ভারতের উত্তর প্রদেশে অবস্থিত প্রাচীন বৌদ্ধ তীর্থস্থান সারনাথ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪৮তম অধিবেশনে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর ফলে ভারতের ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্য স্থানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫টিতে।
ইউনেস্কোর দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক ও প্রতিনিধি টিম কার্টিস এ স্বীকৃতিকে ভারত সরকার ও জনগণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে ভারত সরকার ও জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। আড়াই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে সারনাথ বিশ্বের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য তীর্থস্থান ও অনুপ্রেরণার উৎস। এখানেই গৌতম বুদ্ধ প্রথম ধর্মদেশনা দেন, যেখানে তিনি করুণা, প্রজ্ঞা ও শান্তির বাণী প্রচার করেছিলেন। সেই শিক্ষা আজও বিশ্বজুড়ে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সারনাথের মন্দির, স্তূপ ও বিহার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি এবং অভিন্ন মানবিক ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। এই অসাধারণ ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।’
বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন জনবসতিপূর্ণ নগরী বারাণসীতে অবস্থিত সারনাথের প্রত্নতাত্ত্বিক ও স্থাপত্য নিদর্শনগুলোই এই বিশ্ব ঐতিহ্য সম্পদের অন্তর্ভুক্ত। বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে বোধিলাভের পর গৌতম বুদ্ধ সারনাথে এসে তাঁর প্রথম পাঁচ শিষ্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সেখানেই প্রথম ধর্মদেশনা দেন। বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে এই ঘটনাকে ধর্মচক্র প্রবর্তনের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে সারনাথ বৌদ্ধ শিক্ষা, গবেষণা ও তীর্থযাত্রার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। বিভিন্ন রাজা, দাতা ও বৌদ্ধ ভিক্ষু সম্প্রদায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে অসংখ্য স্তূপ, মন্দির ও বিহার নির্মিত হয়। ফলে সারনাথ বিশ্বের চারটি প্রধান বৌদ্ধ তীর্থস্থানের একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
বর্তমানে এই ঐতিহ্যের প্রধান নিদর্শন দুটি সংরক্ষিত প্রত্নস্থল—চৌখণ্ডী স্তূপ (Chaukhandi Stupa) এবং সারনাথ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা (Archaeological Remains of Sarnath)। এর মধ্যে রয়েছে বিখ্যাত ধামেখ স্তূপ (Dhamek Stupa) ও ধর্মরাজিকা স্তূপ (Dharmarajika Stupa)। এসব নিদর্শন মিলিয়ে গড়ে উঠেছে ঐতিহাসিক ডিয়ার পার্ক (Deer Park)।
বৌদ্ধ ঐতিহ্যে এই স্থানটি ঋষিপতন (Rishipatana/Isipatana) বা মৃগদাব (Mrigadava) নামেও পরিচিত। বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটি ১৯৭২ সালের বিশ্ব ঐতিহ্য কনভেনশন বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা। তারা এমন সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়, যেগুলোর অসাধারণ সার্বজনীন মূল্য (Outstanding Universal Value) রয়েছে এবং যা সমগ্র মানবজাতির অভিন্ন ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত।
১৯৭২ সালে কনভেনশন গৃহীত হওয়ার পর থেকে বর্তমানে বিশ্বের ১৭০টি দেশে ১ হাজার ২৪৮টি সাংস্কৃতিক, প্রাকৃতিক ও মিশ্র বিশ্ব ঐতিহ্য ইউনেস্কোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।




