তাদের আক্রমণভাগ নিয়ে চিন্তা করলেও কাঁপুনি উঠে যায় সব প্রতিপক্ষের। অথচ সেই দলটিকেই কি না অকার্যকর করে দিল স্পেনের রক্ষণভাগ এবং গোলরক্ষক উনাই সিমন। লা রোজাদের রক্ষণে বারবার প্রবেশ করেও সফল হতে পারলেন না কিলিয়ান এমবাপ্পে, ব্র্যাডলি বারকোলা আর উসমান দেম্বেলেরা। কিন্তু ঠিকই ছন্দোময় ফুটবলে ফরাসিদের রক্ষণ চিড়ে দুটি গোল আদায় করে ফাইনালে উঠে গেল স্পেন। টানা তৃতীয়বার বড় কোনো আসরের সেমিতে তাদের কাছে হারল ফ্রান্স। গতকাল মঙ্গলবার ডালাসে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ১৬ বছর পর লা রোজারা পৌঁছুল আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে। আর টানা তৃতীয়বার ফাইনালে ওঠার সুযোগ হাতছাড়া করল গত আসরের রানার্স আপ লেস ব্লুজ। সর্বশেষ যে চারবার বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে খেলেছে ফ্রান্স, প্রতিবারই উঠেছে ফাইনালে। কিন্তু তাদের বিপক্ষে বড় আসরে সেমি জেতার দারুণ রেকর্ডটাকে তিনে নিয়ে গেল লা রোজারা।
শেষ চারের এই ম্যাচটি ঘিরে অনেক সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ঘেঁটে বোঝা যাচ্ছিল হতে যাচ্ছে জমজমাট লড়াই। বিধ্বংসী আক্রমণের বিপক্ষে জমাট রক্ষণ আর সিমনের মতো বিশ্বকাপে রেকর্ড ৬৫০ মিনিট গোল হজম না করা গোলরক্ষকের সাক্ষাৎ। এ কারণেই স্পেন চলতি বিশ্বকাপে আগের ছয় ম্যাচে হজম করেছে মাত্র একটি গোল। তবে গত বছর নেশন্স লিগ এবং সবশেষ ইউরোতে (২০২৪) সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হারের প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিজ্ঞায় নামে ফ্রান্সের গতিময় আক্রমণভাগ। ম্যাচের শুরুর দিকে কিছু সুযোগও তৈরি করে ফরাসিরা, আক্রমণের ধারও ছিল বেশি। কিন্তু লা রোজাদের রক্ষণভাগের দৃঢ়তা ও সিমনের দক্ষতায় গোল পাননি বারকোলা, দেম্বেলেরা। উল্টো ২১ মিনিটের সময় স্পেনের আক্রমণে ডি-বক্সে লামিন ইয়ামাল ফাউলের শিকার হলে সরাসরি পেনাল্টি দেন রেফারি। ভিএআর বিশ্লেষণেও বহাল থাকে সেটি। ২২ মিনিটের সময় স্পট কিকে গোল করে স্পেনকে এগিয়ে নেন (১-০) মিকেল ওয়াইরসাবাল। এরপর যেন দুর্দশা বাড়ে ফরাসিদের, হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি নিয়ে ২৯ মিনিটে উইলিয়াম সালিবাকে মাঠ ছাড়তে হয়। ৩৭ ও ৩৮ মিনিটে পরপর দুটি সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি স্পেনের পেদ্রো পোরো ও ফাবিয়ান রুইজ। এরপর আর গোল পায়নি কোনো দলই।
সবমিলিয়ে প্রথমার্ধে ফ্রান্স চারটি ও স্পেন পাঁচটি গোলের সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকেই মাঠ ছাড়ে স্পেন। প্রথমার্ধে পিছিয়ে থাকার পরও বিশ্বকাপে শেষ চারে জিতেছে ১৯৯০ সালে ইতালির বিপক্ষে আর্জেন্টিনা এবং ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ক্রোয়েশিয়া। সে দুটি ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশায় দ্বিতীয়ার্ধে নামে ফরাসিরা। কিন্তু লা রোজার সুশৃঙ্খল রক্ষণভাগে ব্যর্থ হয়েছেন এমবাপ্পে, দেম্বেলেরা আগের মতোই। উল্টো ৫৮ মিনিটে দানি ওলমোর কাছ থেকে বল পেয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন স্পেনের ডিফেন্ডার পেদ্রো পোরো (২-০)। ৬১ মিনিটে ইয়ামালের আরেকটি গোল বাতিল হয় অফসাইডে। মাঝমাঠের দখলটা ধরে রাখে স্পেন এবং সে কারণেই ফরাসি আক্রমণভাগ ভয়ংকর কোনো আক্রমণ করে সাফল্য আদায় করতে পারেনি। বেশ কয়েকবার তারা জোর চেষ্টা করেছে, তবে স্পেনের জমাট রক্ষণব্যূহ ভেদ করে গোলের নিশানা খুঁজে পাননি এমবাপ্পেরা। শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলের জয়ে ২০১০ সালের পর আবার ফাইনালে উঠে যায় লা রোজারা।
চলতি আসরে মাত্র একটি গোল হজম করা স্পেন ১৬ বছর আগে একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের আসরেও হজম করেছিল মাত্র দুটি গোল। এবারও তারা যেভাবে ফাইনালে উঠেছে তাতে আরেকটি গৌরব অর্জনের পথে এক পা এগিয়েই থাকল তারা। সেই সঙ্গে এই ম্যাচ জিতে ইতালির রেকর্ড ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ডেও ভাগ বসাল স্পেন। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেনের সেমির রেকর্ডও ফ্রান্সের বিপক্ষে বেশ ভালোই। অনূর্ধ্ব-১৯ ও ২১ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ এবং জাতীয় দলের ২০২৪ ইউরোতে ও নেশন্স লিগের সেমিতে ফ্রান্সকে হারিয়েছে তাঁর শিষ্যরা। সবমিলিয়ে সর্বশেষ পাঁচ ম্যাচের তিনটিতে স্পেনের এবং দুটিতে আছে ফ্রান্সের জয়। সেটি ধরে রেখে বড় আসরে দেশমের দলের বিপক্ষে টানা তিনটি সেমি (আগের দুটি ইউরো, নেশন্স লিগসহ) জিতল ফুয়েন্তের শিষ্যরা।
পরাজয়ের ক্ষত শুকানোর দৃঢ়সংকল্প নিয়ে দেশম কোচ হিসেবে রেকর্ড ২৬তম বিশ্বকাপ ম্যাচে নেমেও পেলেন না সুখের পরশ। পশ্চিম জার্মানি (১৯৮২, ১৯৮৬ ও ১৯৯০) এবং ব্রাজিলের (১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০২) পর টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার রেকর্ডটাও ছোঁয়া হলো না তাদের। এবার সেমিতে উঠেই ফরাসি দল টানা তিন বিশ্বকাপের সেমি খেলার রেকর্ডও গড়েছিল। সেখানেই থেমে গেল তারা। অথচ ১৯৫৮, ১৯৮২ ও ১৯৮৬ সালে সেমি থেকে বিদায় নেওয়া ফ্রান্স আর কখনোই বিশ্বকাপে শেষ চারের ম্যাচে হারেনি। ১৯৯৮, ২০০৬, ২০১৮ ও ২০২২ সালে তারা সেমিতে জিতে পা রাখে ফাইনালে। কিন্তু তাদের প্রবল শত্রুতে পরিণত হওয়া স্পেন যখন প্রতিপক্ষ, তখন আর সেই রেকর্ড থাকে কি করে!




