উত্তর আয়ারল্যান্ডের দীর্ঘ সংঘাতময় ইতিহাসের পরও সমাজে বিভাজনের বিভিন্ন রূপ এখনও বিদ্যমান। রাজধানী বেলফাস্টে সাম্প্রতিক সহিংসতা অভিবাসী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভয় ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, বেলফাস্টে অভিবাসী বলে ধারণা করা ব্যক্তিদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে । মুখোশধারী কয়েকটি দল শহরের বিভিন্ন এলাকায় তাণ্ডব চালানোর পর অনেক পরিবার ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
সহিংসতার সূত্রপাত
গত মঙ্গলবার ছুরিকাঘাতের ঘটনায় একজন সুদানি নাগরিকের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। পরে ওই রাতেই বেলফাস্টের কয়েকটি এলাকায় মুখোশধারী একটি দল ঘুরে ঘুরে বাড়ি ও গাড়িতে আগুন দেয়। একই সঙ্গে জাতিগত সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। পরদিন বুধবারও বিচ্ছিন্নভাবে অনেক সহিংসতার ঘটনা ঘটে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ সরকারের উত্তর আয়ারল্যান্ডবিষয়ক মন্ত্রী হিলারি বেন এসব হামলাকে ‘বর্ণবাদী সন্ত্রাসী তৎপরতা’ বলে অভিহিত করেছেন।
যুদ্ধ থেকে পালিয়ে এসেও নিরাপত্তাহীন
২০১৬ সালে সুদান থেকে শরণার্থী হিসেবে উত্তর আয়ারল্যান্ডে যান তওয়াসুল মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘অনেক নারী ও শিশু ভয়াবহ মানসিক চাপে রয়েছে। আমরা সন্তানদের ঘরেই রাখছি। এসব ঘটনার পর থেকে আমি আমার সন্তানদের স্কুলে পাঠাইনি।’
তার মতে, যেসব মানুষ যুদ্ধ ও সংঘাত থেকে বাঁচতে নিজেদের দেশ ছেড়ে এখানে এসেছেন, তাদের জন্য এই পরিস্থিতি পুরোনো দুঃসহ স্মৃতিকে আবারও ফিরিয়ে এনেছে।
ওই দেশে অবস্থান নিয়ে আবাসন সংকট বা স্বাস্থ্যসেবার সংকট তৈরি করিনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অভিবাসীরা কোনো সমস্যা নয়। আমরা সবাই এই সমাজের অংশ হতে চাই এবং এর উন্নয়নে অবদান রাখতে চাই।’

বার্তা সংস্থা আলজাজিরা বলছে, সুদান থেকে আসা তিন সন্তানের মা জেইনাব। তার বাড়ির কাছে পূর্ব বেলফাস্টে সহিংসতা শুরু হয়। এ অবস্থায় আতঙ্কিত হয়ে পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে তিনি একটি এনজিও—আনাকা উইমেনস কালেকটিভের সহায়তা চান।
শেষ মেষ অন্য অনেক বর্ণবাদী হামলার শিকার মানুষের মতো তিনিও একটি আইরিশ পরিবারের আশ্রয় পান এবং বর্তমানে বেলফাস্টের বাইরে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করছেন।
জেইনাব বলেন, ‘এখানে আমরা অনুভব করেছি যে এখানে সবাই বিদেশিদের অপছন্দ করে না। এখনও ভালো মানুষ আছে—যারা আমাদের ভালোবাসে, নিজেদের ঘর আমাদের জন্য খুলে দিয়েছে। তারা আমাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ভাগ করে নিয়েছে। দুর্বল মুহূর্তে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং আমাদের আশ্রয় দিয়েছে।’
কর্মস্থলে হয়রানি
সরকারি খাতের শ্রমিক ইউনিয়ন ইউনিসনের আঞ্চলিক সচিব প্যাট্রিসিয়া ম্যাককিওন জানান, সহিংসতার আশঙ্কায় অন্তত ৩০টি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে।
তার অভিযোগ, কিছু এলাকায় স্বঘোষিত পাহারাদার দল রাস্তায় মানুষের পরিচয় যাচাই করছে। বিশেষ করে হাসপাতালের বাইরে কর্মীদের থামিয়ে তাদের পরিচয় জানতে চাওয়া, ভিডিও ধারণ করা এবং অনুসরণ করার ঘটনা ঘটছে।

তিনি বলেন, ‘গত রাতে শহরের পূর্বাঞ্চলের একটি বড় হাসপাতালে চার মুখোশধারী ব্যক্তি এক নার্সকে ধাওয়া করেছে। এসব ঘটনা সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।’
সংকটের মধ্যেও মানবিকতা
তবে সহিংসতার মধ্যেও অনেক সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিন বছর আগে ভারত থেকে উত্তর আয়ারল্যান্ডে আসা রুচিরা রঙ্গপ্রসাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য রান্না করা খাবার সরবরাহের ঘোষণা দিলে ব্যাপক সাড়া পান।
তিনি জানান, ৩০ জনেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবক খাদ্য বিতরণে সহযোগিতা করেছেন। গত বুধবার কয়েক ডজন খাদ্য প্যাকেট ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
রুচিরা বলেন, মানুষ ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছে। কিন্তু খাবার একটি মৌলিক প্রয়োজন, বিশেষ করে পুষ্টিকর ঘরে তৈরি খাবার। তাই আমি ভেবেছি, রান্না করে মানুষকে সাহায্য করি।’
‘ঘৃণা ছড়ানো লোকেরা সংখ্যালঘু’
বেলফাস্ট ইসলামিক সেন্টারের নির্বাহী কমিটির সদস্য কাশিফ আকরাম বলেন, ‘সাম্প্রতিক সহিংসতা হৃদয়বিদারক হলেও এটি পুরো বেলফাস্টের চিত্র নয়।’
জন্মসূত্রে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বাসিন্দা আকরাম বলেন, ‘বেলফাস্টে অনেক ভালো মানুষ আছেন। যারা এখন ঘৃণা ছড়াচ্ছে, তারা সংখ্যায় খুবই কম। প্রকৃতপক্ষে তারাই সংখ্যালঘু।’
প্রসঙ্গত, উত্তর আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ ও রক্তাক্ত সংঘাত ‘দ্য ট্রাবল্স’ নামে পরিচিত। ১৯৬০-এর দশকের শেষ থেকে শুরু হয়ে ১৯৯৮ সালের ‘গুড ফ্রাইডে’ চুক্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
মূলত যুক্তরাজ্যে থাকা বা না থাকা নিয়ে আয়ারল্যান্ডের এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। উত্তর আয়ারল্যান্ডের দুটি প্রধান গোষ্ঠীর মধ্যে এই বিরোধ ছিল। তারা মধ্যে ইউনিয়নবাদী বা প্রোটেস্ট্যান্ট- যারা নিজেদের ব্রিটিশ মনে করে এবং যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবে থাকতে চেয়েছিল। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী বা ক্যাথলিক- যারা আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সাথে যুক্ত হয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ড গঠন করতে চেয়েছিল।
প্রায় তিন দশক ধরে চলা এই সংঘর্ষে আধা-সামরিক বাহিনী, পুলিশ এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর মধ্যে নিয়মিত বোমা হামলা, হত্যাকাণ্ড ও সংঘাত হয়েছে। এতে সাড়ে ৩ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সবশেষ ১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তির ফলে উভয় পক্ষ অস্ত্র সমর্পণ করে এবং ক্ষমতা ভাগাভাগির সরকার গঠিত হয়।




