kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ অক্টোবর ২০২২ । ১৯ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

‘মৃত্যুর এক মাস আগে খেলাধুলা করার অনুমতি দিয়ে যান বাবা’

অনলাইন ডেস্ক   

১৬ আগস্ট, ২০২২ ২০:০১ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘মৃত্যুর এক মাস আগে খেলাধুলা করার অনুমতি দিয়ে যান বাবা’

কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের প্রথম হাইজাম্পার হিসেবে পদক জিতেছেন তেজস্বীন শঙ্কর। ছবি : সংগৃহীত

সদ্যঃসমাপ্ত কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের প্রথম হাইজাম্পার হিসেবে পদক জিতেছেন তেজস্বীন শঙ্কর। তার সফল অ্যাথলেট হয়ে ওঠার পথ সহজ ছিল না। বরং বাবার রক্তচক্ষুর আড়ালেই দিনের পর দিন তাকে অনুশীলন করতে হয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় সেই বাবার শেষ নির্দেশ মেনেই প্রতিদিন আরো বেশি উচ্চতায় লাফ দেওয়ার চেষ্টা করেন।

বিজ্ঞাপন

স্কুলজীবনেই তেজস্বীনের অ্যাথলেটিকসে হাতেখড়ি। তার বাবা হরিশঙ্কর ছিলেন আইনজীবী। খেলাধুলা নিয়ে তার আগ্রহ ছিল না। তিনি চাইতেন, ছেলে পড়াশোনা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক। বিশেষ করে অ্যাথলেটিকস ছিল তার ঘোর অপছন্দ। হরিশঙ্করের ধারণা ছিল, অ্যাথলেটিকসে সবাই বয়স লুকিয়ে খেলে। সবাই নিষিদ্ধ ওষুধ ব্যবহার করে। এসব তার পছন্দ ছিল না। তাই ছেলের অ্যাথলেট হওয়ার ইচ্ছায় সম্মতি দেননি। পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন, খেলার মাঠে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

বাবার নির্দেশ অমান্য করার সাহস ছিল না তেজস্বীনের। তাই স্কুল ছুটির পর বাকিদের সঙ্গে অনুশীলন করতে পারতেন না। বাড়ি ফিরতে দেরি হলে বাবার হাতে পিটুনি খেতে হবে। কিন্তু অ্যাথলেটিকস ছিল তার বড্ড প্রিয়। নিজেই উপায় বের করেন। বার্মিংহামে ব্রোঞ্জজয়ী বলেছেন, ‘স্কুলের আগে বা পরে অনুশীলন করার কোনো সুযোগ ছিল না আমার। বাবা জানতে পারলেই সমস্যা হতো। তাই টিফিনের সময় অনুশীলন করতাম। সেটা বাবা বুঝতে পারতেন না। সেভাবেই দিল্লির রাজ্য মিটের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। ’

তেজস্বীন আরো বলেন, “রাজ্য মিটে পদক জয়ের পর আন্ত রাজ্য মিটে সুযোগ পাই। ২০১৪ সালে জাতীয় স্কুল মিটেও সুযোগ পাই। তখন আর বাবাকে না জানিয়ে উপায় ছিল না। কারণ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য রাঁচি যেতে হতো। বাবা শুনেই রেগে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘তুমি কি সারা দিন এই সবই করো! পড়াশোনায় মন দাও একটু। ’ খেলা এবং পড়াশোনার মধ্যে একটা বেছে নিতে বলেন। ”

তখনই প্রথম জানতে পারেন, তার বাবা রক্তের ক্যান্সারে আক্রান্ত। তেজস্বীন বলেছেন, ‘বাবার ক্যান্সারের কথা জানতাম না। আমাকে তার আগে কেউই বলেনি। বাবাই প্রথম বলেন। তখন বাবার আর বাঁচার আশা ছিল না। চিকিৎসকরা জানিয়ে দিয়েছিলেন। বাবাও জানতেন সে কথা। সেটা জানুয়ারির শেষ বা ফেব্রুয়ারির শুরু হবে। ’ বাবাকে আর কষ্ট দিতে চাননি তেজস্বীন। তখন তার বয়স ১৫। ঠিক করেন বাবাকে একটি চিঠি লিখবেন। জানাবেন, পড়াশোনা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবেন।

যেমন ভাবা, তেমন কাজ। বাবাকে চিঠি দিয়ে তেজস্বীন জানিয়েছিলেন, আর কখনো অ্যাথলেটিকস করবেন না। জাতীয় স্কুল মিটই তার শেষ প্রতিযোগিতা। তাই যাওয়ার অনুমতি চাইছেন। রাঁচি থেকে ফিরে শুধু পড়াশোনা করবেন। বাবার হাতে চিঠি দিয়ে রাঁচির ট্রেনে ওঠেন তেজস্বীন। জানতেন না বাড়ি ফিরলে কী অপেক্ষা করবে তার জন্য। তবে স্কুল মিটের সেই ব্রোঞ্জই তেজস্বীনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।  

তেজস্বীন বলেছেন, “তখন বয়স কম ছিল। অত কিছু বুঝতাম না। রাঁচির প্রতিযোগিতায় প্রথম ব্রোঞ্জ পদক জিতি। সেটাই ছিল আমার জাতীয় স্তরের প্রথম প্রতিযোগিতা। বাড়ি ফেরার পর মা আমাকে জানান, রাঁচি চলে আসার পর তারা দুজন কথা বলেছিলেন। আমার লেখা ওই চিঠিটাই বাবার মন পরিবর্তন করেছিল। বাবা বুঝেছিলেন, অ্যাথলেটিকস ছেড়ে থাকতে পারব না। রাঁচিতে পদক জেতায় বাবা খুব খুশি হয়েছিলেন। বাড়ি ফেরার পর আমাকে বলেন, ‘নিজের স্বপ্নকে তাড়া করো। ’ এরপর আর বাবাকে বেশি দিন পাইনি। মার্চে মারা যান। মৃত্যুর মাত্র এক মাস আগে আমাকে অ্যাথলেটিকস করার অনুমতি দিয়ে গিয়েছিলেন বাবা। ”



সাতদিনের সেরা