমর! তোমার এই অবস্থার জন্য আফসোস! আমি তোমার পূর্বের অবস্থা দেখেছি, যখন তুমি লাঠি হাতে ওকাজ প্রান্তরে ছাগল চড়াতে। আজ তোমার এই অবস্থাও দেখছি যখন মানুষ তোমাকে ‘আমিরুল মুমিনিন’ নামে সম্বোধন করে। জনগণের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। ...জার আবদি, যিনি ওমর (রাঃ)-এর সঙ্গে ছিলেন, মহিলার এই কথা শুনে বলেন, আপনি ‘আমিরুল মুমিনিনে’র সঙ্গে বাড়াবাড়ি করলেন। ওমর (রাঃ) তাকে বাধা দিয়ে বলেন, মহিলা যা বলতে চান নির্দ্বিধায় তাঁকে বলতে দাও। তুমি হয়তো জানো না ইনি হচ্ছেন খাওলা বিনতি সালাবা—যাঁর কথা সপ্ত আকাশের ওপরে স্বয়ং আল্লাহ শোনেন, সেখানে আমি ওমর কী ছাই যে তাঁর কথা শুনব না।’ (আমীন আহসান ইসলাহী, ইসলামী রিয়াসাত, পৃষ্ঠা. ৬২)

ওয়াসাক রুমি নামের এক খ্রিস্টান দাস বহু বছর ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রাঃ)-এর কাছে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি ওমর ইবনে খাত্তাবের ক্রীতদাস ছিলাম। তিনি আমাকে বলতেন, মুসলমান হয়ে যাও, যদি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করো, তবে আমি তোমাকে মুসলমানের আমানতদারির কোনো দায়িত্ব অর্পণ করব। কিন্তু আমি ইসলাম গ্রহণ করিনি। এতে ওমর বলেন, ‘লা ইকরাহা ফিদ্দিন’ (ধর্মের ব্যাপারে জোরজবরদস্তি নেই) মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি আমাকে মুক্ত করে দেন এবং বলেন, তোমার যেখানে ইচ্ছা সেখানে চলে যেতে পারো।’ (আবু উবাইদ, কিতাবুল আওয়াল, পৃষ্ঠা. ১৫৪)

ধর্ম বিশ্বাস ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা হচ্ছে নাগরিক অধিকার। আলী (রাঃ)-এর খেলাফতের সময় খারিজি সম্প্রদায় আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমান সময়ের নৈরাজ্যবাদী (Nihilist) দলগুলোর সঙ্গে তাদের অনেকটা মিল ছিল। প্রকাশ্যে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অস্বীকার করত, মতাদর্শের প্রচার করত এবং অস্ত্র বলে অস্তিত্ব বিলোপে তারা ছিল বদ্ধপরিকর। আলী (রাঃ) তাদের কাছে নিম্নোক্ত বার্তা পাঠান, ‘তোমরা যেখানে ইচ্ছা বসবাস করতে পারো। তোমাদের ও আমাদের মাঝে এই চুক্তি রইল যে তোমরা রক্তপাত করবে না, ডাকাতি করবে না এবং কারো ওপর জুলুম করবে না, তোমরা যতক্ষণ বিপর্যয় ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা তোমাদের আক্রমণ করব না।’ (নায়লুল আওতার, খণ্ড-৭, পৃষ্ঠা. ১৩০-৩৩)

এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে কোনো দলের মতবাদ যা-ই হোক না কেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের মত প্রকাশে বাধা দেওয়া যাবে না। তারা যদি নিজেদের মতো শক্তি প্রয়োগ (By violent means) বাস্তবায়িত করতে এবং রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা চূর্ণবিচূর্ণ করার চেষ্টা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মত প্রকাশে স্বাধীনতার প্রশ্নে ইসলাম সব সময় সহিষ্ণু মনোভাব প্রদর্শন করেছে। কারণ সহনশীলতার অভাবে মত প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হলে সুষ্ঠু সমাজ বিকাশের পথ বন্ধ হয়ে যায়। চিন্তা ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা সুধীসমাজের ও সভ্যজীবনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি মানুষের সহজাত অধিকার (Natural Rights)।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ওমর গণি এমইএস ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা