kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

নাজিব রাজাকের অর্থ কেলেঙ্কারি যেভাবে ছড়িয়েছিল এশিয়া থেকে হলিউড পর্যন্ত

অনলাইন ডেস্ক   

৫ আগস্ট, ২০২০ ১৪:৩২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নাজিব রাজাকের অর্থ কেলেঙ্কারি যেভাবে ছড়িয়েছিল এশিয়া থেকে হলিউড পর্যন্ত

কয়েকশ কোটি ডলারের অর্থ কেলেঙ্কারিতে মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বারো বছরের কারাদণ্ড হয়েছে।রাজাকের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত আনা দুর্নীতির সাতটি অভিযোগেই তিনি দোষী প্রমাণিত হয়েছেন। এই দুর্নীতিকে বলা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারিগুলোর অন্যতম, যার জাল জড়িয়ে পড়েছে এশিয়া থেকে হলিউড পর্যন্ত।

মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য ওয়ান মালয়েশিয়ান ডেভেলপমেন্ট বেরহাদ বা ওয়ানএমডিবি রাষ্ট্রীয় তহবিল গঠন করা হয় ২০০৯ সালে যখন নাজিব রাজাক দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। মালয়েশিয়ার জনগণকে সাহায্য করার জন্য গঠিত এই তহবিল থেকে কয়েকশ কোটি ডলার অর্থ হাওয়া হয়ে যায়।

আমেরিকান এবং মালয়েশীয় কৌঁসুলিরা বলেছেন, এই অর্থ কিছু ক্ষমতাশালী ব্যক্তির পকেটে গেছে। এছাড়াও তা দিয়ে কেনা হয়েছে বিলাসবহুল ভবন, ব্যক্তিগত জেটবিমান, ভ্যান গগ, মনের মত বিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের চিত্রকর্ম এবং নির্মাণ করা হয়েছে হলিউডের ব্লকবাস্টার হিট সিনেমা। এই সাড়ে চারশো কোটি ডলারের গেছে বিভিন্ন ব্যক্তির পকেটে।

এই ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে আছে অন্তত ছয়টি দেশ। বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেনের সন্ধানে তদন্ত চালানো হয়েছে সুইস ব্যাংক থেকে শুরু করে যেসব বিভিন্ন দ্বীপ রাষ্ট্র কর মওকুফের স্বর্গরাজ্য সেসব দ্বীপের ব্যাংকগুলোতে এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মূল কেন্দ্রে।

নাজিব রাজাক মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী আবদুল রাজাকের বড় ছেলে এবং দেশটির তৃতীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাইপো। রাজনৈতিক পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। নাজিব তার মাধ্যমিক স্কুলশিক্ষা শেষ করেন যুক্তরাজ্যের নামকরা বেসরকারি স্কুল মালর্ভান কলেজে। এরপর তিনি ইংল্যান্ডের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্পখাতের অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। ইসলামের "মধ্যপন্থা"কে গুরুত্ব দিয়ে তার কথাবার্তার কারণে তিনি ডেভিড ক্যামেরন এবং বারাক ওবামার মত পশ্চিমা নেতাদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন।

জুলাইয়ের ২৮ তারিখে ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারিতে জড়িত প্রথম সাতটি দুর্নীতির মামলায় ক্ষমতা অপব্যবহারের দায়ে তাকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয় এবং অর্থ সাদা করা ও বিশ্বাস ভঙ্গের দায়ে ছয়টি মামলার প্রত্যেকটির জন্য ১০ বছর করে তাকে জেল দেয়া হয়। সবগুলো কারাদণ্ডাদেশ একসাথে প্রযোজ্য হবে, তবে আপিল না করা পর্যন্ত এসব সাজা স্থগিত রাখা হচ্ছে।

এদিকে নাজিব রাজাকের স্ত্রী রোসমা মনসুরের খরচের অভ্যাসকে তুলনা করা হয় ফিলিপিন্সের ইমেলডা মার্কোস আর ফ্রান্সের রানি মারি আন্তোনেতের সাথে। তার স্বামী ক্ষমতা হারানোর পর ৬৭ বছর বয়স্ক রোসমা মনসুরের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং ও কর ফাঁকি দেবার জন্য আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়। তিনি অবশ্য নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন। মালয়েশিয়ায় তার বিলাসবহুল জীবন নিয়ে ঠাট্টামস্করা করা হয়।

২০১৮ সালে তার ও তার স্বামীর নামে কিছু ভবনে পুলিশের অভিযান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিরাট আলোড়ন ফেলে। তখনকার ছবিতে দেখা যায় যে সুপারমার্কেটে বাজার করার ট্রলি ভর্তি হয়ে আছে ৫০০টি দামী হাতব্যাগ, শত শত ঘড়ি আর ২৭কোটি ৩০ লক্ষ ডলার মূল্যের ১২ হাজার বিভিন্ন রকম গহনায়। এসব ছবি দেখে মালয়েশিয়ার মানুষের মনে আর সন্দেহ থাকে না যে নাজিব রাজাক পরিবার চরম বিলাসী জীবন যাপন করছে। এইসব জিনিস বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, কারণ ওয়ানএমডিবি দুর্নীতির সাথে জড়িত অবৈধ অর্থ দিয়ে বা অসৎ উপায়ে এসব জিনিসের মালিক তারা হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তাদের আইনজীবী অনুরোধ জানানোর পর মালয়েশিয়ার হাইকোর্ট এসব জিনিস তাদের দেখার অনুমতি দেয়।

কর্মব্যস্ত দ্বীপ পেনাং-এর বাসিন্দা চীনা বংশোদ্ভুত মালয়েশীয় অর্থব্যবসায়ী লো তায়েক ঝো সকলের কাছে বেশি পরিচিত ঝো লো নামে। মালয়েশিয়ান এবং আমেরিকান তদন্তকারীরা বলেছেন এই দুর্নীতি কেলেঙ্কারির মূল হোতা তিনিই।

এই দুর্নীতি নিয়ে ২০১৮ সালের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বই 'বিলিয়ন ডলার হোয়েল'-এর লেখক সাংবাদিক ব্র্যাডলি হোপ আর টম রাইট বলেছেন ঝো লো ছিলেন ঝানু ব্যবসায়ী আর তার পরিচিত বিশিষ্ট মানুষের গণ্ডীটা ছিল বিশাল। এ বইয়ে তারা লিখেছেন সে কারণেই কীভাবে তিনি এই দুর্নীতির জাল এতটা ছড়াতে সফল হয়েছিলেন।

"ঝো লো এই ওয়ানএমডিবি ঘটনার সবচেয়ে বড় ওস্তাদ, সব নাটের রহস্যময় গুরু," বিবিসিকে বলেছেন হোপ। "গোড়া থেকে এটা স্পষ্ট ছিল যে এই তহবিলের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের মাঝে যোগাযোগের সূত্র হলেন ঝো লো এবং এই গোটা কয়েক বিলিয়ন ডলার প্রকল্পের সমস্ত খুঁটিনাটি একমাত্র যে একজন ব্যক্তির নখদর্পণে ছিল তিনি হলেন ঝো লো।"

যুক্তরাষ্ট্রের কৌঁসুলিরা বলছেন মি. লো রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সাথে তার যোগাযোগ ব্যবহার করে কোটি কোটি ডলার ঘুষের বিনিময়ে এই ওয়ানএমডিবি প্রকল্পের জন্য ব্যবসা নিয়ে আসতেন। আরব রাজপরিবারের উঁচু মহলের সাথে ঘনিষ্ঠতা আর প্রথম সারির তারকাদের সাথে দহরম-মহরম তাকে দ্রুত সাফল্যের শিখরে উঠতে সাহায্য করেছিল। ব্যবসার সাথে জাঁকজমকপূর্ণ বিনোদনকে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়ানোর জন্য সুপরিচিত ছিলেন ঝো লো। সেই অর্থ ব্যবহার করে কেনা হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দামী কিছু বিলাসবহুল ভবন, বিখ্যাত বহুমূল্য চিত্রকর্ম এবং তৈরি করা হয়েছে হলিউডের বিশাল বাজেটের ছবি।

নাজিব ক্ষমতা হারানোর পর লোর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা আনা হয়। বর্তমানে তিনি পলাতক এবং পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশ তাকে খুঁজছে।

মালয়েশিয়ার ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারির সাথে জড়িয়ে নেই শুধু ক্ষমতাশালী রাজনীতিক আর অর্থ ব্যবসায়ীরা। পলাতক ব্যবসায়ী ঝো লো প্রায়ই হলিউডের প্রথম সারির তারকাদের সাথে পার্টি করে বেড়াতেন। তাদের বিরুদ্ধে অবশ্য এখনও পর্যন্ত অনিয়মের কোনরকম অভিযোগই আনা হয়নি। কিন্তু মি. লোর সাথে তাদের সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে একাধিকবার লেখালেখি হয়েছে।

সূত্র:বিবিসি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা