বাংলা ছোটগল্প তখনো প্রভাতকাল অতিক্রম করে মধ্যাহ্নে পৌঁছেনি, উন্মেষের পর বিকাশ পর্বের ভাঙা-গড়ার কাল-এসময়ে বাংলা সাহিত্যে আবির্ভাব ঔপন্যাসিক ও কথাসাহিত্যিক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের। রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য ও তাঁর স্বকালের লেখক হয়েও প্রভাতকুমার নিজেকে স্বাতন্ত্র্য করে পাঠকের সম্মুখে উপস্থাপিত হতে পেরেছিলেন। সাহিত্যজীবনের শুরুতেই প্রভাতকুমার কবি হতে চেয়েছিলেন; কিন্তু পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথই তাঁকে গদ্য লিখতে উৎসাহিত করেন। তাঁর স্নেহে, উপদেশে, উৎসাহে প্রভাতকুমার হয়ে ওঠেন বাংলা সাহিত্যের সফল ও দক্ষ গদ্যকার। রবীন্দ্রনাথের গল্পে ভাব, প্রাচুর্যের সমৃদ্ধি, উচ্ছ্বাসের প্রবল স্রোত সহজে লক্ষণীয়-এ দিক থেকে প্রভাতকুমার ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি গল্পে ভাব-উচ্ছ্বাসকে কমিয়ে তুলে ধরেছেন নিরেট বাস্তবকে, যা দেখেছেন তা-ই শৈল্পিকরূপে বুনেছেন গল্পের জমিনে। অধ্যাপক জগদীশ ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘রবীন্দ্র-কবিমানসের স্বমন্দাকিনীই ছোটগল্পে মর্ত্যভাগীরথীরূপে মানুষের কাছে আনন্দ-বেদনায় কলনাদিনী, তাই তাঁর পাবনপ্রবাহে মৃৎপুত্তলিকাও ক্ষণে ক্ষণে দেবতার অমর মহিমায় দীপ্তমান। প্রভাতকুমারের যমুনা মৃত্যু সহোদরা কালিন্দী, তাঁর নির্মল জলে পার্থিব জীবনেরই স্বমহিমচ্ছায়া প্রতিবিম্বিত।’ সূক্ষ্ম জীবনবোধের কারণেই রবীন্দ্রনাথের কালে থেকেও বিপুল পাঠকপ্রিয়তা পেতে প্রভাতকুমারের এতটুকু বেগ পেতে হয়নি। বিচিত্রমুখী গল্পের জন্য তিনি সমকালেই খ্যাত হয়েছিলেন ‘বাংলার মোপাসাঁ’ নামে। প্রভাতকুমার মানুষের হৃদয়ে নীরবে বয়ে চলা প্রেম-মমতার ফল্গুধারাটুকু সযত্নে ধরতে চেষ্টা করেছেন, তাঁর কাছে স্নেহ-মায়াই ছিল পরম মহার্ঘ, বহুল কাক্সিক্ষত। তাই প্রেম-মমতা নামের মুদ্রার উল্টো পিঠ তাঁর গল্পে কখনো উঠে আসেনি। গল্প পরিবেশনে ছিলেন বাঙালির জাতকথক; নিপুণ বর্ণনা, সংলাপের মাধুর্য ও চরিত্র-চিত্রণে প্রতিটি গল্পেই প্রভাতকুমার হাজির করতেন ভিন্নধর্মী কোনো চরিত্রকে-এসব চরিত্র কখনো দেশের সীমানা ডিঙিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েছে, আবার কখনো বহির্দেশের মানুষ তাঁর গল্পে এসে পড়েছে অতিথির মতো। মানবতার দীক্ষায় দীক্ষিত, জীবনধর্মে আলোকিত-সমাজসচেতন শিল্পী প্রভাতকুমার স্বগোত্রীয় কুসংস্কারকে মর্মমূলে উপলব্ধি করেছেন। এসব অনাচার, ধর্মান্ধতার সার্থক প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর বেশ কিছু গল্পে, এ ক্ষেত্রে ‘দেবী’ গল্পটি স্মরণযোগ্য। প্রভাতের গল্পের জগৎ কতটা সমৃদ্ধ, গদ্যে তিনি কতটা সাবলীল পদভ্রাজক-‘দেবী’ পাঠে তা সহজে অনুমেয়। সমাজের অনাচারগুলো কিভাবে বিশ্বাসে রূপ নেয়, আসন গাড়ে হৃদয়ে এবং একসময় যে এসব ঠুনকো বিশ্বাস ভেঙে অতলের দিকে পতিত হয়-তা এ গল্পে আলেখ্য। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে প্রভাতকুমার অদ্ভুত এবং বিস্ময়কর পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন। দেবী গল্পের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টি পরবর্তী সময়ে আমরা তারাশঙ্করের ‘ডাইনি’ গল্পের মধ্যে খুঁজে পাই। গল্পটির মেদহীন কাহিনীতে প্রথম দর্শনে আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় দয়াময়ী ও উমাপ্রসাদের দাম্পত্য জীবন, যে জীবনে তারা কল্পলোকের স্বপ্নসারথি। কাহিনীর বিকাশ ঘটে যখন দয়াময়ীর শ্বশুর স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে দয়াময়ীকে ‘দেবী’ বলে আখ্যা দেয়। দয়াময়ীর প্রিয় ‘খোকা’ অসুস্থ হলে তাকে ডাক্তার দেখানো হয় না। কারণ দয়াময়ীর নিজের বিশ্বাস-সে অলৌকিক ক্ষমতাধারী, দেবী-সে-ই সহজে খোকাকে সারিয়ে তুলতে পারবে। কিন্তু এত মানুষ ভালো হলেও খোকা ভালো হয় না, রোগাক্রান্ত খোকাকে বাঁচাতে পারে না দেবী আরোপিত দয়াময়ী। তখন কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস মুর্হূতেই উড়ে যায় মন থেকে। তাকে সব শেষে দেখি খোকার শোকে, বিশ্বাসের পতনে ও দেবিত্ব ঘোচাতে আত্মহত্যা করতে। গল্পটির শুরু যেমন, শেষ হয়েছে সেভাবেই; কিন্তু রেশটুকু যেন বহুদূর ছড়ানো। প্রভাতকুমার গদ্যকারের চোখে দেখেছেন পৃথিবীকে, সচেতনভাবেই লক্ষ করেছেন মানুষের সামান্য থেকে সামান্যাতি আচার-আচরণ, পরিবেশকে দেখেছেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে তাঁর গল্পগুলো পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য, ‘আপনার’ গল্প বলে প্রতিভাত হয়েছে। প্রভাতকুমারের গদ্যের বর্ণনায় পাঠকের অন্তর্চক্ষুতে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে গল্পের চরিত্রগুলো, স্পষ্ট হয়ে ওঠে পরিবেশ, উপাদানগুলো, দৃষ্টিতে উন্মোচিত হয় পাঠকহৃদয়। তাঁর গল্পের সরস ও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বর্ণনায় পাঠকমাত্রই দৃষ্টিপ্রাপ্ত হবে। এ ক্ষেত্রে ‘কাশিবাসিনী’ গল্পের শুরুতেই প্রভাতকুমারের স্কেচধর্মী বর্ণনার কথা বলা যেতে পারে-‘খগোলের বাজার হতে কিয়দ্দূরে, স্টেশনের মালগুদামের ছোটবাবু গিরিন্দ্রনাথের বাসাবাড়ি। মৃন্ময় গৃহখানি, খোলার চাল। রাস্তা হইতে সিঁড়ি উঠিয়া একটু বারান্দার মতো। তার পরই অন্তঃপুর। দুখানি শয়নঘর, একটি রসুই ঘর, একটি কাঠ রাখিবার ঘর (কপাট নাই); উঠানটি টালি বিছান; মধ্যস্থানে উচ্চ আলিসাযুক্ত কূপ; মাসিক ভাড়া ৩০ টাকা।’ তীব্র পর্যবেক্ষণে কী নিপুণই না গদ্যের বর্ণনাশৈলী! প্রভাতকুমারের গল্পের ঝোলাতে যেসব গল্প ছিল তার মধ্যে ‘কুড়ানো মেয়ে’ গল্পটি অন্যদের চেয়ে বেশ আলাদা ও একা। স্বল্প পরিসরের বন্ধন ভেঙে তাঁর এ গল্পটি হয়ে উঠেছে উপন্যাসের খসড়া। প্রভাতের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এ গল্পেও ‘পাঠক কৌতূহল’ নিবৃত্ত করার দায়িত্ব অন্যান্যবারের মতো লেখক নিজেই নিয়েছেন। যদিও এ দায়িত্ব বাদে গল্পটি আরো সমৃদ্ধ, নিটোল ও বাহুল্যবর্জিত হতো। পরবর্তী সময়ে ‘পাঠককে কৌতূহলী’ রাখা স্টাইলে রূপ নিলেও প্রভাতকুমার হয়তো সচেতনভাবে তা আগ্রাহ্য করে চলেছিলেন। প্রভাতকুমার আন্তন চেকভ ও হেনরি জেমসের মতো ‘ধীর স্বাভাবিক সমাপ্তি’র পক্ষপাতী ছিলেন এবং এ ধরনের সমাপ্তি তাঁর বেশ কিছু গল্পে ঘটেছে। তবে এ কথা স্বীকার্য যে স্বাভাবিক সমাপ্তি টানলেও প্রভাতের গল্পগুলো যথেষ্ট রসপূর্ণ, নান্দনিক ও সুখপাঠ্য। প্রভাতকুমার ৩০ বছর ধরে শতাধিক গল্পের মধ্যে ফুলের মূল্য, রসময়ীর রসিকতা, পোস্ট মাস্টার, নবকথা, গহনার বাক্স, যুবকের প্রেম, আদরিণী, মাতৃহীন উল্লেখযোগ্য। ছোটগল্পের পথচলার প্রথম পর্যায়ে প্রভাতের গল্পগুলো রচিত হলেও, কয়েক দশক পেরিয়ে এ যুগের পাঠকদের দাবি মেটাতে তাঁর গল্পগুলো সক্ষম। সমাজবাস্তবতায়, চিন্তনে, বিশ্বাসে, সংস্কারে, প্রেমে, মাহাত্ম্যে জীবনবোধে প্রভাতের গল্পগুলোর বেশির ভাগ চরিত্র আজও জনজীবনে প্রোথিত, মিশ্রিত। শুরুর দিকে হয়েও তিনি এখনো যথেষ্ট আধুনিক, পাঠকপ্রিয় ও স্বমহিমায় ভাস্বর।