অবশেষে গ্রেপ্তার হয়েছেন বহুল আলোচিত এবং একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী আইজিপি (পুলিশের মহাপরিদর্শক) বেনজীর আহমেদ। রাজধানীসহ সারা দেশে তাঁর ও তাঁর পরিবারের শত শত কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও তাঁর বহু সম্পদ রয়েছে বলে জানা যায়। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থপাচার, পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ নানা অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে বলে জানা যায়। সপ্তাহখানেক আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে পাঠানো একটি ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানায়। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
সর্বপ্রথম কালের কণ্ঠই শুরু করে এই মহাপ্রতাপশালী আইজিপির বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে তথ্যানুসন্ধান। তখনো আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। এ কাজে গ্রেপ্তার, হেনস্তা, এমনকি গুম হওয়ারও ভয় ছিল। কিন্তু কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানী টিমের সাহসী সাংবাদিকরা সেসব ভয়কে তুচ্ছ করে সারা দেশে ঘুরে বেনজীরের অঢেল সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করেন। অবশেষে ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ প্রকাশিত হয় ‘বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ’ শিরোনামে মূল প্রতিবেদনসহ চারটি প্রতিবেদন। এর মধ্যে ছিল ‘মেয়ের বিশ্রামের জন্য সাড়ে তিন কোটি টাকার ফ্ল্যাট’ এবং ‘বেনজীরের বৈধ আয় কত ছিল’ শিরোনামে দুটি সাইড স্টোরি। ২ এপ্রিল প্রকাশিত হয় ‘বনের জমিতে বেনজীরের রিসোর্ট’ শিরোনামে মূল প্রতিবেদন এবং সাইড স্টোরি হিসেবে প্রকাশিত হয় ‘সেন্ট মার্টিন-কক্সবাজারেও ভূ-সম্পত্তি’। মূলত এর পরই ওই বছরের ১৮ এপ্রিল বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আওয়ামী লীগ সরকার উত্খাতের পর তাঁর বিরুদ্ধে আরো মামলা হয়। দেশ ছেড়ে যাওয়া বেনজীরকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হয়। এরই ভিত্তিতে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
দুর্নীতি ও অর্থপাচারের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। কিন্তু আওয়ামী শাসনামলের ১৭ বছরে তা সব সীমা ছাড়িয়ে যায়। অতীতে বেশি অভিযোগ ছিল রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। এ সময় টিআইবিসহ দুর্নীতিবিরোধী বিভিন্ন সংস্থার জরিপে আমলাদের নাম উঠে আসে দুর্নীতির শীর্ষে। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য মতিউর রহমান, ডিআইজি রফিকুলসহ আরো অনেকের দুর্নীতির যেসব খতিয়ান গণমাধ্যমে উঠে আসে, তাতে মানুষ শুধু অবাকই হতে থাকে। এও কি সম্ভব! এই লুটতরাজের শেষ কোথায়—মানুষের সেই প্রশ্ন জবাবহীনই থেকে যায়।
অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে দেশে আইন রয়েছে, বিধি-বিধান রয়েছে, নীতিমালা রয়েছে, কিন্তু এসবের প্রয়োগ কম। অনিয়ম-দুর্নীতি রোধে প্রশাসনিক কাঠামো বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, কিন্তু তাদের কাজকর্মের জবাবদিহি নেই। আর সেসব কারণে দুর্বৃত্ত চরিত্রের লোকজন সুযোগ পেয়ে যায়। ২০২২ সালে প্রকাশিত টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রের সেবা পেতে ৭০.৯ শতাংশ খানা বা পরিবারকে দুর্নীতির শিকার হতে হয়।’ তাই রাষ্ট্রকে অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
আমরা চাই, বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হোক। আরো যেসব ‘বেনজীর’ এখনো অপ্রকাশ্য রয়ে গেছেন, তাঁদেরও যথাযথ অনুসন্ধানের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হোক। দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল হোক।

