যারা জি-৭ ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মূল্যসীমা মানবেন, তাদের কাছে জ্বালানি সরবরাহ না করার মেয়াদ আরো বাড়িয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এ নিষেধাজ্ঞা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা ছিল। পুতিন সেটা ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। গত শুক্রবার প্রেসিডেন্টের এক নির্বাহী আদেশে এ তথ্য জানানো হয়। আদেশে বলা হয়, কোনো বিদেশি কম্পানি বা ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তিতে যদি মূল্যসীমা নির্ধারণের কোনো শর্ত থাকে, তবে তাদের কাছে রাশিয়ার তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য সরবরাহ করা নিষিদ্ধ থাকবে। এই নিষেধাজ্ঞা চূড়ান্ত ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহের সব কয়টি ধাপের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর জি৭ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার জ্বালানি কেনার ওপর মূল্যসীমা আরোপ করে। প্রথমে ক্রুড অয়েলের ব্যারেল প্রতি সর্বোচ্চ মূল্য ৬০ ডলার নির্ধারণ করা হলেও পরে তা কমিয়ে আনা হয় ৪৪ ডলার ১০ সেন্টে। বেঁধে দেওয়া এ দামের চেয়ে বেশি দামে কেউ রাশিয়ার তেল কিনলে তারা পশ্চিমা জাহাজ পরিবহন ও বীমা সুবিধা পাবেন না। জ্বালানি তেল বিক্রি থেকে রাশিয়ার আয় কমিয়ে তাদের চাপে ফেলার জন্যই পশ্চিমারা এ মূল্যসীমা আরোপ করেছিল। রাশিয়া হলো অন্যতম শীর্ষ জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ। আর শিপিং এবং বীমা সুবিধার বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে পশ্চিমা দেশগুলো। পশ্চিমারা ভেবেছিল, মূল্যসীমা বেঁধে দিলে রাশিয়া প্রবল চাপে পড়বে, তাদের আয় কমে যাবে এবং রাশিয়া পশ্চিমাদের কাছে নতি স্বীকার করবে। কিন্তু ঘটনা ঘটেছে উল্টো। রাশিয়া ব্যাপারটিকে নিয়েছে নিজেদের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে। তাদের তেলের দামের সীমা বেঁধে দেবে পশ্চিমারা, এটা মানতে পারেননি পুতিন। উল্টো তিনি যারা পশ্চিমাদের মূল্যসীমা মানবেন তাদের কাছে তেল বিক্রি বন্ধ করে দেন। ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে রাশিয়া এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। দফায় দফায় নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বেড়েছে। সর্বশেষ বাড়ল গত শুক্রবার। রাশিয়া স্পষ্ট করে দিয়েছে, প্রয়োজনে তারা তেল উৎপাদন কমিয়ে দেবে, তবুও পশ্চিমাদের বেঁধে দেওয়া মূল্যসীমা মানবে না।
মূল্যসীমা আরোপের মাধ্যমে রাশিয়াকে চাপে ফেলতে চাইলেও উল্টো চাপে পড়েছে পশ্চিমারা। তাদের এখন চড়া দামে দূর থেকে তেল কিনতে হচ্ছে। মূল্যসীমার পাল্টা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাশিয়া পশ্চিমাদের উল্টো চাপে ফেলেছে। পশ্চিমারা জ্বালানি তেলের মূল্যসীমা বেঁধে দেওয়ায় শুরুতে রাশিয়ার অর্থনীতিও প্রবল চাপের মুখে পড়েছিল। তবে রাশিয়া দ্রুত কৌশল পাল্টে চাপ কমিয়ে নেয়। ইউরোপ থেকে তারা বাজার সরিয়ে এনেছে এশিয়ায়। চীন, ভারত এখন রাশিয়ার তেলের বড় ক্রেতা। এখানে দুপক্ষেরই লাভ। রাশিয়া তার তেলের জন্য বড় বিকল্প বাজার পেয়ে গেছে। আবার চীন, ভারতও বাজারমূল্য থেকে কম দামে তেল কিনতে পারছে। তবে ছাড় দিয়েও রাশিয়া চীন-ভারতের কাছে যে দামে তেল বিক্রি করছে, তাও পশ্চিমাদের বেধে দেয়া মূল্যসীমার চেয়ে বেশি। ফলে রাশিয়া দ্রুত তাদের চাপ কমিয়ে ফেলতে পেরেছে। কিন্তু পশ্চিমাদের তেল কিনতে হচ্ছে চড়া দামেই।
আর পশ্চিমা শিপিং পরিবহন ও বিমা সুবিধাকে ফাঁকি দিতে রাশিয়া শ্যাডো ফ্লিট বা ছদ্মবেশী জাহাজের বিশাল বহর সমূদ্রে নামায়। তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নামে নিবন্ধিত এসব পুরোনো ট্যাংকারের বিমা সুবিধা দিচ্ছে রাশিয়া। শ্যাডো ফ্লিটের মাধ্যমে রাশিয়া কার্যত পশ্চিমাদের মূল্যসীমার অস্ত্র, জাহাজ পরিহন ও বিমা সুবিধার অস্ত্রকে অকার্যকর করে ফেলেছে। চীন ও ভারতের সাথে রাশিয়ার বেচাকেনা হয় ইউয়ান ও রুপিতে। ফলে অস্ত্র হিসেবে ডলারের ধারও অনেকটা কমিয়ে আনতে পেরেছে রাশিয়া। ফলে রাশিয়াকে দুর্বল করতে পশ্চিমাদের আরোপ করা জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ মূল্যসীমা উল্টো রাশিয়াকে আরো শক্তিশীলী ও কৌশলী করেছে। তারা বিকল্প বাজার খুঁজে পেয়েছে, ডলারের ধার কমছে আর পশ্চিমাদের জ্বালানি কেনার খরচ বাড়ছে।





