স্বামী বাঁধা গাছের সঙ্গে। কোলে অবুঝ সন্তান। শাড়ির আঁচল পেঁচানো স্বামীর হাতে। ছাড়বেন না স্ত্রীকে সৈনিকের হাতে। পাকিস্তানি একটা সৈনিক প্রাণপণে টানছে তাঁকে। কিন্তু কতটা পারেন সৈনিকের সঙ্গে। পাষণ্ডের হাতে চলে যেতে হয় স্ত্রীকে। টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় সামনের দিকে। সন্তানকে আঁকড়ে ধরেন মমতাময়ী মা। সৈনিক হেঁচকা টানে শিশুটি ছিনিয়ে নেয়। চিৎকারে ফেটে পড়ে শিশু। সঙ্গে সঙ্গে আছাড় মারে গাছের সঙ্গে। একটা-দুইটা এমনি করে ঘা খাওয়ার পরই নিস্তেজ হয়ে যায় শিশুটি। ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। মুখে শব্দ নেই, চলার শক্তি হারিয়ে ফেলেন মা। তারপর দিনের আলোয় ধর্ষিত হলেন সিরাজগঞ্জ সদরের রাজুবালা। শিশুহত্যা ও ধর্ষণ শেষে বীরদর্পে চলে যায় পাকিস্তানি সৈনিক। রক্তাক্ত রাজুবালা দুনিয়াজোড়া ক্লান্তি নিয়ে একসময় ঘরে ঢুকতে চান। প্রথম সিঁড়ি মাড়িয়ে যেতেই শাশুড়ি তাঁর দরজা বন্ধ করে দেন। চোখমুখ অন্ধকার হয়ে যায় তাঁর। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন ঘরের সামনে। স্বামী ছুটে আসেন স্ত্রীর কাছে। বাড়ির সবার এক কথা। নষ্টা মেয়েকে চাইলে ঘরের দুয়ার বন্ধ হবে। খোলা প্রান্তরকেই বেছে নেন স্বামী। স্ত্রীকে নিয়ে ঘর ছাড়েন। দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু স্বামী হরিপদ দের দুর্ভোগমুক্তি হয় না। '৯০-এর সাম্প্রদায়িক নির্যাতনকালে সিরাজগঞ্জের নিজ গ্রাম চাঁদপুর থেকে বরিশাল যাওয়ার পথে তাঁকে হত্যা করে স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। রাজুবালা আজও জানেন না স্বামীর মরদেহটির সৎকার হয়েছে কি না। সেই রাজুবালাদের কী দিয়েছে স্বাধীন বাংলার সমাজ? বঙ্গবন্ধুর দেওয়া একটি চিঠি, সামান্য সহযোগিতা, কিছু টিন- এই তো! বীরাঙ্গনা নাম দিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁদের সম্মানিত করেছেন। কিন্তু সমাজ তাঁদের কী দিয়েছে? কিংবা বঙ্গবন্ধু পরবর্তী সরকারগুলো? লাঞ্ছনা আর নির্যাতন তাঁদের ভাগ্যে জুটছে এখনো। রাজুবালা একাই কি লাঞ্ছিত হয়ে চলেছেন এই সমাজে? মাত্র কয়েক বছর আগে, সিরাজগঞ্জেরই এক বীরাঙ্গনাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হলো নষ্টা মেয়ে বলে। একই স্থানের হাসিনা বেগমের নাতিরা স্কুলে গেলে তাদের সহপাঠীরা টিটকারি দেয় নষ্টা মেয়ের নাতি বলে। সিরাজগঞ্জেরই আরেক বীরাঙ্গনা বাঁচার তাগিদে পিঠা বিক্রি করে খেতেন। সমাজপতিরা সেই পিঠার দোকানটিও ভেঙে দেয়। কিংবা সিরাজগঞ্জেই আমরা দেখতে পাই, মৃত্যুর পর বীরাঙ্গনার জানাজা পড়া যাবে না বলে ফতোয়া জারি করেন স্থানীয় ইমাম। এটাই কি প্রাপ্য আমাদের বীরমাতা-বীরাঙ্গনাদের? রাষ্ট্র তাঁদের কথা ভাবছে না। সমাজ থেকে নিগৃহীত হন তাঁরা। তবু কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা এই আত্মকেন্দ্রিক সমাজে থেকেও ভাবেন মানুষের কথা। মুক্তিযুদ্ধে সব হারানো বীরাঙ্গনাদের কথাও ভুলে যান না। তাঁদেরই একজন ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ও সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রাধ্যক্ষ তিনি। উদ্যোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন সামাজিক সহায়তা উদ্যোগ নামের প্রতিষ্ঠান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধচর্চা কেন্দ্রের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর কার্যক্রম শুরু। তাঁরা এগিয়ে আসেন মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের সহায়তায়। এর আগে প্রথম কর্মসূচি হিসেবে ২০০৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের দুজন দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাকে রিকশা প্রদান করেন। এরপর ১৪ নভেম্বর নড়াইলের দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে ভ্যান প্রদান করেন। এরপর নজর দেন বীরমাতাদের প্রতি। পরীক্ষামূলকভাবে কুষ্টিয়া ও সিরাজগঞ্জের চারজন বীরাঙ্গনাকে চারটি গাভী প্রদান করেন ২০০৯ সালে। ২০১০ সালের অক্টোবরে বিস্তৃত হয় তাঁদের কার্যক্রম। সিরাজগঞ্জের ১৮ জন বীরাঙ্গনাকে বাছাই করেন আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের জন্য। দুই বছর মেয়াদি এই কার্যক্রমে প্রত্যেককে মাসিক ৫০০ টাকা হারে দেওয়া শুরু করেন তাঁরা। ২০১২ সালে ১৯ জন বীরাঙ্গনাকে একটি করে গাভী প্রদান করেন। একই সঙ্গে ভাতাপ্রাপ্ত বীরাঙ্গনার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ২১ জনে দাঁড়ায়। হতদরিদ্র বীরাঙ্গনারা। বয়স ও দারিদ্র্য তাঁদের নিষ্পেষিত করছে স্বাভাবিকভাবে। নানা ধরনের রোগ বাসা বেঁধেছে শরীরে। থাকা-খাওয়ার সুযোগবঞ্চিত এই বীরাঙ্গনাদের চিকিৎসা হবে কোথা থেকে। চিকিৎসা সহায়তায় হাত বাড়ালেন সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক। সেখানেও এই প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রাখল। জেলা প্রশাসকের সহযোগিতায় ২১ জন বীরাঙ্গনাকে হেলথকার্ড প্রদান করা হয়। যার মাধ্যমে তাঁরা সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বিনা মূল্যে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন। দরিদ্র বীরাঙ্গনাদের আবাসন সুবিধার কাজেও এগিয়ে এসেছেন তাঁরা। ঢাকার অদূরে জায়গা কিনতে চেষ্টা করছেন। অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন সঙ্গী হিসেবে পেয়ে যান এস এম গোলাম হিলালী (পরিচালক, পরিকল্পনা), এ টি এম যায়েদ হোসেন (প্রকল্প সমন্বয়কারী) ও সিরাজগঞ্জের মো. মিজানুর রহমানকে (সিরাজগঞ্জ সমন্বয়কারী)। তিনি নিজে দায়িত্ব পালন করছেন সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার। সামাজিক সহায়তা উদ্যোগের মাধ্যমে বীরাঙ্গনাদের সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতেও তাঁরা ভূমিকা রাখছেন। স্থায়ীভাবে তাঁদের সহযোগিতা করার পাশাপাশি আপৎকালীন সহযোগিতাও করা হয়। ইতিপূর্বে কুষ্টিয়ায় পাঁচজন, সিরাজগঞ্জে ২১ জন, ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে ২২ জন বীরাঙ্গনাকে কম্বল ও চাদর প্রদান করা হয়েছে। ১০০ জন বীরাঙ্গনাকে সহযোগিতার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অধিকতর গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনায়ও তাঁরা নিয়োজিত। মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহের তাগাদায় গবেষণাগ্রন্থ প্রণয়নে জড়িয়ে আছেন অনেক দিন থেকে। শুধু মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থ রচনা, সম্পাদনা করেছেন ২৭টি। বীরাঙ্গনাদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক গ্রন্থ 'বীরাঙ্গনা-বীরমাতাদের জবানিতে একাত্তরের দুঃসহ স্মৃতি' প্রকাশ করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস লিখেছেন তিন খণ্ডে ২০টি থানার। এসব কাজ বই আকারে বেরিয়ে গেছে। আরো ৬০টি থানার কাজ এগিয়ে চলেছে। লক্ষ্য অন্তত ২০০ থানার ইতিহাস গ্রন্থভুক্ত করবেন। তাঁর পক্ষে সম্ভব। নিজে গ্রন্থ প্রণয়ন করবেন সেটাই নয়, আগামীতে যেন গবেষকরা গ্রন্থসুবিধা পান সে জন্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি করার চিন্তা থেকে তিনি অসাধারণ একটি কাজ করেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে লিখতে গিয়ে তাঁকে পড়তে হয় বিভিন্ন বই। মাথায় আসে এসব বইয়ের সূত্র পেলে অন্য গবেষকদেরও সুবিধা হবে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ আছে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে। হাতের মুঠোয় বইয়ের খবর, তথ্যের খবর দেওয়ার উদ্দেশ্যে হাত দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে প্রকাশিত গ্রন্থের বিব্লিওগ্রাফি তৈরি করার কাজে। কথা বলেন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। এগিয়ে আসেন মফিদুল হক। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর অধ্যাপক ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেনের সংগৃহীত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চার হাজার ৫০টি গ্রন্থের বিব্লিওগ্রাফি নিয়ে বের করেছে একটি বই। অধ্যাপক ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তহবিল সংগ্রহ বিষয়ে। সরল জবাব তাঁর, 'যেকোনো ভালো কাজে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন মানসিকতা। ইচ্ছা থাকলে অর্থপ্রাপ্তি কখনো অসাধ্য ব্যাপার নয়।' সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সহযোগিতার ওপর পরিচালিত হচ্ছে তাঁদের এই কার্যক্রম। আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবদের যুক্ত করে তাঁরা এই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এমনকি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র তাঁর ছোট ছেলেটিও বৃত্তির টাকা থেকে বাবার কার্যক্রমে সহযোগিতা করছে। অনেকেই একজন-দুজনকে সহযোগিতা করার দায়িত্ব নিচ্ছেন। কেউ হয়তো একজনকে এক বছরের টাকা দিচ্ছেন। কেউ হয়তো আংশিক। কিংবা কয়েকজন মিলে হয়তো এককালীন কিছু অর্থ দিচ্ছেন। চাইলে যে কেউই শরিক হতে পারেন তাঁদের উদ্যোগের সঙ্গে। এভাবেই একজন দেলোয়ার নিভৃতে করছেন এমন একটি কাজ, যা আসলে করা উচিত ছিল আমাদের সবার। আমাদের অক্ষমতার এই লজ্জা ঢাকার লড়াই তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন রণাঙ্গনের সাহসী মুক্তিযোদ্ধার মতোই।