kalerkantho

শনিবার । ২৫ জানুয়ারি ২০২০। ১১ মাঘ ১৪২৬। ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ

চয়ন বিকাশ ভদ্র, সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ

২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ

একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির উদ্ভিদবিজ্ঞানের দ্বাদশ অধ্যায়ের শিরোনাম—জীবের পরিবেশ, বিস্তার ও সংরক্ষণ। এখানে বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় গাছগুলো নিয়ে আলোচনা রয়েছে। দেশের ৯৫টি উদ্ভিদ প্রজাতি বিপন্ন বলে বিবেচিত। এর মধ্যে ৯২টি আবৃতবীজী, তিনটি নগ্নবীজী। জীব বিলুপ্তির উল্লেখযোগ্য কারণ ভূমিকম্প, দাবানল, টর্নেডো, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিপর্যয়। এ ছাড়া বাসস্থান ধ্বংস, অতি আহরণ, অতিমাত্রায় পশুচারণ ও পলিনেটর ধ্বংস—এগুলোও দায়ী।

 

নিটাম, Gnetum oblongum, গোত্র Gnetaceae

এটি নগ্নবীজী, গুল্মজাতীয়। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আর্দ্র নিচু ভূমির উদ্ভিদ। পাতা সরল, পত্রবিন্যাস বিপরীত তির্যকাপন্ন। পাতার আকৃতি শিরাবিন্যাস দেখে একে দ্বিবীজপত্রী গুপ্তবীজী উদ্ভিদ বলে ভুল হয়। প্রধান কাণ্ডের পাতার কক্ষ থেকে একাধিক শাখা বের হয়। এর শিকড় মাটির তত গভীরে প্রবেশ করে না। আদি প্রাথমিক মূল কয়েক বছর সক্রিয় থাকে। তারপর প্রাথমিক মূলের পরিবর্তে অস্থানিক মূল গঠিত হয়। একই উদ্ভিদে পুং ও স্ত্রী স্ট্রোবিলাস গঠিত হয়। এগুলো কয়েক সেন্টিমিটার লম্বা এবং পাতার কক্ষ থেকে উদ্গত হয়। বন ধ্বংসের ফলে এর বাসস্থান ধ্বংস হচ্ছে। Gnetum oblongum-কে সংরক্ষিত এলাকায় পাওয়া যায়নি। আগে এর অবস্থান বের করা হয়নি এবং এ প্রজাতিকে সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। ২০১৩ সালে উদ্ভিদটিকে Near thretened ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশের বন বিভাগ হুমকির মুখে থাকা এলাকার উন্নততর ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর সংরক্ষণের জন্য সংরক্ষিত এলাকা ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (PAMP) নিয়েছে। এ ছাড়া IUCN প্রজাতি সংরক্ষণ ও সংরক্ষিত এলাকা কর্মসূচি নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করছে।

রোটেলা, Rotala simpliciuscula, গোত্র Lythraceae

আরেক নাম শিরঘূর্ণন। সরু, উভচর, বর্ষবীজী, গুপ্তবীজী, বীরুৎ। পাতা অতিক্ষুদ্র, ২.৫-৫.০ ০.৫-২.২ মিলিমিটার। ধানক্ষেতের ভেজা কিনারা বরাবর জন্মায়। বাংলাদেশের এন্ডেমিক উদ্ভিদ। চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে আবিষ্কৃত হয় ঊনবিংশ শতকে। এটি শুধু বাংলাদেশে পাওয়া গেছে। হুকার ও থমসন নামের দুই বিজ্ঞানী এটি সংগ্রহ করেন। পরে আর সংগ্রহ করা যায়নি। ব্যাপক অনুসন্ধান করে গাছটি পাওয়া গেলে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ১৯৯৭ সালে উদ্ভিদটি অতিবিপন্ন জলজ উদ্ভিদ হিসেবে রেড ডাটা বুকে অন্তর্ভুক্ত হয়।

তালিপাম, Corypha taliera, গোত্র Arecaceae

এটি মনোকার্পিক গুপ্তবীজী উদ্ভিদ। এই উদ্ভিদ একবার ফুল ও ফল দিয়ে মরে যায়। এর কাণ্ড ১০ মিটার উঁচু হয়, ব্যাস ৭০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত। পাতা লম্বা বৃন্তযুক্ত। প্রায় গোল। পুষ্পমঞ্জরি ৬ মিটার বা তার চেয়েও বড়, দেখতে পিরামিডের মতো। এদের ফুল সপুষ্পক উদ্ভিদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনের কাছে অবস্থিত তালিপামগাছটি ১৯৭৯ সালে কেটে ফেলার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত একটি তালিপামগাছকে পৃথিবীর সর্বশেষ বন্য তালিপাম সদস্য বলে অভিহিত করেন উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা। এ প্রজাতিকে ২০০১ সালে অতিবিপন্ন হিসেবে ঘোষণা করেন তাঁরা। ৬০ বছরাধিক বয়সে উদ্ভিদটিতে ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে ফুল ধরে এবং ২০১২ সালে মারা যায়। এ বীজ থেকে ৫০০টি চারা উৎপাদন করে বন বিভাগের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় রোপণ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যান ও মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে রোপণ করা হয়েছে। এভাবে Ex situ প্রক্রিয়ায় তালিপামের বংশধারা অব্যাহত রাখায় IUCN ২০১৩ সালে তালিপামকে Extinct in the wild ঘোষণা করেছে। বন্য অবস্থায় এ প্রজাতিটি পৃথিবীর অন্য কোথাও আছে কি না জানা যায়নি।

খুদে বড়লা, Knema benghalensis, গোত্র Myristicaceae

 

এটি মাঝারি আকারের গুপ্তবীজী উদ্ভিদ, যা শুধু বাংলাদেশেই পাওয়া যায়। এর স্ত্রী ও পুরুষ গাছ ভিন্ন। বাকল রেজিনযুক্ত ও সূক্ষ্ম দাগ আছে। এর কাণ্ডে ক্ষত হলে রক্তের মতো লাল কষ বের হয়। নতুন শাখা-প্রশাখাগুলো রোমযুক্ত। বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ। ১৯৫৭ সালে কক্সবাজারের ডুলাহাজারায় প্রথম আবিষ্কৃত হয়। এরপর ১৯৯৯ সালে আরেকটি গাছ পাওয়া যায় কক্সবাজারের আপার রিজু বনবিট অফিসের কাছে। এখনো খুদে বড়লার স্ত্রী গাছের সন্ধান পাওয়া যায়নি। রেড ডাটা বুক (২০০১) অনুযায়ী উদ্ভিদটি শঙ্কাকুল (Vulnerable)। প্রাকৃতিক পরিবেশে এ উদ্ভিদ আর আছে কি না তা নিয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা শঙ্কিত। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, যে জায়গায় গাছটি আবিষ্কৃত হয়েছে, সেখানে ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে স্ত্রী গাছ খুঁজে বীজ সংরক্ষণ, কলম বা টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে নতুন গাছ সৃষ্টি করে সংরক্ষণে জরুরি ভিত্তিতে এগিয়ে আসতে হবে।

মালাক্কা ঝাঁঝি, Aldrovanda vesiculosa, গোত্র Droseraceae

আরেক নাম পাতা ঝাঁঝি। শিকড়হীন নিমজ্জিত, রসালো ও ভাসমান গুপ্তবীজী উদ্ভিদ। কতগুলো স্বচ্ছ পাতাসহ একটি কাণ্ড থাকে। কাণ্ডের চারদিকে আটটি পাতা স্পোকের মতো সাজানো থাকে। উদ্ভিদটি ১০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। বসন্তকালে ছোট সাদা ফুল ফোটে। শিকার ধরার ফাঁদ থাকে পানির নিচে। পাতাগুলোই ফাঁদ হিসেবে কাজ করে। এগুলো ৬ মিলিমিটার লম্বা হয়। এসব ফাঁদে প্ল্যাংকটনজাতীয় আণুবীক্ষণিক উদ্ভিদ ও প্রাণী শিকার করে। এরা পাতার পরিচলন প্রক্রিয়ায় পানিতে দ্রুত চলাচল করতে পারে। ১৯৭৪ সালে উদ্ভিদটিকে প্রথম রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ধরাশের বিলে পাওয়া যায়। চলন বিল এবং গোপালগঞ্জের কোনো কোনো বিলেও এদের দেখা যেত। বাংলাদেশের Red Data Book (২০০১) এ উদ্ভিদকে বিপন্ন বলে চিহ্নিত করে। IUCN (২০১৩)-এর তালিকা অনুযায়ী এটি আগে ৪৩টি দেশে পাওয়া যেত। ২২টি দেশ থেকে এ উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়েছে। বাংলাদেশে এটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

কোরুদ, Licuala peltata, গোত্র Arecaceae

আরেক নাম কুরকুটি। ছোট আকৃতির গুপ্তবীজী উদ্ভিদ। এরা চিরসবুজ দলবদ্ধ পাম। লম্বায় ২-৩ মিটার, কাণ্ড ১৫ সেন্টিমিটার ব্যাসবিশিষ্ট। পত্রবৃন্ত প্রায় ১.৫ সেন্টিমিটার লম্বা, পত্রফলক প্রায় গোলাকার। এটি মিশ্র প্রকৃতির বনে আর্দ্র ছায়াযুক্ত স্থানে জন্মে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও সিলেটের বনে উদ্ভিদটি পাওয়া যায়। এ গাছের পাতা ঝাঁপি বা ছাতা বানিয়ে ব্যবহার করা হয়। ঘর ছাওয়ার কাজেও এর পাতার ব্যবহার রয়েছে। এর মূল মূত্রবর্ধক ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের বাইরে মিয়ানমার ও ভারতের বিহার, মণিপুর, ত্রিপুরা, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে এ উদ্ভিদ পাওয়া যায়। অতি আহরণ ও বসতি ধ্বংসের ফলে কোরুদ ক্রমে দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে। রেড ডাটা বুকের (২০০১) তথ্য অনুযায়ী কোরুদ গাছ অন্যতম শঙ্কাযুক্ত। জার্মপ্লাজম ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামের সাফারি পার্ক ও ইকোপার্কগুলোতে এ উদ্ভিদকে Ex situ conservation প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা