বাংলাদেশের বিপক্ষে বারবার মঞ্চ প্রস্তুত করেও উদযাপন করা হয় না পাকিস্তানের। আসলে প্রতিপক্ষের উদযাপনের মুহূর্তটা কেড়ে নেন লিটন দাস। আজও যেমন সিলেট টেস্টের প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল পাকিস্তানের সামনে। কিন্তু লিটন সেটা হতে দিলেন না।
পাকিস্তানকে পেলেই বাংলাদেশের ত্রাণকর্তা হন লিটন। বারবার খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তুলছেন তিনি। বিপরীতে পাকিস্তানের ‘যম’ হয়ে ওঠছেন উইকেটরক্ষক-ব্যাটার।
টেস্ট ক্যারিয়ারের ৬ সেঞ্চুরির তিনটিই পাকিস্তানের বিপক্ষে করেছেন লিটন। তিন অঙ্কের শুরুটাও পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০২১ সালে। চট্টগ্রামে অভিষেক সেঞ্চুরির ইনিংসটি খেলেন ১১৪ রানের। সেই ইনিংসটিও খেলেছেন এমন এক সময় যখন ৪৯ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ‘থরহরি কম্প’ বাংলাদেশের।
সেদিন মুশফিকুর রহিমকে (৯১) সঙ্গে নিয়ে পঞ্চম উইকেটে ২০৬ রানের জুটি গড়ে বাংলাদেশকে টেস্টে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করেছিলেন লিটন। তার সেঞ্চুরিতেই প্রথম ইনিংসে ৩৩০ রান করেছিল বাংলাদেশ। যদিও তার ১১ চার ও ১ ছক্কার ইনিংসটি পূর্ণতা পায়নি। কেননা দ্বিতীয় ইনিংসের ব্যাটিং ধ্বসে ৮ উইকেটের হার দেখেছিল বাংলাদেশ।
রাওয়ালপিন্ডিতে অবশ্য শুধু লিটনের ব্যাট হাসেনি, হেসেছে বাংলাদেশও। প্রতিপক্ষের বিপক্ষে প্রথমবার টেস্ট জয়ের সঙ্গে সিরিজও জিতেছে। সেটিও আবার তাদের মাটিতে। দুই টেস্টের সিরিজে পাকিস্তানকে ধবলধোলাই করাটা সম্ভব হয়েছে লিটনের অনবদ্য সেঞ্চুরির কারণে।
দলীয় ২৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের ইনিংস যখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে যাওয়ার পথে ঠিক তখনি বাধ সাধলেন লিটন। সপ্তম উইকেটে সিরিজসেরা মেহেদী হাসান মিরাজের (৭৮) সঙ্গে ১৬৫ রানের জুটি গড়েন ৩১ বছর বয়সী ব্যাটার। ১৩ চার ও ৪ ছক্কায় ১৩৮ রানের ইনিংস খেলে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশকে ২৬২ রানের সংগ্রহ এনে দেন। পরে দ্বিতীয় ইনিংসে পাকিস্তানের ব্যাটিং অর্ডার ধসিয়ে ৬ উইকেটের জয় পায় বাংলাদেশ।
আজ সিলেটেও বাংলাদেশের প্রায় একই পরিণতি হয়েছিল। স্কোরকার্ডে ১১৬ রান জমা হতেই ৬ উইকেট নেই নাজমুল হোসেন শান্তর দলের। সেখান থেকে তাইজুল ইসলাম ও শরীফুল ইসলামদের সঙ্গী করে বাংলাদেশকে লড়াইয়ের পুঁজি এনে দিলেন লিটন। দলের কঠিন মুহূর্তে যেভাবে ব্যাটিং করলেন তাতে মোহাম্মদ আব্বাস-খুররাম শেহজাদদের আনন্দ ফিকে হয়ে যায়। অথচ, একের পর এক উইকেট তুলে নিয়ে পাকিস্তানের বোলাররা তখন উড়ছিল সিলেটে।
পাকিস্তানের বোলারদের মাটিতে নামিয়ে পরে অবিশ্বাস্য এক সেঞ্চুরি হাঁকালেন লিটন। তিন অংকের ইনিংসের প্রতিটি বাউন্ডারি ছিল চোখে লেগের থাকার মতো। যেমনটা তার ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপের ব্যাটিং দেখে ইয়ান বিশপ বলেছিলেন, ‘লিটন যখন ব্যাট করে, মনে হয় মোনালিসার মত কোনো চিত্রকর্ম দেখছি।’ ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবদন্তি আজকের ইনিংসটি দেখলে হয়তো পুরোনো কথাই আরেকবার আওড়াবেন! পাকিস্তানের কিংবদন্তি রমিজ রাজা সিলেটের ধারাভাষ্যকক্ষ থেকে তো লিটনের ইনিংসটিকে এক শব্দে ‘মাস্টারক্লাসই’ বলে দিলেন।
১২৬ রানে থামার আগে মাঠের প্রায় চতুর্দিকে বল পাঠিয়েছেন লিটন। ১৬ চার ও ২ ছক্কার ইনিংসে কি ছিল না? হুক, পুল, সুইপ সবই খেলেছেন। তিন অংক যেমন স্পর্শ করলেন দারুণ এক কাভার ড্রাইভে। ইনিংসটি খেলার পথে অবশ্য দুইবার জীবন পেয়েছেন তিনি। ৩২ রানের সময় স্পিনার সাজিদ খানকে ক্যাচ দিয়ে প্রথমবার বেঁচে যান তিনি। অন্যদিকে ৫২ রানের সময় উইকেটরক্ষক মোহাম্মদ রিজওয়ান ক্যাচ ধরে আবেদন করলে আম্পায়ার সাড়া দেন না। তবে হাতে রিভিউ থাকার পরে না নেওয়ায় জীবন পান লিটন। কেননা পরে রিপ্লেতে দেখা যায় লিটনের গ্লাভসে লেগেছিল বল।
সবমিলিয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেছেন লিটন। ৭ টেস্টে ৬৫০ রান করেছেন তিনি। ৩ ছক্কার বিপক্ষে হাঁকিয়েছেন ২ ফিফটি। ৪৯২ রান নিয়ে দুইয়ে আছেন মুশফিক। কমপক্ষে ৭ টেস্ট খেলেছেন এমন দলের বিপক্ষেও সর্বোচ্চ ৫৯.০৯ গড় পাকিস্তানের বিপক্ষেই।
পাকিস্তানের বিপক্ষে এশিয়ার ব্যাটারদের মধ্যে সর্বোচ্চ গড়ের তালিকা করা হলেও সেখানে বেশ সমৃদ্ধ লিটনের পরিসংখ্যান। বাবর আজম-শান মাসুদদের বিপক্ষে কমপক্ষে ১০ ইনিংস ব্যাটিং করেছেন এমন ব্যাটারদের মধ্যে বীরেন্দর শেবাগ (৯১.১৪) ও কুমার সাঙ্গাকারার গড়ের (৭৪.৬৪) পরেই লিটনের অবস্থান।




