kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ আগস্ট ২০২২ । ১ ভাদ্র ১৪২৯ । ১৭ মহররম ১৪৪৪

মস্তিষ্কে রক্তনালি ফেটে যাওয়া, কারণ আছে, উপসর্গ নেই

মস্তিষ্কের রক্তনালির রোগ ‘সাব-অ্যারাকনয়েড হেমোরেজ’কে মেলানো হচ্ছে অ্যাটম বোমের সঙ্গে। জানাচ্ছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সের নিউরোলজিস্ট ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু

৬ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মস্তিষ্কে রক্তনালি ফেটে যাওয়া, কারণ আছে, উপসর্গ নেই

মডেল : কিন্নরী। ছবি : কাকলী প্রধান

মস্তিষ্কে অনেক রক্তনালি থাকে। এগুলো জালের মতো বিস্তৃত হয়ে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ করে। একটি রক্তনালি ভাগ হয়ে দুটি শাখায় পরিণত হয়। রক্ত চলাচলের সময় এই ভাগ হওয়া অংশে রক্তের চাপ পড়ে বেশি।

বিজ্ঞাপন

ফলে রক্তনালির এই অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে। চাপ বেড়ে গেলে এই দুর্বল অংশ ফুলে যায়, যেটিকে বলে অ্যানিউরিজম। একসময় অ্যানিউরিজম ফেটে যায়। ফেটে যাওয়া অংশ দিয়ে রক্ত মস্তিষ্কের আবরণীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আর একেই বলে ‘সাব-অ্যারাকনয়েড হেমোরেজ’। এই রোগকে অ্যাটম বোম বলা হচ্ছে কেন? কারণ হলো গবেষণালব্ধ তথ্য মতে, এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ১০ থেকে ২০ শতাংশ মারা যায় হাসপাতালে পৌঁছার আগেই। আরো ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মারা যায় প্রথম ৩০ দিনের মধ্যেই। মানে, মোট আক্রান্তের ৫০ শতাংশ মারা যায় প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে। তাহলে প্রশ্ন, বাকি অর্ধেকের কী হয়? জীবিতদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা নিয়ে বেঁচে থাকে। কাজেই এই রোগটি প্রাণহারী।

 

কেন হয় এ রোগ?

এ রোগ কেন হয় তার সঠিক কারণ জানা যায় না। তবে কিছু কারণে ফুলে যাওয়া রক্তনালি ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। সেই কারণগুলো হলো :

►   ধূমপান।

►   উচ্চ রক্তচাপ।

►   পরিবারে এই রোগের ইতিহাস থাকলে।

►   মদপান।

►   কিডনির রোগ অটোসোমাল ডমিন্যান্ট পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ। এটি বংশগত কিডনির রোগ। এই রোগে কিডনিজুড়ে অনেক সিস্ট হয়। কিডনি তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। কিডনির সঙ্গে লিভার বা অন্যান্য অঙ্গে সিস্ট হতে পারে। সেই সঙ্গে মস্তিষ্কের রক্তনালি ফুলে গিয়ে অ্যানিউরিজম হতে পারে।

 

উপসর্গ

সাব-অ্যারাকনয়েড হেমোরেজের মূল কারণ অ্যানিউরিজম। এটি মাথায় থাকলে কিন্তু কোনো লক্ষণ দেখা যায় না, যদি না সেটি বড় হয়ে টিউমারের আকার ধারণ করে। অ্যাটম বোম বাস্ট হলে যেমন প্রাণহানি হয়, ঠিক তেমনি অ্যানিউরিজম রাপচার বা ফেটে গেলে উপসর্গ দেখা দেয়। এ রোগের উপসর্গ শুনেই রোগ নির্ণয় করা যায়। মূল ও প্রধান উপসর্গ হলো মাথা ব্যথা। শুধু মাথা ব্যথা নয়, তীব্র মাথা ব্যথা। এমন মাথা ব্যথা জীবনে কখনোই হয়নি। অনেকে বলেন, মাথায় বাজ পড়ার মতো ব্যথা। ব্যথা শুরু হয়ে কিছু সময়ের মধ্যে খুব তীব্র আকার ধারণ করে। অনেকের মাইগ্রেন থাকে, তাঁদেরও তো মাথা ব্যথা হয়। তাহলে তাঁরা কিভাবে আলাদা করবেন? তাঁরা আলাদা করবেন এভাবে যে এমন তীব্র মাথা ব্যথা এর আগে কখনো হয়নি। শুধু মাথা ব্যথা নিয়েই এক-তৃতীয়াংশ রোগী হাসপাতালে আসেন।

তবে মাথা ব্যথার সঙ্গে বমি হতে পারে, আক্রান্ত ব্যক্তি অজ্ঞান হতে পারেন। আক্রান্ত ব্যক্তির ঘাড় শক্ত হয়ে যায়, চোখের পাতা পড়ে যেতে পারে, শরীরের কোনো পাশ অবশ হতে পারে এবং চোখে দেখার সমস্যা হতে পারে।

 

পরীক্ষা-নিরীক্ষা

এই রোগ নির্ণয়ে মাথার সিটিস্ক্যান করা হয়। বেশির ভাগ রোগীর সিটিস্ক্যানে মস্তিকের আবরণীতে রক্ত ধরা পড়ে। তবে রক্তক্ষরণ যদি কম হয়, তাহলে কিন্তু সিটিস্ক্যানে এই রোগ না-ও ধরা পড়তে পারে। এমনটি হলে নিউরোলজিস্টরা পিঠের হাড়ের মধ্যের রস নিয়ে পরীক্ষা করে এই রোগ নির্ণয় করতে পারেন। আর মাথার অ্যাটম বোম বা অ্যানিউরিজম নির্ণয় করার জন্য কন্ট্রাস্ট বা ওষুধ দিয়ে সিটিস্ক্যান বা এমআরআই করতে হয়। আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য মস্তিষ্কের এনজিওগ্রাম করতে হয়, যেটিকে বলা হয় ‘ডিজিটাল সাবট্রাকশন এনজিওগ্রাম’ বা সংক্ষেপে ‘ডিএসএ’। অত্যাধুনিক এই পরীক্ষাটি এখন আমাদের দেশেই হচ্ছে হরহামেশাই।

 

চিকিৎসা কী?

প্রথমে একটি সুখবর দিতে চাই। বাংলাদেশে এই রোগের অত্যাধুনিক চিকিৎসা হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের মতো আমাদের দেশেও এই চিকিৎসা হয়। এই অত্যাধুনিক চিকিৎসাকে বলে ‘কয়েল এম্বোলাইজেশন’। এটি এক ধরনের সার্জারি, তবে মিনিমাল ইনভেসিভ সার্জারি। মানে, এই অপারেশনে মাথা কাটা-ছেঁড়ার প্রয়োজন পড়ে না। কুঁচকিতে ক্যানুলা পরানোর পর ক্যাথেটার ও ওয়ারের সাহায্যে মস্তিষ্কের রক্তনালিতে প্রবেশ করা হয়। এরপর অ্যানিউরিজমে প্রবেশ করে কয়েল বা বিশেষ ধরনের তার বসিয়ে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে অ্যানিউরিজম ফেটে গিয়ে আর রক্তক্ষরণের আশঙ্কা থাকে না।

দেশের মধ্যে আগারগাঁও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে একটি বিভাগ আছে। এরা এভাবে অপারেশন করে। খুব দক্ষ, প্রশিক্ষিত টিমের মাধ্যমে সরকারিভাবে এ সেবা দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অল্পবিস্তর এ ধরনের অপারেশনের সুযোগ আছে। বেসরকারিভাবে দু-একটি জায়গায় এ অপারেশন হচ্ছে। এ অপারেশনে ঝুঁকি খুব কম। রোগী দু-চার দিনের মধ্যেই বাসায় যেতে পারেন। আরেকটি পদ্ধতি হলো মাথা কেটে অপারেশন করা। এ ক্ষেত্রে মাথা কেটে অ্যানিউরিজম খুঁজে বের করে ক্লিপ দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

 

আমার মাথায় কি অ্যাটম বোম আছে?

খুব জটিল প্রশ্ন। অ্যাটম বোম ফেটে না যাওয়া পর্যন্ত বোঝার উপায় নেই। তবে কোনো কারণে সিটিস্ক্যান বা এমআরআই করাতে গিয়ে এটি না ফাটলেও ধরা পড়তে পারে। তাহলে কি আমরা সবাই সিটিস্ক্যান করাব? না, এর প্রয়োজন নেই। কারণ খুব অল্পসংখ্যক মানুষের মস্তিষ্কে অ্যানিউরিজম থাকে। আবার যাদের অ্যানিউরিজম থাকে, তাদের সবার ফেটে যায় না। কাজেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে খোঁজার দরকার নেই। তবে যাদের পরিবারে নিকটাত্মীয়দের (যেটিকে আমরা ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেশনশিপ বলি) যদি দুজন বা এর বেশিজনের এই রোগ দেখা দেয় এবং কিডনির রোগ অটোসোমাল ডমিন্যান্ট পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ থাকে, তাহলে অবশ্যই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে।



সাতদিনের সেরা