গত কয়েক মাসে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার বেশ কয়েকটি খবর নাড়া দিয়েছে, ভাবিয়ে তুলেছে সবাইকে। আত্মহত্যার পর অনেক সময় এর পেছনের কারণটিকে অতি সরলী করা হয়। গবেষকরা বলছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আত্মহত্যার পেছনে কেবল একটি কারণ বা বিষয় থাকে না, এর পেছনে রয়ে যায় আরো অনেক কিছু। আত্মহনের অন্যতম কারণ মানসিক রোগ আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিদের অনেকেই কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। হয়তো সেটি গুরুত্ব দেওয়া হয় না বা মানসিক রোগ নিশ্চিত হলেও যথাযথ চিকিৎসা করানো হয় না। ♦ আত্মহত্যার জন্য অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ মানসিক রোগটি হচ্ছে বিষণ্নতা। বিষণ্নতা রোগমুক্ত ব্যক্তির তুলনায় আক্রান্ত ব্যক্তির আত্মহত্যায় মৃত্যুঝুঁকি ২০ গুণ বেশি। বিষণ্নতা তীব্র হলে আক্রান্তরা নিজেদের জীবনকে নিরর্থক ও বোঝা মনে করে, সমাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে, আচ্ছন্ন হতে থাকে আত্মঘাতী চিন্তায়। কেবল বয়স্ক ব্যক্তিরাই বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন, তা কিন্তু নয়। তারুণ্যে, কৈশোরে, এমনকি শৈশবেও গুরুতর বিষণ্নতায় আক্রান্ত হতে পারে অনেকে। শিক্ষার্থীরাও এই ঝুঁকির বাইরে নয়। ♦ মাদকাসক্তি আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ায়। মাদকের সহজলভ্যতা, কৌতূহল এবং সামাজিক-পারিপার্শ্বিক নানা কারণে শিক্ষার্থীদের অনেকের মধ্যে মাদক ব্যবহারের প্রবণতা দেখা দিচ্ছে, যা পরে আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে। ♦ অন্যান্য মানসিক রোগ, যেমন— সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার মুড ডিস-অর্ডার, অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিস-অর্ডার, বিপর্যয়পরবর্তী মানসিক চাপ বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিস-অর্ডারে আক্রান্তদের মধ্যেও আত্মহত্যাপ্রবণতা সাধারণের চেয়ে বেশি। কৈশোরেই অনেকে এসব মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। ঝুঁকির আরো কিছু কারণ মানসিক রোগ ছাড়াও মানুষের জীবনে এমন কিছু বিষয় বা ঘটনা আছে, যেগুলোর কারণে ব্যক্তির আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ে। সে রকম কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় হচ্ছে— ♦ একাকিত্ব। ♦ বিবাহবিচ্ছেদ বা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া। ♦ সম্প্রতি প্রিয় কারো মৃত্যু। ♦ শিক্ষা বা পেশাগত ক্ষেত্রে ব্যর্থতা। ♦ আর্থিক সংকট, ঋণগ্রস্ততা। ♦ ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি। ♦ বেকারত্ব। ♦ যেকোনো দ্বন্দ্ব, বীভৎসতা, দুর্যোগ, বিপর্যয়, ক্ষতি—তা প্রাকৃতিকই হোক বা মানবসৃষ্ট। ♦ পারিবারিক কলহ। ♦ পরিবারের কারো মানসিক রোগ, আত্মহত্যা বা মাদকাসক্তির ইতিহাস। ♦ দীর্ঘমেয়াদি বা ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য শারীরিক রোগ। ♦ অতীতে আত্মহত্যার চেষ্টা বা নিজের ক্ষতি করার প্রবণতা। ♦ যাদের জীবনে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ের উপস্থিতি বেশি, তাদের আত্মহত্যার আশঙ্কাও বেশি। ঝোঁকের বশেও ঘটতে পারে আত্মহনন গুরুতর কোনো মানসিক রোগ না থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পনা বা দীর্ঘমেয়াদি আত্মহত্যার চিন্তা ছাড়াই কোনো সংকটে বা মানসিক চাপে হঠাৎ করেই ঝোঁকের বশে অনেকে আত্মহত্যা করে বা চেষ্টা চালায়। মানসিক চাপ, যেকোনো প্রত্যাখ্যান অথবা কোনো দুর্ঘটনায় খাপ খাইয়ে নেওয়ার দক্ষতার অভাবে এমনটি ঘটতে পারে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে করণীয় অনেক ক্ষেত্রেই জীবনের এই মর্মান্তিক পরিণতি এড়ানো সম্ভব। এ জন্য দরকার সচেতনতা, কুসংস্কার দূর করা এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। ♦ আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা জরুরি। কারণ যত দিন যাবে, ঝুঁকি তত বাড়তে থাকবে। শনাক্তের পর আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ♦ মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। ♦ মাদক বর্জন করতে হবে। ♦ আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষ যেসব বস্তু বা জিনিস ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের প্রাণ হরণ করতে পারে, সেগুলো যাতে সহজে হাতের কাছে না পায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। ♦ ধর্মীয় ও সামাজিক সুস্থ রীতিনীতির চর্চা করতে হবে। ♦ সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য, ইতিবাচক সম্পর্ক লালন করতে হবে। ♦ পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে হবে। ♦ বয়ঃসন্ধিকালের কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক ও আবেগীয় দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা করতে হবে। ♦ যাদের মানসিক চাপে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা কম, তাদের যথোপযুক্ত কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে মানিয়ে নিতে সাহায্য করা। ♦ আত্মহত্যাসংক্রান্ত খবর, মন্তব্য ও মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন। লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট একনজরে ♦ ২০২২ সালের প্রথম আট মাসেই দেশে আত্মহত্যা করেছে ৩৬৪ শিক্ষার্থী। ♦ কভিড সংক্রমণের এক বছরে (মার্চ ২০২০ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২১) দেশে আত্মহত্যা করেছে সাড়ে ১৪ হাজার মানুষ। ♦ শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পেছনে অন্যান্য কারণের সঙ্গে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, পড়াশোনার চাপ, সেশনজট, অভিমান, প্রেমঘটিত বিষয়, পরিবার থেকে কিছু চেয়ে না পাওয়া, মিথ্যা অপবাদ, বিয়েতে প্রত্যাখ্যাত হওয়া, স্বামী পছন্দ না হওয়া, মোটরবাইক কিনে না দেওয়া প্রভৃতিও দেখা গেছে। সূত্র : আঁচল ফাউন্ডেশন