• ই-পেপার

মানুষের ভাগ্য কি পরিবর্তনশীল, ইসলাম কী বলে ?

টাইগার, স্পিড, রেডবুলসহ বিভিন্ন এনার্জি ড্রিংকস পান করা কি জায়েজ?

মুফতি ওমর বিন নাছির
টাইগার, স্পিড, রেডবুলসহ বিভিন্ন এনার্জি ড্রিংকস পান করা কি জায়েজ?
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান সময়ে তরুণদের কাছে টাইগার, স্পিড, রেডবুলসহ বিভিন্ন এনার্জি ড্রিংকস বেশ জনপ্রিয়। ক্লান্তি দূর করা, কর্মক্ষমতা বাড়ানো কিংবা সতেজ অনুভব করার উদ্দেশ্যে অনেকেই এসব পানীয় পান করে থাকেন। তবে সচেতন মুসলমানদের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন জাগে—এসব এনার্জি ড্রিংকস পান করা কি ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েজ?

ইসলাম মানুষের খাদ্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রদান করেছে। আল্লাহ তাআলা যা হালাল করেছেন, তা বিনা প্রমাণে হারাম বলা যেমন বৈধ নয়; তেমনি যা হারাম করেছেন, তা হালাল বলাও গুরুতর অপরাধ। তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে কোরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামী ফিকহের মূলনীতির আলোকে।

ইসলামে খাদ্য ও পানীয় সম্পর্কে মূলনীতি হলো—সবকিছুই বৈধ, যতক্ষণ পর্যন্ত কোরআন, সুন্নাহ বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে তা হারাম প্রমাণিত না হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি তাদের জন্য পবিত্র ও উত্তম বস্তুসমূহ হালাল করেন এবং অপবিত্র ও নিকৃষ্ট বস্তুসমূহ হারাম করেন।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৫৭)

আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন, আমার প্রতি যা ওহি করা হয়েছে, তাতে আমি কোনো ভক্ষণকারীর জন্য কোনো খাদ্যকে হারাম পাই না; তবে মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত কিংবা শূকরের গোশত হলে তা হারাম।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৪৫)

এনার্জি ড্রিংকসের বিধান কী?
টাইগার, স্পিড, রেডবুল বা এ ধরনের অধিকাংশ এনার্জি ড্রিংকসে সাধারণত ক্যাফেইন, চিনি, ভিটামিন ও অন্যান্য বৈধ উপাদান ব্যবহার করা হয়। যদি কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য বা প্রমাণ দ্বারা নিশ্চিতভাবে জানা না যায় যে, এসব পানীয়তে হারাম কোনো উপাদান (যেমন—মাদক, নেশাজাতীয় অ্যালকোহল বা হারাম প্রাণীর উপাদান) ব্যবহার করা হয়েছে, তাহলে এসব পান করা শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ। শুধুমাত্র গুজব, সন্দেহ বা অনুমানের ভিত্তিতে কোনো খাদ্য বা পানীয়কে হারাম বলা বৈধ নয়।

অ্যালকোহল লেখা না থাকলে কী হবে?
বর্তমানে বাজারে প্রচলিত অধিকাংশ এনার্জি ড্রিংকসের গায়ে অ্যালকোহল উপাদান উল্লেখ থাকে না। যদি নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত না হয় যে, এতে নেশাজাতীয় হারাম অ্যালকোহল রয়েছে, তাহলে কেবল সন্দেহের কারণে একে হারাম বলা যাবে না। ইসলামী ফিকহে একটি প্রসিদ্ধ নীতি হলো, ‘যেকোনো বস্তুর মূল বিধান হলো বৈধতা।’ (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪৫৯)

অর্থাৎ কোনো বস্তু হারাম হওয়ার জন্য সুস্পষ্ট দলিল প্রয়োজন। দলিল না থাকলে সেটিকে হালাল হিসেবেই গণ্য করা হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ কিছু বিষয় ফরজ করেছেন, সেগুলো নষ্ট কোরো না; কিছু সীমারেখা নির্ধারণ করেছেন, তা অতিক্রম কোরো না। আর কিছু বিষয় সম্পর্কে নীরব থেকেছেন—এটি তোমাদের প্রতি রহমতস্বরূপ, ভুলে যাওয়ার কারণে নয়। তাই সেসব বিষয়ে অযথা অনুসন্ধান কোরো না।’ (সুনানে দারাকুতনি, হাদিস : ৪৩৯৬)

কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—
১. যদি কোনো এনার্জি ড্রিংকসে নিশ্চিতভাবে হারাম উপাদান মিশ্রিত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তা পান করা বৈধ হবে না।
২. অতিরিক্ত ক্যাফেইন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই তা পরিহার করা জরুরি।
৩. যেসব পানীয় শরীরের জন্য নিশ্চিত ক্ষতিকর বা চিকিৎসকের নিষেধ রয়েছে, সেগুলো থেকে বিরত থাকাই ইসলামের শিক্ষা।

সুতরাং শরিয়তের দৃষ্টিতে টাইগার, স্পিড, রেডবুলসহ প্রচলিত এনার্জি ড্রিংকসের মধ্যে যদি নিশ্চিতভাবে কোনো হারাম উপাদান বা নেশাজাতীয় বস্তু থাকার প্রমাণ না থাকে, তাহলে সেগুলো পান করা জায়েজ। ইসলামের মূলনীতি হলো—কোনো বস্তুকে দলিল ছাড়া হারাম বলা যাবে না। একই সঙ্গে একজন মুসলিমের উচিত হালাল-হারামের ব্যাপারে সচেতন থাকা, স্বাস্থ্য রক্ষা করা এবং সব ক্ষেত্রে পরিমিতি অবলম্বন করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল রিজিক গ্রহণ এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

শতাব্দীর প্রাচীনতম সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দরগাহ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
শতাব্দীর প্রাচীনতম সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দরগাহ
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র সিলেটের দরগাহ। এখানেই শায়িত আছেন উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের অন্যতম অগ্রদূত শাহজালাল ইয়ামেনি (রহ.)। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দরগাহ শুধু একটি সমাধিস্থল নয়; বরং এটি ইসলামের ইতিহাস, আধ্যাত্মিক সাধনা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত স্মারক হিসেবে পরিচিত।

আরব থেকে সিলেটে
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, মহান আল্লাহর নির্দেশনা স্বপ্নে লাভ করার পর শাহজালাল (রহ.) সুদূর ইয়েমেন থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেটে আগমন করেন। সে সময় সিলেটে হিন্দু রাজা গৌড়গোবিন্দের শাসন চলছিল। নানা প্রতিরোধ, অগ্নিবাণ ও কৌশল ব্যর্থ করে শাহজালাল (রহ.) এবং তাঁর সাহসী সঙ্গীরা সিলেট বিজয় করেন।

এই বিজয়ের পর শ্রীহট্ট নতুন পরিচয়ে ‘জালালাবাদ’ নামে খ্যাতি লাভ করে এবং এ অঞ্চলজুড়ে ইসলামের শিক্ষা, দাওয়াত ও নৈতিক আদর্শের প্রসার শুরু হয়। পরবর্তীতে তাঁর সঙ্গীর সংখ্যা ৩৬০ জনে উন্নীত হয়। তাঁরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে ইসলাম প্রচার, শিক্ষা বিস্তার এবং নতুন মুসলমানদের দ্বীনি প্রশিক্ষণে আত্মনিয়োগ করেন। শাহজালাল (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক মর্যাদা এতটাই সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল যে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁর সাক্ষাৎ লাভে ছুটে আসতেন। এমনকি বিশ্বখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতাও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজের ভ্রমণবৃত্তান্তে তাঁর প্রশংসা লিপিবদ্ধ করেন।

সিলেটকে খাজনামুক্ত ঘোষণা
সিলেট বিজয়ের পর দিল্লির সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ শাহজালাল (রহ.)-কে সিলেটের শাসনভার গ্রহণের প্রস্তাব দেন। কিন্তু ক্ষমতা ও রাজকীয় মর্যাদার প্রতি অনাসক্ত এই মহান সাধক সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর সুলতান বিশেষ ফরমান জারি করে সিলেট শহরকে খাজনামুক্ত ঘোষণা করেন এবং শাহজালাল (রহ.)-এর সম্মানে এ বিশেষ মর্যাদা প্রদান করেন। ঐতিহাসিক সূত্র মতে, এই বিশেষ মর্যাদার প্রভাব বহুদিন পর্যন্ত বহাল ছিল।
সুলতানি যুগ থেকে ব্রিটিশ শাসনের প্রারম্ভ পর্যন্ত এক ব্যতিক্রমী ঐতিহ্য প্রচলিত ছিল। দিল্লি থেকে যেসব শাসনকর্তা সিলেটে আসতেন, তাঁরা প্রথমে শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে উপস্থিত হয়ে জিয়ারত করতেন। এরপর দরগাহর খাদিমদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও পাগড়ি গ্রহণ করার পরই জনগণ তাঁদের শাসক হিসেবে গ্রহণ করত। ঐতিহাসিক শামসুল আলম সি.এস.পি তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, এই প্রথা সিলেটবাসীর হৃদয়ে শাহজালাল (রহ.)-এর গভীর সম্মান ও প্রভাবেরই প্রতিফলন।

যেভাবে নির্মিত হয়েছে শাহজালালের (রহ.) মাজার
বর্তমান দরগাহ টিলা বহু শতাব্দীর নির্মাণ ও সংস্কারের ফল। প্রাচীরবেষ্টিত স্থানে চার কোণে চারটি উঁচু স্তম্ভবিশিষ্ট সমাধিটি নির্মিত হয়েছে। সমাধির পশ্চিম পাশে রয়েছে একটি ছোট মসজিদ, যা পরবর্তীকালে ব্রিটিশ আমলে সিলেটের ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর উইলস পুনর্নির্মাণ করেন। সমাধির পূর্ব পাশে ইয়েমেনের যুবরাজ শেখ আলী এবং পশ্চিম পাশে গৌড়ের উজির মকবুল খানের কবর রয়েছে।

সুলতান ও মোগলদের নির্মাণে সমৃদ্ধ দরগাহ চত্বর
বর্তমান দরগাহ চত্বরের অধিকাংশ স্থাপনা বিভিন্ন সময়ে বাংলার সুলতান, মোগল সম্রাট এবং তৎকালীন শাসকদের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে। দক্ষিণ প্রবেশপথে রয়েছে চিল্লাখানা এবং শাহজালাল (রহ.)-এর কয়েকজন সঙ্গীর সমাধি। পাশেই শায়িত আছেন দরগাহর সাবেক মুতাওয়াল্লিরা। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে সিলেটের ফৌজদার ফরহাদ খান নির্মাণ করেন বিশাল গম্বুজ ভবন, যা আজও ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এর পাশেই রয়েছে ‘ঘড়িঘর’ নামে পরিচিত আরেকটি স্থাপনা।

ছয় শতাব্দীর পুরোনো দরগাহ মসজিদ
দরগাহ চত্বরে অবস্থিত বৃহৎ মসজিদটি বাংলার সুলতান আবু মুজাফফর ইউসুফ শাহের আমলে ১৪০০ খ্রিস্টাব্দে মন্ত্রী মজলিশে আতার নির্মাণ করেন। পরে ১৭৪৪ সালে বাহারাম খান ফৌজদারের সময় এটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এটি সিলেট শহরের অন্যতম প্রধান জুমার মসজিদ হিসেবে পরিচিত।

দরগাহ পুকুরের রহস্যময় গজার মাছ
দরগাহ টিলার নিচে অবস্থিত বড় পুকুরে আজও গজার মাছ অবাধে বিচরণ করে। দর্শনার্থীরা খাবার নিয়ে ডাক দিলে মাছগুলো তীরে ভিড় জমায়। লোককাহিনিতে প্রচলিত আছে, এই মাছগুলো শাহজালাল (রহ.)-এর সময় থেকেই সংরক্ষিত। যদিও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, তবুও এটি সিলেটের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।

বিশাল ডেগচি ও লঙ্গরখানার ইতিহাস
দরগাহ প্রাঙ্গণে এখনও সংরক্ষিত রয়েছে তামার তৈরি দুটি বিশাল ডেগচি। ইতিহাস অনুযায়ী, একেকটিতে একসঙ্গে সাতটি গরু ও সাত মন চাল রান্না করা সম্ভব। ডেগচির গায়ে উৎকীর্ণ ফারসি লিপি থেকে জানা যায়, জাহাঙ্গীরনগরের (বর্তমান ঢাকা) শেখ আবু সায়িদ ১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে এগুলো তৈরি করে মুরাদ বখশের মাধ্যমে দরগাহে পাঠিয়েছিলেন। একসময় এখানকার লঙ্গরখানায় ভ্রমণকারী, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা ছিল।

শাহজালাল (রহ.)-এর ব্যবহৃত ঐতিহাসিক নিদর্শন
দরগাহে সংরক্ষিত রয়েছে শাহজালাল (রহ.)-এর ব্যবহৃত বলে প্রচলিত কয়েকটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। এর মধ্যে রয়েছে তাঁর তরবারি, কাঠের খড়ম, হরিণের চামড়ার তৈরি জায়নামাজ, তামার প্লেট ও বাটি। তামার একটি বাটিতে আরবি ভাষায় কিছু লেখা রয়েছে। অনেক মানুষ এটিকে বরকতের নিদর্শন হিসেবে মনে করেন। তবে ইসলামী আকীদা অনুযায়ী রোগমুক্তি একমাত্র আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসে। কোনো বস্তু নিজস্ব ক্ষমতায় উপকার বা ক্ষতি করতে পারে—এমন বিশ্বাস শরিয়তসম্মত নয়।

শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ বাংলায় ইসলামের ইতিহাস, সুলতানি ও মোগল স্থাপত্য, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শত শত বছরের ইতিহাস বহনকারী এই দরগাহ আজও দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষের আগ্রহের কেন্দ্র। তবে এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার পাশাপাশি ইসলামের আকীদা অনুযায়ী আল্লাহর একত্ববাদকে অটুট রাখা এবং যেকোনো প্রকার অতিরঞ্জিত বা ভিত্তিহীন বিশ্বাস থেকে বিরত থাকাও একজন মুসলিমের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় মুমিনের করণীয়

মুফতি ওমর বিন নাছির
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় মুমিনের করণীয়
সংগৃহীত ছবি

পৃথিবী মহান আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি, আর এই বিশ্বজগতের প্রতিটি ঘটনা তাঁরই ইচ্ছা ও প্রজ্ঞার অধীন। কখনো ভূমিকম্প, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, খরা, অগ্নিকাণ্ড কিংবা মহামারির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। মুহূর্তের মধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা ঘরবাড়ি, হারিয়ে যেতে পারে অগণিত প্রাণ, সম্পদ ও স্বপ্ন। এসব দুর্যোগ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়—পৃথিবীতে মানুষের শক্তি, প্রযুক্তি ও সামর্থ্য যতই উন্নত হোক না কেন, আল্লাহর অসীম ক্ষমতার সামনে মানুষ চরম অসহায়।

ইসলাম প্রাকৃতিক দুর্যোগকে শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে নয়; বরং আত্মসমালোচনা, ঈমানের পরীক্ষা, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন এবং শিক্ষা গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো—দুর্যোগের সময় ধৈর্য ধারণ করা, আল্লাহর কাছে তাওবা ও ইস্তিগফার করা, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং নিজের জীবনকে আল্লাহর আনুগত্যের পথে পরিচালিত করা।

১. আল্লাহর ফয়সালার প্রতি ঈমান ও ধৈর্য ধারণ করা
মুমিন সর্বপ্রথম বিশ্বাস করবে যে, পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে, সবই আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্ধারণ অনুযায়ী ঘটে। আল্লাহ তাআলা বলেন, 

مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ۗ وَمَنْ يُؤْمِنْ بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ

অর্থ : আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদ আসে না। আর যে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, তিনি তার হৃদয়কে সঠিক পথ দেখান।’ (সুরা : তাগাবুন, আয়াত : ১১)
দুর্যোগের সময় হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

২. তাওবা, ইস্তিগফার পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষকে নিজের দুর্বলতা উপলব্ধি করায়। তাই এমন সময় আল্লাহর কাছে বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফার করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ

অর্থ : ‘তোমাদের ওপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। তবে তিনি অনেক অপরাধ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৩০)
এই আয়াত মানুষকে আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার শিক্ষা দেয়।

৩. আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা
দুর্যোগের সময় মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয় আল্লাহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিপদে-আপদে এ দোয়া পড়তেন, 

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫১৪)

৪. আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ

অর্থ : ‘আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।’(সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৫)


৫. দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো
প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য করা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবিক শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

وَاللَّهُ فِي عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِي عَوْنِ أَخِيهِ

অর্থ : ‘বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে, আল্লাহও ততক্ষণ তার সাহায্যে থাকেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)
অর্থ, খাদ্য, ওষুধ, আশ্রয় ও সান্ত্বনা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো একজন মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব।

৬. গুজব ও বিভ্রান্তি থেকে বিরত থাকা
দুর্যোগের সময় যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো খবর প্রচার করা উচিত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا

অর্থ : ‘হে মুমিনগণ! কোনো অবাধ্য ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৬)

৭. নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা
ইসলাম শুধু দোয়ার শিক্ষা দেয় না; বরং বাস্তবিক সতর্কতাও গ্রহণ করতে নির্দেশ দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

اعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ

অর্থ : ‘আগে তোমার উটটি বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৭)
অতএব দুর্যোগের সময় সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা, নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করাও ইসলামের শিক্ষা।

৮. দুর্যোগ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষকে দুনিয়ার অস্থায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এবং নিজের জীবন সংশোধনের একটি সুযোগ। আল্লাহ তাআলা বলেন, 

ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ

অর্থ : ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থল ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ৪১)
এই আয়াত আমাদেরকে আল্লাহভীরু জীবনযাপনের প্রতি আহ্বান জানায়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের অহংকার ভেঙে দিয়ে মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এগুলো কখনো পরীক্ষা, কখনো সতর্কবার্তা, আবার কখনো আত্মশুদ্ধির সুযোগ। তাই একজন মুমিনের উচিত আতঙ্ক বা হতাশায় ভেঙে না পড়ে ধৈর্য ধারণ করা, আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা, বেশি বেশি তাওবা-ইস্তিগফার ও দোয়া করা, গুজব থেকে বিরত থাকা, নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। মনে রাখতে হবে, দুর্যোগ কেবল ধ্বংসের বার্তা নয়; বরং এটি ঈমানকে দৃঢ় করা, মানবতার সেবা করা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনেরও এক মূল্যবান সুযোগ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের বিপদ-মুসিবত থেকে হেফাজত করুন, ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করুন। আমিন।

অন্তরের পবিত্রতা রক্ষায় মহামূল্যবান দুইটি দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
অন্তরের পবিত্রতা রক্ষায় মহামূল্যবান দুইটি দোয়া
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার ঈমান ও পরিশুদ্ধ অন্তর। বাহ্যিক সৌন্দর্য, ধন-সম্পদ কিংবা সামাজিক মর্যাদা মানুষকে আল্লাহর কাছে সম্মানিত করে না; বরং সম্মান ও সফলতার মূল ভিত্তি হলো আত্মশুদ্ধি (তাজকিয়াতুন নফস) ও তাকওয়া। আত্মশুদ্ধি এমন একটি অবিরাম সাধনা, যার মাধ্যমে মানুষ নিজের অন্তরকে হিংসা, অহংকার, রিয়া, লোভ ও পাপাচার থেকে মুক্ত করে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করে।

এ কারণেই বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) শুধু উম্মতকে আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দিয়েই ক্ষান্ত হননি; বরং তিনি নিজেও আল্লাহর কাছে বারবার আত্মার পবিত্রতা, তাকওয়া এবং ঈমানে অবিচল থাকার জন্য দোয়া করতেন। তেমনি দুটি দোয়া হলো-

১. অন্তরের পবিত্রতার দোয়া 

 اللَّهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا وَزَكِّهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلَاهَا

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা আতি নাফসি তাকওয়াহা, ওয়া জাক্কিহা আনতা খাইরু মান জাক্কাহা, আনতা ওয়ালিয়্যুহা ওয়া মাওলাহা।
অর্থ : হে আল্লাহ! আমার আত্মাকে তাকওয়া দান করুন এবং তাকে পরিশুদ্ধ করুন। আপনিই সর্বোত্তম পরিশুদ্ধকারী। আপনিই তার অভিভাবক ও মালিক। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭২২)

২. ঈমানে অবিচল থাকার দোয়া
আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি অন্তরকে দ্বীনের ওপর অটল রাখার জন্যও মহানবী (সা.) অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী একটি দোয়া করতেন—

يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ

উচ্চারণ : ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব, সাব্বিত ক্বালবী আলা দ্বীনিক।
অর্থ : ‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর সুদৃঢ় রাখুন।’(জামে তিরমিজি, হাদিস : ২১৪০)

মানুষের অন্তর মুহূর্তে মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়। তাই আল্লাহর মহানবী (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন, অন্তর যেন কখনো সত্যপথ থেকে বিচ্যুত না হয়—সেজন্য সর্বদা আল্লাহর কাছেই আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে।  আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে পরিশুদ্ধ অন্তর, অটল ঈমান এবং তাকওয়াপূর্ণ জীবন দান করুন। আমিন।