বর্তমান সময়ে তরুণদের কাছে টাইগার, স্পিড, রেডবুলসহ বিভিন্ন এনার্জি ড্রিংকস বেশ জনপ্রিয়। ক্লান্তি দূর করা, কর্মক্ষমতা বাড়ানো কিংবা সতেজ অনুভব করার উদ্দেশ্যে অনেকেই এসব পানীয় পান করে থাকেন। তবে সচেতন মুসলমানদের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন জাগে—এসব এনার্জি ড্রিংকস পান করা কি ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েজ?
ইসলাম মানুষের খাদ্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রদান করেছে। আল্লাহ তাআলা যা হালাল করেছেন, তা বিনা প্রমাণে হারাম বলা যেমন বৈধ নয়; তেমনি যা হারাম করেছেন, তা হালাল বলাও গুরুতর অপরাধ। তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে কোরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামী ফিকহের মূলনীতির আলোকে।
ইসলামে খাদ্য ও পানীয় সম্পর্কে মূলনীতি হলো—সবকিছুই বৈধ, যতক্ষণ পর্যন্ত কোরআন, সুন্নাহ বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে তা হারাম প্রমাণিত না হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি তাদের জন্য পবিত্র ও উত্তম বস্তুসমূহ হালাল করেন এবং অপবিত্র ও নিকৃষ্ট বস্তুসমূহ হারাম করেন।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৫৭)
আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন, আমার প্রতি যা ওহি করা হয়েছে, তাতে আমি কোনো ভক্ষণকারীর জন্য কোনো খাদ্যকে হারাম পাই না; তবে মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত কিংবা শূকরের গোশত হলে তা হারাম।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৪৫)
এনার্জি ড্রিংকসের বিধান কী?
টাইগার, স্পিড, রেডবুল বা এ ধরনের অধিকাংশ এনার্জি ড্রিংকসে সাধারণত ক্যাফেইন, চিনি, ভিটামিন ও অন্যান্য বৈধ উপাদান ব্যবহার করা হয়। যদি কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য বা প্রমাণ দ্বারা নিশ্চিতভাবে জানা না যায় যে, এসব পানীয়তে হারাম কোনো উপাদান (যেমন—মাদক, নেশাজাতীয় অ্যালকোহল বা হারাম প্রাণীর উপাদান) ব্যবহার করা হয়েছে, তাহলে এসব পান করা শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ। শুধুমাত্র গুজব, সন্দেহ বা অনুমানের ভিত্তিতে কোনো খাদ্য বা পানীয়কে হারাম বলা বৈধ নয়।
অ্যালকোহল লেখা না থাকলে কী হবে?
বর্তমানে বাজারে প্রচলিত অধিকাংশ এনার্জি ড্রিংকসের গায়ে অ্যালকোহল উপাদান উল্লেখ থাকে না। যদি নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত না হয় যে, এতে নেশাজাতীয় হারাম অ্যালকোহল রয়েছে, তাহলে কেবল সন্দেহের কারণে একে হারাম বলা যাবে না। ইসলামী ফিকহে একটি প্রসিদ্ধ নীতি হলো, ‘যেকোনো বস্তুর মূল বিধান হলো বৈধতা।’ (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪৫৯)
অর্থাৎ কোনো বস্তু হারাম হওয়ার জন্য সুস্পষ্ট দলিল প্রয়োজন। দলিল না থাকলে সেটিকে হালাল হিসেবেই গণ্য করা হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ কিছু বিষয় ফরজ করেছেন, সেগুলো নষ্ট কোরো না; কিছু সীমারেখা নির্ধারণ করেছেন, তা অতিক্রম কোরো না। আর কিছু বিষয় সম্পর্কে নীরব থেকেছেন—এটি তোমাদের প্রতি রহমতস্বরূপ, ভুলে যাওয়ার কারণে নয়। তাই সেসব বিষয়ে অযথা অনুসন্ধান কোরো না।’ (সুনানে দারাকুতনি, হাদিস : ৪৩৯৬)
কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—
১. যদি কোনো এনার্জি ড্রিংকসে নিশ্চিতভাবে হারাম উপাদান মিশ্রিত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তা পান করা বৈধ হবে না।
২. অতিরিক্ত ক্যাফেইন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই তা পরিহার করা জরুরি।
৩. যেসব পানীয় শরীরের জন্য নিশ্চিত ক্ষতিকর বা চিকিৎসকের নিষেধ রয়েছে, সেগুলো থেকে বিরত থাকাই ইসলামের শিক্ষা।
সুতরাং শরিয়তের দৃষ্টিতে টাইগার, স্পিড, রেডবুলসহ প্রচলিত এনার্জি ড্রিংকসের মধ্যে যদি নিশ্চিতভাবে কোনো হারাম উপাদান বা নেশাজাতীয় বস্তু থাকার প্রমাণ না থাকে, তাহলে সেগুলো পান করা জায়েজ। ইসলামের মূলনীতি হলো—কোনো বস্তুকে দলিল ছাড়া হারাম বলা যাবে না। একই সঙ্গে একজন মুসলিমের উচিত হালাল-হারামের ব্যাপারে সচেতন থাকা, স্বাস্থ্য রক্ষা করা এবং সব ক্ষেত্রে পরিমিতি অবলম্বন করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল রিজিক গ্রহণ এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।




