kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

‘নেশাগ্রস্ত’ আলিফের অলিম্পিক স্বপ্ন

সনৎ বাবলা   

৬ মার্চ, ২০২১ ০২:৩১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘নেশাগ্রস্ত’ আলিফের অলিম্পিক স্বপ্ন

অবিশ্বাস্য তাঁর আর্চারি প্রেম। নাওয়া-খাওয়া ভুলে সারা দিন আর্চারি প্র্যাকটিসে কাটিয়ে দিতে পারেন তিনি। তাঁর কোচও দেখেননি এমন ‘নেশাগ্রস্ত’ তীরন্দাজ। জীবনাচার ও মননে খেলাটা এভাবে মিশে গেছে বলেই আলিফ হয়েছেন আলাদা। মাত্র ১৫ বছর বয়সে রোমান সানা, রুবেল হাকিমদের ছাড়িয়ে হয়ে ওঠেন আর্চারির আকাশে নতুন ধ্রুবতারা।

দ্বাদশ জাতীয় আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে বড় বড় তারকাদের পেছনে ফেলে রিকার্ভ ইভেন্টের তিন সোনা জিতে আব্দুর রহমান আলিফ হয়ে গেছেন ‘বিস্ময় বালক’। এককে রোমান সানা নামের বড় তারাটি আগেই খসে পড়ে। এরপর জাতীয় দলের আরেক মহারথী হাকিম আহমেদ রুবেলকে ফাইনালে হারিয়ে বিকেএসপির এই কিশোর জিতেছেন রিকার্ভ এককের সোনা। রিকার্ভের বাকি দুই ইভেন্টেও (দলগত ও মিশ্র দলগত) শ্রেষ্ঠত্বের আসন জিতে তিনি রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিয়েছেন।

এবার খবরের শিরোনাম হলেও আর্চারির হাতেখড়ির বছরেই আলিফ দিয়েছিলেন তাঁর আগমনী বার্তা। ২০১৮ সালে বিকেএসপিতে ভর্তি হয়ে আর্চারির সঙ্গে তাঁর সখ্য এবং সে বছরই দশম জাতীয় আর্চারিতে চমকে দেন রুপা জিতে, ব্রোঞ্জ পদক ছিল রোমান সানার। তবে প্রথম শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসেন এবার বিজয় দিবস আর্চারিতে রোমান সানাকে হারিয়ে। এরপর পরশু জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের সব রং কেড়ে নিয়ে তিন সোনায় রচনা করেন ‘আলিফনামা’। আর্চারির রোমান সাম্রাজ্য তছনছ হয়ে গেল আলিফের তীর-ধনুকে! ‘এভাবে বলবেন না। তিনি (রোমান) অনেক বড় আর্চার, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ জয়সহ অনেক আন্তর্জাতিক পদক জিতেছেন। আমি এখনো কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টই খেলিনি। এবার ন্যাশনালে ভালো করেছি, এর পেছনে আছে আমার প্র্যাকটিস ও পরিশ্রম। তবে পারফরম্যান্সটা আমার ধরে রাখতে হবে’—পা মাটিতে রেখেই সামনের দিনগুলোর কথা ভাবছেন পাবনার এই কিশোর। একই সঙ্গে ধন্যবাদ দিচ্ছেন তাঁর বাবার এক বন্ধুকেও, ‘আমি ছিলাম মূলত ফুটবলার, ইনজুরিতে পড়ার পর বিকেএসপিতে ভর্তি হই আর্চারি খেলব বলে। আমার এক অ্যাংকেলই (বাবার বন্ধু) আর্চারিতে ভর্তি হওয়ার জন্য বলেছিলেন। তিনি না বললে হয়তো এই খেলা নিতামই না।’ তাঁর শিক্ষক বাবার ওই বন্ধুর পরামর্শে আলিফের জীবনের মোড় ঘুরে গেছে।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে ভর্তি হওয়ার পর তীর-ধনুকে তাঁর মনে বসে যায়। কোচ নূরে আলমও বিস্মিত হন এই খেলার প্রতি তাঁর নেশা দেখে, ‘তার আগ্রহ উৎসাহ দেখে কয়েক মাসের মধ্যে আলিফকে দেওয়া হয় উন্নত সরঞ্জাম। এরপর দেখি আর্চারি নিয়েই সে পড়ে থাকে। খেলাটির প্রতি তার এমন নেশা হয়ে যায়, খাওয়া-দাওয়া ভুলে সারা দিন প্র্যাকটিস করে যেতে পারে সে। মোটকথা আর্চারিতে তার কোনো ক্লান্তি নেই। অনুশীলনের পাশাপাশি তার টেম্পারামেন্টও অস্বাভাবিক রকমের ভালো। অনেকে প্র্যাকটিসে দশে দশ মারে, কিন্তু আলিফ গেমে গিয়েও সেই স্কোর মারতে পারে।’ প্র্যাকটিসের স্কোরটা গেমে নিয়ে যেতে পারাটাই আসল চ্যালেঞ্জ। টুর্নামেন্টে নানা চাপ কাজ করে বলে অনেকে সেরাটা দিতে পারেন না। কিন্তু ১৫ বছর বয়সী এই কিশোর সব চাপ-তাপ উড়িয়ে ধনুক ছোড়েন নিখুঁত নিশানায়।

এই গুণটা তাঁকে অনেক ওপরে তুলে নিতে পারে বলে মনে করেন বিকেএসপির কোচ নূরে আলম, ‘আমি মনে করি, আলিফের মধ্যে বড় আর্চার হওয়ার সব গুণ আছে। শারীরিক সক্ষমতা তার ভালো। একই সঙ্গে আছে নিজের ওপর বিশ্বাস ও দুর্দান্ত টেম্পারামেন্ট। এসব ধরে রেখে এগোতে পারলে সে রোমান সানার চেয়েও বড় আর্চার হবে। সবচেয়ে বড় কথা, খেলাটির প্রতি তার ভালোবাসা অন্য রকম।’ ওই ভালোবাসা ও আত্মনিবেদনের জোরেই তিনি এখনই নিঃশ্বাস ফেলছেন রোমান সানার ঘাড়ে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে লঘু করে আলিফ বলছেন, ‘রোমান সানা বড় ভাইয়ের মতো, তিনি আমাকে নানা টিপস দেন। তাঁর সঙ্গে আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, সবার স্বপ্ন আলাদা। আমি আর্চারি বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক পদক জয়ের স্বপ্ন দেখি।’ সেই স্বপ্নের শুরুটা হলো কক্সবাজার থেকে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা