কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কম্পানি অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এআই এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে এটি মানুষের সাহায্য ছাড়াই নিজেকে উন্নত করবে এবং নিজের চেয়েও শক্তিশালী নতুন এআই তৈরি করতে পারে।
কম্পানিটি বলছে, এই ধারণাকে বলা হয় ‘রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট।’ অর্থাৎ, এআই নিজেই নিজের ক্ষমতা বাড়াবে এবং নতুন সংস্করণ তৈরি করবে, যেখানে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হবে না।
অ্যানথ্রপিক সতর্ক করেছে, এমন প্রযুক্তি বাস্তবে রূপ নিলে মানুষের পক্ষে এআই ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা আরো কঠিন হয়ে যেতে পারে। কম্পানিটির মতে, বর্তমানে এআইকে সফটওয়্যার উন্নয়নের কাজে ক্রমেই বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত কম্পিউটিং শক্তি থাকলে ভবিষ্যতে এমন সময় আসতে পারে, যখন একটি এআই ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের উন্নত সংস্করণ তৈরি করতে পারবে।
অ্যানথ্রপিক আরো জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত তাদের সফটওয়্যার কোডের ৮০ শতাংশেরও বেশি লিখেছে তাদের নিজস্ব এআই মডেল। একটি কোডবেস হলো কোনো সফটওয়্যার তৈরির, পরীক্ষা করার এবং রক্ষণাবেক্ষণের মূল কাঠামো বা ভিত্তি। তবে কম্পানিটি মনে করে, এআই যদি নিজেকে আরো উন্নত করতে পারে, তাহলে এর ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বিজ্ঞান, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে এটি বড় অগ্রগতি আনতে পারে।
অ্যানথ্রপিক বলেছে, আগামী কয়েক বছরে এআই প্রযুক্তির সক্ষমতা দ্রুত বাড়বে বলে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাদের মতে, নিজেকে তৈরি ও উন্নত করতে সক্ষম এআই প্রযুক্তির ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হতে পারে, যা যেমন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে, তেমনি নতুন ঝুঁকিও তৈরি করবে।
অ্যানথ্রোপিক সতর্ক করে বলেছে, ভবিষ্যতে যদি এআই নিজেই নিজের চেয়ে আরো উন্নত এআই তৈরি করতে পারে, তাহলে এসব প্রযুক্তিকে নিরাপদ রাখা, নজরদারিতে রাখা এবং নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
ফিউচার শিফট ল্যাবসের সহপ্রতিষ্ঠাতা সাগর বিষ্ণোই বলেন, এখন এআই ক্রমেই নিজের জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার কোড লিখতে শুরু করেছে। ফলে চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন প্রযুক্তি তৈরি নয়, বরং তা নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করাও। তার মতে, নিজেকে উন্নত করতে সক্ষম এআই প্রযুক্তির অগ্রগতি অনেক দ্রুত করতে পারে। তবে এর সঙ্গে নিরাপত্তা, জবাবদিহিতা এবং তদারকি নিয়ে নতুন উদ্বেগও তৈরি হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এআই যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তা যেনো মানুষের লক্ষ্য ও স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।
অ্যানথ্রোপিকের মতে, উন্নত এআই প্রযুক্তির বিকাশ নিয়ে বিশ্বের শীর্ষ এআই কম্পানিগুলোর মধ্যে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে কিছু সময়ের জন্য এ ধরনের প্রযুক্তির উন্নয়ন ধীর করা বা সাময়িক বিরতি দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে কম্পানিটি সতর্ক করে বলেছে, যদি শুধু কিছু প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন থামায় আর অন্যরা এগিয়ে যেতে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরো জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, বাস্তবে সব কম্পানিকে একসঙ্গে এআই উন্নয়ন থামাতে রাজি করানো কঠিন। কারণ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ভয় সব সময়ই থাকবে। এ কারণে অ্যানথ্রোপিকের গবেষণা বিভাগ নীতিনির্ধারক, গবেষক, সামাজিক সংগঠন এবং অন্যান্য এআই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে চায়। এসব আলোচনায় এআইয়ের ঝুঁকি, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় নিয়ে মতবিনিময় করা হবে।
অন্যদিকে, সবাই এআই নিয়ে সমানভাবে উদ্বিগ্ন নন। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এআই কখনোই পুরোপুরি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে না, কারণ প্রয়োজন হলে মানুষ সবসময় এসব ব্যবস্থা বন্ধ করে দিতে পারবে। তবে তারা এটাও মনে করেন, নিজেকে ক্রমাগত উন্নত করতে সক্ষম অত্যন্ত শক্তিশালী এআই মানবজাতির জন্য বড় উপকার বয়ে আনতে পারে, কিন্তু এর সঙ্গে কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও দেখা দিতে পারে।




