kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

শীতের আগে নিউমোনিয়া সতর্কতা

১০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



শীতের আগে নিউমোনিয়া সতর্কতা

শীতকাল আসন্ন। শীতের এই সময়ে সর্দি-কাশির পাশাপাশি নিউমোনিয়া বেশি হয়। সাধারণত পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশু ও বৃদ্ধরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় বেশি। পৃথিবীব্যাপী শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এই নিউমোনিয়া। তাই এর জটিলতা এড়াতে শীতের আগেই ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। লিখেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্ষব্যাধি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম মোশাররফ হোসেন

ফুসফুসের বায়ুথলিতে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ইত্যাদি জীবাণু সংক্রমণের ফলে, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, কাশি ইত্যাদির মতো নানা উপসর্গ দেখা দেয়। একেই বলে নিউমোনিয়া। এটি ফুসফুসের অত্যন্ত প্রচলিত ও প্রাচীন একটি রোগ। আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের জনক হিপোক্রেটিস আড়াই হাজার বছর আগে এই রোগের বর্ণনা দিয়ে গেছেন।

প্রকারভেদ

জীবাণু সংক্রমণকারী জীবাণুর ওপর ভিত্তি করে নিউমোনিয়াকে কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন—

 

ব্যাকটেরিয়াল

ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়ার মধ্যে স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনি, হেমোফাইলাসম ইনফ্লুয়েঞ্জি, ক্ল্যামাইডিয়া নিউমোনি, মাইকোপ্লাজমা নিউমোনি—এই চারটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাওয়া যায়।

 

ভাইরাল

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এক-তৃতীয়াংশের নিউমোনিয়ার কারণ হিসেবে ভাইরাস সংক্রমণকে দায়ী করা হয়। এর মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, রেসপিরেটরি সিনসাইশিয়াল ভাইরাস, এডেনো ভাইরাস অন্যতম।

 

ফাংগাল

দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে ফাংগাস দিয়ে নিউমোনিয়া হতে পারে।

 

পরিবেশগত

রোগীর অবস্থান ও পরিবেশের ওপর নিউমোনিয়ার বিস্তার হয়। এই শ্রেণির রোগীর নিউমোনিয়ার জীবাণু ও চিকিৎসায় কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক সম্পর্কে ভালো ধারণা দেয়। যেমন—

কমিউনিটি অর্জিত নিউমোনিয়া : এ ক্ষেত্রে রোগী কমিউনিটি থেকে প্রাপ্ত জীবাণু দিয়ে সংক্রমিত হয়। যেমন—বাসা, ছাত্রাবাস ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে সাধারণ জীবাণু দিয়েও নিউমোনিয়া হতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর সংক্রমণ তেমন হয় না।

হাসপাতালে অর্জিত নিউমোনিয়া : এই টাইপের রোগীরা হাসপাতালে ভর্তির ৪৮ ঘণ্টা পর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মাল্টিড্রাগ প্রতিরোধী জীবাণু সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে বেশি।

স্বাস্থ্যসেবাযুক্ত নিউমোনিয়া : এই ধরনের রোগীরা হাসপাতালে ভর্তি না থাকলেও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। যেমন—বিগত ৩০ দিনের মধ্যে হেমোডায়ালিসিস বা শিরায় কেমোথেরাপি নিয়েছেন বা বিগত ৯০ দিনের মধ্যে কোনো সময় চিকিৎসার জন্য ৪৮ ঘণ্টা বা এর বেশি সময় হঠাৎ সংকটজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।

 

অ্যানাটমিক্যাল বা শারীর সম্পর্কিত

ফুসফুসের কতটুকু জায়গাজুড়ে নিউমোনিয়া হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে। যেমন—

লোবার নিউমোনিয়া : যদি এক বা একাধিক লোব আক্রান্ত হয়ে থাকে।

সেগমেন্টাল নিউমোনিয়া : লোবের চেয়ে ছোট সেগমেন্ট। একটি লোবে ১০টি সেগমেন্ট থাকে। এক বা একাধিক সেগমেন্টে নিউমোনিয়া হলে তাকে সেগমেন্টাল নিউমোনিয়া বলে।

 

নিউমোনিয়ার উৎপত্তি

নিউমোনিয়া রোগীর ফুসফুসে জীবাণুর প্রবেশ কয়েকটিভাবে হতে পারে। যেমন—

অ্যাসপিরেশন : ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস আগে থেকে গলায়, নাকে বাসা বাঁধে ও বংশবিস্তার করে। সেটি শ্বাসনালি হয়ে বায়ুথলিতে চলে যায়। একে অ্যাসপিরেশন বলে। দেখা গেছে, সুস্থ মানুষও ঘুমের সময় অ্যাসপিরেশন করে। আবার স্ট্রোক বা ব্রেন টিউমারের রোগী, ঘুমের ওষুধ বা মদ্যপানে অজ্ঞান অবস্থায় থাকলে এই অ্যাসপিরেশনের মাত্রা বেড়ে যায়। নিউমোনিয়ায় ফুসফুসে জীবাণু প্রবেশের এটি প্রধান উপায়।

শ্বাস গ্রহণ বা শ্বসন : জীবাণুর ক্ষুদ্র কণা বায়ুবাহিত হয়ে শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢোকে। তখন নিউমোনিয়ার সংক্রমণ হয়।

রক্তবাহিত : রক্তের মাধ্যমে দেহের অন্য জায়গার জীবাণু ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে।

সরাসরি বিস্তার : ফুসফুসের কাছাকাছি অন্য অঙ্গে, যেমন—যকৃতে জীবাণু সংক্রমণ হলে সেটি ফুসফুসে যেতে পারে।

জীবাণুর ক্ষতিকারিতা : ফুসফুসে জীবাণু প্রবেশের পর তা রোগের উৎপত্তি করবে কি না তা জীবাণুর অত্যধিক তীব্রতার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা : জীবাণু প্রবেশের পর ফুসফুসের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নিবৃত করে শ্বাসনালির কোষে আঘাত করে জীবাণু। অন্যদিকে দেহের রোগ প্রতিরোধ তন্ত্র জীবাণুকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে। ফলে ফুসফুসের আরো ক্ষতি হয়। জীবাণু রক্তের শ্বেতকণিকা, ম্যাক্রোফেজ ও তরল পদার্থ মিলে ফুসফুসের বায়ুথলি পূর্ণ করে দেয়। ফলে ফুসফুসের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়।

এ ছাড়া ধূমপান, মদ্যপান, অ্যাজমা, সিওপিডি, ডায়াবেটিস, কিডনি ফেইলিওর, কেমোথেরাপি, স্ট্রোক বা অন্য কারণে রোগী অজ্ঞান হলে অ্যাসপিরেশন হয়ে, স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ দীর্ঘদিন সেবন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ব্যাহত করে নিউমোনিয়ার প্রবণতা বাড়ায়।

 

উপসর্গ

নিউমোনিয়ার লক্ষণ খুব দ্রুত দু-তিন দিনের মধ্যে প্রকাশ হয়। যেমন—

► বুকের একদিকে হয় ও কাশি বেড়ে যায়।

► শ্লেষ্মা কখনো মিউকাসযুক্ত হয়, কখনো পুঁজযুক্ত হয়ে থাকে।

► রক্তকাশি শ্লেষ্মায় সামান্য রক্তের মিশ্রণ থাকে, মরিচার মতো হয়।

► শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা হতে পারে।

► শ্বাসের গতি মিনিটে ২৪ বা তারও বেশি হয়।

► ঠোঁট ও জিহ্বা নীল হয়ে যেতে পারে ইত্যাদি।

 

পরীক্ষা

কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিউমোনিয়ার প্রকোপ ও রোগের বিস্তার সম্পর্কে জানা যায়। যেমন—সিবিসি, ডাব্লিউবিসি, বুকের এক্স-রে, শ্লেষ্মা পরীক্ষা, রক্তের ইউরিয়া, বুকের সিটি স্ক্যান, ব্রংকোস্কপি ইত্যাদি।

 

চিকিৎসা

সাধারণ ব্যবস্থায় সব রোগীকে জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়। বুকের ব্যথা থাকলে তা কমানোর জন্য অ্যানালজেসিক ওষুধ দেওয়া হয়। রোগীকে প্রচুর পরিমাণ পানি পান করতে বলা হয়। বিশেষ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের ব্যবস্থা মতো মুখে অ্যান্টিবায়োটিক যেমন—এমোক্সিসিলিন, ক্লারিথ্রোমাইসিন সেফুরোক্সিম, সেফিক্সিম ইত্যাদি সাত থেকে ১০ দিনের ডোজ দেওয়া যেতে পারে।

তবে আক্রান্ত রোগীর বয়স যদি ৬০ বছরের ওপরে হয়, রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি যদি প্রতি মিনিটে ৩০ বার বা তার বেশি থাকে, ঠোঁট ও জিহ্বা যদি নীলাভ হয়, যদি রক্তচাপ কমে যায়, রোগীর চেতনার স্তর কমে যায়, অন্যান্য রোগ যেমন—হার্ট ফেইলিওর, কিডনি ফেইলিওর ইত্যাদি থাকে, তাহলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করানো উচিত। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে শিরায় সেফট্রিয়াকজন, সেফটাজিডিম, ক্লারিথ্রোমাইসিন, জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে হয়। পরে অবস্থার উন্নতি হলে মুখে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হয় দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত।

 

জটিলতা

জেনে রাখা দরকার, নিউমোনিয়ার বিস্তৃতি ফুসফুসে যত বেশি হবে, রোগীর ভোগান্তি তত বেশি হবে। নিউমোনিয়ার চিকিৎসা না হলে বা ত্রুটিপূর্ণ হলে অনেক জটিলতা দেখা দেয়। প্যারানিউমোনিক ইফিউশন এ ক্ষেত্রে ফুসফুসের চারদিকের আবরণের গহ্বরে তরল পদার্থ জমে। এ ক্ষেত্রে তরল পদার্থকে নিষ্কাশন করতে হয়। এমন কিছু জটিলতা হলো—

এমপাইয়েমা : এ ক্ষেত্রে প্লুরা গহ্বরে পুঁজযুক্ত তরল জমা হয়। টিউব ঢুকিয়ে বা সার্জারির মাধ্যমে এই পুঁজ নিষ্কাশন করতে হয়।

ফুসফুসে ফোড়া বা অ্যাবসেস : এ ক্ষেত্রে বেশ কিছুদিন অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে হয়।

সেপসিস : রক্তের মাধ্যমে ফুসফুসের জীবাণু দেহের বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।

একিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম : এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম শ্বসনযন্ত্রেও রোগীর অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখা যায় না।

এটা আশার কথা যে যথাযথ চিকিৎসা প্রয়োগ করলে নিউমোনিয়া ভালো হয়ে যায়। আক্রান্ত রোগীর ১ শতাংশের মতো মারা যেতে পারে। পরিসংখ্যান মতে, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ১০ শতাংশ ও আইসিইউর রোগীদের ৩০ শতাংশ নিউমোনিয়ায় মারা যায়।

 

নিউমোনিয়া প্রতিরোধে করণীয়

নিউমোনিয়া একটি জটিল রোগ। কোনো মতেই একে অবহেলা করা উচিত নয়। শীতকালে যেহেতু এই রোগ বেশি হয়, তাই নিউমোনিয়া প্রতিরোধে কিছু করণীয় হলো—

► শীতের যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকেই। যেকোনোভাবে ঠাণ্ডা থেকে দূরে থাকতে হবে। শিশু ও বৃদ্ধদের ব্যাপারে বিশেষ নজর দিতে হবে।

► ধূমপান ও মদ্যপান থেকে দূরে থাকতে হবে।

► প্রতিবছর ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা এবং তিন বছর পর পর নিউমোকক্কাসের টিকা নেওয়া উচিত।

► যাঁদের নিউমোনিয়া সংক্রমণের অতিরিক্ত সম্ভাবনা রয়েছে, যেমন—ফুসফুসের অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, হৃদযন্ত্র, লিভারের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এমনকি যাঁদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদেরও উচিত চিকিৎসকের পরামর্শে নিউমোনিয়া প্রতিরোধক টিকা নেওয়া।

► রান্নার ধোয়া প্রতিরোধে শিশু ও বয়স্কদের রান্নাঘরে প্রবেশ করা উচিত নয়।

► নিয়মিত কায়িক শ্রম বা দৈহিক ব্যায়াম করা দরকার।

► সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার অভ্যাস করতে হবে, বিশেষ করে হাত-মুখ সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে।

► স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস তৈরি করতে হবে।

► অস্বাস্থ্যকর ও ঘিঞ্জি ঘরে বসবাস না করা কখনোই উচিত নয়।

► হাম হলে সঠিক চিকিৎসা নিতে হবে।

► অন্যের সামনে হাঁচি-কাশি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় রুমাল ব্যবহার করতে হবে।

► কারো ডায়াবেটিস, এইডস, পুষ্টিহীনতা ইত্যাদি সমস্যা থাকলে তার চিকিৎসা করতে হবে।

► কোনো কারণে নিউমোনিয়া হলে এবং রোগের মাত্রা বেশি হলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দিতে হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা