বাংলা ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধপ্রয়োগ
অপপ্রয়োগ
বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত কিছু শব্দ ব্যাকরণের নিয়মে অশুদ্ধ, তবে বহুল প্রচলিত, সেগুলোর ব্যবহারকে অপপ্রয়োগ বলা হয়ে থাকে।
যেমন : ‘সখ্যতা’ শব্দটিতে প্রত্যয়ের অপপ্রয়োগ হয়েছে; শুদ্ধ প্রয়োগটি হবে ‘সখ্য’।
মূলত তিনটি কারণে ভাষার অপপ্রয়োগ ঘটে থাকে।
ক. উচ্চারণজনিত কারণ
খ. শব্দ গঠনজনিত কারণ
গ. অর্থগত বিভ্রান্তিজনিত কারণ।
ক. উচ্চারণজনিত কারণ : আঞ্চলিক ভাষার উচ্চারণের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে না পারার ফলে এবং দীর্ঘদিন ধরে শব্দগুলোর উচ্চারণে অসতর্কতার কারণে বানানে অশুদ্ধি ঘটে থাকে।
যেমন : অনাটন (শুদ্ধ : অনটন)
উত্ত্যাক্ত (শুদ্ধ : উত্ত্যক্ত)।
খ. শব্দ গঠনজনিত কারণ : শব্দের গঠনরীতি ব্যাকরণসম্মতভাবে অনুসরণ না করার কারণেও অপপ্রয়োগ ঘটে থাকে।
যেমন : ‘অপকর্ষতা’ ও ‘উৎকর্ষতা’ শব্দ দুটিতে প্রত্যয়ের অপপ্রয়োগ ঘটেছে।
গ. অর্থগত বিভ্রান্তিজনিত কারণ : শব্দের অর্থ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকার কারণেও প্রয়োগবিভ্রান্তি ঘটে থাকে। এ বিভ্রান্তির ফলে বাক্যে ভুল শব্দ ব্যবহৃত হয়। যেমন : অবদান (কীর্তি), অবধান (মনোযোগ) ইত্যাদি।
বাক্যে পদের অপপ্রয়োগ
বাক্যে পদের অপপ্রয়োগও ঘটে। যেমন—
ক. বহুবচনের অপপ্রয়োগজনিত ভুল
অনেক সময় বিশেষণ পদ বহুবচনের কাজ করে। এসব ক্ষেত্রে মূল শব্দটিকে আবার বহুবচন করলে বাহুল্যদোষ ঘটে।
উদাহরণ
অপপ্রয়োগ : সকল আলেমগণ উপস্থিত
আছেন।
শুদ্ধ বাক্য : সকল আলেম উপস্থিত আছেন।
অপপ্রয়োগ : সমুদয় প্রাণীরাই সমাজবদ্ধ থাকে।
শুদ্ধ বাক্য : সমুদয় প্রাণীই সমাজবদ্ধ থাকে।
খ. যথার্থ শব্দ প্রয়োগ না করার ভুল
শব্দের যথাযথ অর্থ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না থাকার কারণে অনেক সময় প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভুল হয়।
উদাহরণ
অপপ্রয়োগ : তিনি স্বস্ত্রীক এসেছিলেন।
শুদ্ধ বাক্য : তিনি সস্ত্রীক এসেছিলেন।
অপপ্রয়োগ : ছেলেটি ভয়ানক মেধাবী।
শুদ্ধ বাক্য : ছেলেটি অত্যন্ত মেধাবী।
গ. বিশেষ্য স্থানে বিশেষণের প্রয়োগজনিত ভুল
বাক্যে বিশেষণকে বিশেষ্য ভেবে প্রয়োগ করায় এ ধরনের ভুল হয়।
উদাহরণ
অপপ্রয়োগ : এর আবশ্যক নেই।
শুদ্ধ বাক্য : এর আবশ্যকতা নেই।
অপপ্রয়োগ : সদাসর্বদা তোমার মুখটা দেখতে চাই।
শুদ্ধ বাক্য : সর্বদা তোমার মুখটা দেখতে চাই।
ঘ. প্রবাদ-প্রবচনের বিকৃতিজনিত ভুল
প্রবাদ-প্রবচনের বিকৃত প্রয়োগ অনেক সময় মূলের অর্থ বদলে দেয়। তাই প্রবাদ-প্রবচন হুবহু ব্যবহার না করলে অশুদ্ধ বলে বিবেচিত হয়।
উদাহরণ
অপপ্রয়োগ : যেমন বুনো কচু তেমনি বাঘা তেঁতুল।
শুদ্ধ বাক্য : যেমন বুনো ওল তেমনি বাঘা তেঁতুল।
অপপ্রয়োগ : দশচক্রে ঈশ্বর ভূত।
শুদ্ধ বাক্য : দশচক্রে ভগবান ভূত।
ঙ. লিঙ্গ-সংগতিজনিত ভুল
বাংলা সাধু ভাষায় এবং কখনো কখনো তৎসম শব্দবহুল চলিত গদ্যরীতিতে স্ত্রীবাচক বিশেষণের ব্যবহার সংগত। যেমন : সুন্দরী বালিকা, বীরাঙ্গনা নারী। এমন ক্ষেত্রে স্ত্রীবাচক শব্দের জন্য স্ত্রীবাচক বিশেষণ ব্যবহার না করলে তা ব্যাকরণ অনুসারে অশুদ্ধ বলে গণ্য হয়।
উদাহরণ
অপপ্রয়োগ : আজ সরকার বাবুর জ্যেষ্ঠ কন্যার বিবাহ।
শুদ্ধ বাক্য : আজ সরকার বাবুর জ্যেষ্ঠা কন্যার বিবাহ।
অপপ্রয়োগ : বর্তমানে বিদ্বান মহিলা সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য।
শুদ্ধ বাক্য : বর্তমানে বিদুষী মহিলা সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য।
চ. বিশেষণের প্রয়োগজনিত ভুল
বিশেষণকে বিশেষ্য ভেবে পুনরায় বিশেষণ করতে গিয়ে কিছু ভুল হয়। আবার বিশেষণ ভেবে বিশেষ্য শব্দের প্রয়োগও অশুদ্ধ বলে বিবেচিত হয়।
উদাহরণ
অপপ্রয়োগ : দুষ্কৃতিকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
শুদ্ধ বাক্য : দুষ্কৃতকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
অপপ্রয়োগ : আপনার সঙ্গে গোপন পরামর্শ আছে।
শুদ্ধ বাক্য : আপনার সঙ্গে গোপনীয় পরামর্শ আছে।
জিয়াউল হাসান সবুজ



